Image description

Rajib Ahamod(রাজিব আহমদ)

 
 
২০১৭ সালের জানুয়ারির মাঝামা‌ঝি 'নিউজ' পেলাম চট্টগ্রামে রেলের জমি দখল করেছেন এক মন্ত্রীর ছেলে। দখল উচ্ছেদে গিয়ে রেলের ভূসম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তারা নাজেহাল হয়েছেন। পরে এক সহকর্মীর সুবাদে যে 'চোথা' পেলাম তাতে নিউজ বিরাট অনুসন্ধানী না হলেও মজার।
 
ঘটনা হলো, তৎকালীন গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ছেলে মাহবুব উর রহমান রুহেলের 'গ্যাস মিন লিমিটেড' চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের পশ্চিম হিঙ্গুলী মৌজায় রেলের ৩৭৫.৬ শতাংশ বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছিলেন। আবেদন তিনি করতেই পারেন। এতে অপরাধের কিছু নেই। কিন্তু কৃষি কাজের জন্য নির্দিষ্ট রেলের মালিকানাধীন এ জমিটি একরামুল হক নামের এক কৃষকের ইজারা নেওয়া ছিল। যিনি ২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত ইজারা টাকা পরিশোধ করেছিলেন।
 
এই অবস্থায় রেল বরাদ্দ দেওয়ার আগেই মন্ত্রীপুত্র জমিটি দখল নিয়ে সিমেন্টের ব্লক তৈরির কারখানা নির্মাণ করেন। যা ছিল বেআইনী। তাই প্রকৃত ইজারাদারের আবেদনে রেলের কর্মকর্তারা মন্ত্রীর ছেলের কারখানা উচ্ছেদ করতে গিয়ে নাজেহাল হন।
 
আমার অনুসন্ধানও শুরু সেখান থেকে। তখন আরও মজার 'কাগজ' পাই। রেল কর্মকর্তাদের বিক্ষোভের পর মন্ত্রীর ছেলে রেলের কাছে একটি আবেদন লেখেন দুঃখ প্রকাশ করে। এতে তিনি লেখেন, বরাদ্দের আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থায় জমিটি দখলে নিয়ে ১০৩ ফুট দৈর্ঘ্যে এবং ৬৩ ফুট প্রস্থে ৬ হাজার ৪৮৯ বর্গফুট কারখানা নির্মাণ করেছেন। এর পাশেই ৫৫ ফুট দৈর্ঘ্যে এবং ১৮ ফুট প্রশস্থে ৯৯০ বর্গ ফুট আয়তনের আরেকটি ঘর নির্মাণ করেন।
 
আবেদনে মন্ত্রীপুত্র লেখেন, স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আবেদনে সুপারিশ করেন তৎকালীন গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তিনি তৎকালীন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হককে লেখেন, 'মানবিক কারণে জমিটি বরাদ্দ দিতে সুপা‌রিশ করেছি'।
 
নিউজ পেয়ে অফিসকে জানালাম। প্ল্যান হলো, একদিন লিড হবে। তবে এ জন্য মন্ত্রী, তাঁর ছেলে এবং রেলের কর্মকর্তাদের বক্তব্য নিতে হবে। সেই কারখানার ছবি তুলতে হবে। ছবির জন্য সমকালের মীরসরাই প্রতিনিধিকে জানালে, তি‌নি ভয় পান। বললেন মন্ত্রী ছবির কথা জানলে হাড্ডি ভেঙে দেবে।
 
মীরসরাইয়ে একজন উপজেলা চেয়ারম্যান বা চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন, যিনি আওয়ামী লীগ নেতা হলেও স্থানীয় রাজনীতিতে মোশাররফ হোসেনের বিরোধী ছিলেন। তিনি ছবি ব্যবস্থা করে দেন। প্রকৃত ইজারাদার এনামুল হককে খুঁজে বের করেন। তাঁকে সাহস দেন মিডিয়ায় বক্তব্য দিতে।
 
এসব কাজ শেষ করে কয়েকদিনের চেষ্টায় গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের ইন্টারভিউয়ের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাই। দিনটি ছিল ২৪ জানুয়ারি সকাল ১০টা। শীতের সকাল। মন্ত্রীর কক্ষে দেখি ইটিভির সাংবাদিক জুবায়ের খুকুসহ আরও কয়েকজন। তাদের আমি চিনি না। তাঁরাও বোধহয় গিয়েছিলেন সাক্ষাতকারের জন্য।
 
আমি মন্ত্রীকে একান্তে কথা বলার অনুরোধ জানাই। তিনি আমাকে বলেন, 'আমি সাংবাদিকদের অনেক সাহায্য সহযোগিতা করি। তুমি সবার সামনেই বলো অসুবিধা নেই।'
আমি আরও কয়েকবার অনুরোধ করলেও মন্ত্রী রাজি হননি। বললেন, 'বলো তুমি কী কাজে আসছ'।
 
শেষে কাগজপত্র বের করে বললাম, 'আপনার ছেলে রেলের জসি দখল করে অবৈধভাবে কারখানা নির্মাণ করেছেন। ব্যাংক লোনও নিতে যাচ্ছেন। আপনি আপনার ছেলের পক্ষে সুপারিশ করেছেন। মন্ত্রী হিসেবে তা করতে পারেন কী না? আপনার বক্তব্য কী?'
 
মন্ত্রী প্রথমে কিছু আর্গুমেন্ট দেন। আমি তা খন্ডন করে কাগজ দেখানোর পর ক্ষেপে যান। এক পর্যায়ে যা তা বলতে থাকেন। তিনি হুট করে তুই তুকারি শুরু করেন। 'তুমি আমার বাল ছিঁড়তে আসছ'- এই জাতীয় কথা বলা শুরু করেন।
 
আমি শান্ত গলায় বলি, 'আপনি আপনার প্রশ্নের জবাব দিতে না চাইলে, অস্বীকৃতি জানাতে পারেন'।
এই পর্যায়ে মন্ত্রী রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলেন, 'তুই তো বিএনপি জমাত, রুম থেকে বেরিয়ে যা। আসছে সাংবাদিক মারাইতে!'
আমি ধন্যবাদ দিয়ে চলে আসি। সেখানে থাকা কয়েকজন সাংবাদিক (যাদের চিনি না) বললেন, একজন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কাজটা ঠিক করলেন না।
আধাঘণ্টার মধ্যে ফোন পেলাম অফিস থেকে। তৎকালীন নগর সম্পাদক জানালেন, মন্ত্রী তাঁকে ফোন করেছিলেন। হুমকি দিয়েছেন আমার নামে বিএনপি-জামায়াতের নাশকতার পাঁচটা মামলা দেবেন। জামিন হবে না।
সম্পাদককে ফোন করলাম। তিনি জানালেন, তাঁকে ফোন করেছিলেন মন্ত্রী। তবে ধরেননি।
 
সম্পাদক আমাকে অভয় দিয়ে বললেন, দ্রুত অফিসে এসে মন্ত্রীর বক্তব্যটুকু যোগ করে নিউজ ছাড়তে। আজকেই যাবে।
এর কিছুক্ষণের মধ্যে সাংবাদিকদের বড় নেতার ফোন পেলাম। যিনি আওয়ামী লীগপন্থি বিএফইউজে নেতা এবং পরে দূতবাসের পদায়ন পেয়েছিলেন। তিনি আমার প্রশংসা টশংসা করে বললেন, 'তুই তো ভালো রিপোর্টার। মোশাররফ ভাই বুড়া মানুষ। বুঝতে পারেননি। উনি সাংবাদিকদের প্রতি অনেক হেল্পফুল। তুই নিউজটা করিস না। আমি বাকিটা দেখব'।
আমি তাঁকে মিথ্যা বললাম। জানালাম, নিউজ অফিসে জমা দিয়ে ফেলেছি। আমার আর কিছু করার নেই।
 
এরপর ফোন পেলাম একটি এলএমএল কোম্পানির পরিচালিত টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদকের। তিনিও সাংবাদিক নেতা। আমি সিওর তিনি আমাকে চেনেন না। তবু ফোনে আন্ত‌রিকতার ভান ক‌রে ভাইয়া ভাইয়া ডেকে মন ভোলানো প্রশংসা করলেন। তারপর বললেন, 'ভাইয়া মন্ত্রীর ছেলে আমাদের বন্ধু। নিউজটা বাদ দাও'।
 
সেই টেলিভিশনে কাজ করত আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সে আমাকে ফোন করে বলল, তার বস তাকে দায়িত্ব দিয়েছে আমাকে বোঝাতে। আমার বন্ধুটি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাও ছিল। সে আমাকে বলল, 'তোর যা ইচ্ছা নিউজ কর। কিন্তু আমি যে নিউজটা থামানোর চেষ্টা করেছি, এটুকু সবাইকে বুঝতে দে। যাতে আমার দোষ না থাকে।'
 
তো বন্ধুর অনুরোধে সচিবালয় এলাকা থেকে শাহবাগের ফুলের দোকানের পাশে ফাস্টফুডে বসলাম। সেখানে আগে থেকেই ছিলেন গণপূর্তমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রোটন সাহেব এবং একজন সাংবাদিক। তারা আমাকে সিঙ্গাপুরে থাকা মন্ত্রীপুত্র রুহেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলালেন।
 
তিনি খুই ভদ্রভাবে বললেন, 'রাজীব সাহেব নিউজে আমার কিছু হবে না। কেউ আমার কারখানা ভাঙতে পারবে না। কিন্ত আমার ও আব্বার একটু সম্মাণ যাবে। আপনি ৫, ১০, ১৫ যা চান, নিতে পারেন। নিউজটা আমরা অন‌্যভা‌বেও থামাতে পারব। তাতে আপনার লাভ হবে না।'
 
আমি গরিবে ছেলে। ১৫ শুনে এমনই দিশেহারা হলাম, ফুলের বাজারের সামনে রাখা বাইক খুঁজতে গেলাম চারুকলার সামনে। বাইক খুঁজে না পেয়ে মাথা নষ্ট। এর মধ্যে হল, এটা লোভ করার ফল। তখনই মনে পড়ল, বাইক তো ফুলবাজারের পুলিশ বক্সের জানালার সামনে। গিয়ে পেলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, যত বড় অফার আসুক। নিউজ বন্ধ করব না।
আমার বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অফিসে এলাম তিনটা বা চারটার দিকে। সম্পাদক জানালেন, মন্ত্রী ১৭ বার কল করেছেন। তিনি ধরেননি।
 
আগেই অধিকাংশ লিখে রাখা নিউজটা পড়ে ঠিকঠাক করলাম। মন্ত্রীর রুমে যা ঘটেছে, দুপুরের ঘটনাগুলো লিখলাম না সিনিয়রদের পরামর্শে। ঠিক ৬টা ৪০ মিনিটে নিউজ জমা দিলাম। সাধারণত আমার লেখা শেষ করতে রাত আটটা বাজে। সম্পাদক নিজেই এডিট করলেন। রাত পৌনে ১০টায় নিউজ প্রথম পাতায় ৫ কলাম বসল (তখন আট কলামের পত্রিকা ছিল)।
রাত ১০টার দিকে পত্রিকার মালিক পক্ষের ফোন এলো। জানাল, সম্পাদককে ফোনে না পেয়ে মালিক পক্ষকে ফোন দিয়েছে মন্ত্রী। মনে করিয়ে দিয়েছে সমকাল কার্যলয়টি গণপূর্তের কাছ থেকে বরাদ্দ পাওয়া প্লটে। সেই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর বিরুদ্ধে নিউজ হলে ফল ভালো হবে না।
 
মালিক পক্ষ ভয় পেলো। সম্পাদককে ধরতে হলো মন্ত্রীর ফোন। তারপর নিউজটি মেকআপ থেকে উঠে গেলো। পত্রিকার ভাষায় যাকে বলে, নিউজ কিল। সাদা বাংলায়, সংবাদ মে‌রে ফেলা। ছাপা হওয়া নিউজের চেয়ে মারা যাওয়া নিউজের গল্প অনেক ইস্টারেস্টিং হয়।
 
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন গত বুধবার মারা গেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন। তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করি। আল্লাহ তাঁকে জান্নাত দান করুন। উনার প্রতি রাগ ক্ষোভ নেই। তিনি যা করেছিলেন, তা বাংলাদেশের সংস্কৃতির অংশ। শুধু একটাই শিক্ষা, ক্ষমতা পচনশীল।
সেই নিউজটার আসল কপি নী‌চে দিলাম। এডিট ফাইলটা নেই এত বছর পর।
Rajib-Rail-land-occupied-by-minister-24-01-17
রেলের জমি দখল করে মন্ত্রী পুত্রের কারখানা
* প্রকৃত ইজারাদারকে উচ্ছেদ করে জমি দখল
* জমি বরাদ্দের আবেদন অনুমোদনের আগেই স্থাপনা নির্মাণ
* ছেলের আবেদনে মন্ত্রীর সুপারিশ
* দখলের দায়ে রেলের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা
............................................................................
চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার হিঙ্গুলী ইউনিয়নের পশ্চিম হিঙ্গুলী মৌজায় রেলওয়ের জমি দখল করে ব্লক তৈরি কারখানা নির্মাণ করেছে ‘গ্যাস মিন লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব উর রহমান গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ছেলে। ‘গ্যাস মিন লিমিটেড’ মন্ত্রীর পরিবারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্ব পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ। রেললাইনের পূর্বে সংস্থাটির জমি রয়েছে। জমির অপর পাশে ফেনী নদী। সেখানে রেলের বিস্তর জমি রয়েছে। এর মধ্যে ১ একর ৭২ শতাংশ জমি ২০০৭ সালে কৃষি কাজের জন্য একরামুল হক নামে এক ব্যক্তিকে জমি ইজারা দেয় রেলওয়ে। আরেকজনের ইজারা নেওয়া জমি দখল করে কারখানা নির্মাণ করেছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোশাররফ হোসেনের ছেলের প্রতিষ্ঠান ‘গ্যাস মিন লিমিটেড’।
 
রেল ভবন সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর গ্যাস মিন লিমিটেড পশ্চিম হিঙ্গুলী মৌজায় ৩ একর ৭৫ শতাংশ ৬৪ অযুতাংশ জমি বরাদ্দ চেয়ে রেল মন্ত্রনালয়ে আবেদন করে। কিন্তু বরাদ্দ পায়নি। বরাদ্দ না পেলেও গত সেপ্টেম্বরেই ‘গ্যাস মিন লিমিটেড’ বরাদ্দের জন্য আবেদন করা জমি দখল করে নেয়। বিএস দাগ নম্বর-৫১১৯ জমিতে ১০৩ ফুট দৈর্ঘ্যে এবং ৬৩ ফুট প্রস্থে ৬ হাজার ৪৮৯ বর্গফুট জমিতে ব্লক নির্মাণের জন্য আধা পাকা কারখানা নির্মাণ করে। এর পাশেই ৫৫ ফুট দৈর্ঘ্যে এবং ১৮ ফুট প্রশস্থে ৯৯০ বর্গ ফুট আয়তনের আরেকটি ঘর নির্মাণ করে।
 
গত ডিসেম্বরে রেলের পূর্বাঞ্চলের সম্পত্তি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ ও অপসারণের নির্দেশ দেয় গ্যাস মিন লিমিটেডকে। ‘গ্যাস মিন লিমিটেড’ এর পর গত ২ জানুয়ারি রেল মন্ত্রনালয়ে আবারও জমির বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেনপ্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব উর রহমান। ওই আবেদন পত্রেই জমি দখলের অভিযোগ স্বীকার করা হয়। এতে বলা হয়, ‘আবেদনটি প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থায় আমাদের আবেদনকৃত ভূমির দখল নিয়ে দাড় নং বিএস-৫১১৯ এর অংশে... বর্ণিত কাঠামো নির্মাণ করেছি।’ ওই আবেদন পত্রেই স্বীকার করা হয় বরাদ্দ পাওয়ার আগেই জমির দখল নেওয়া ও স্থাপনা নির্মাণ ঠিক হয়নি। এতে বলা হয়, ‘আমাদের অনাকাক্ষিত ভুল তথা কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে কাঠামো নির্মাণ করায় দুঃক্ষিত ও ক্ষমা প্রার্থী।’
 
মন্ত্রী পুত্রের আবেদনপত্রে দাবি করা হয়, রেলওয়ে স্থাপনা অপসারণের নোটিশ দেওয়ার পর থেকে ব্লক উৎপাদন কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে গত বুধবারও সরেজমিনে দেখা যায়, রেলের জমি দখল করে গড়া কারখানাটিতে ব্লক উৎপাদন কাজ পুরোদমে চলছে। স্থানীয়রা জানান, স্থাপনা নির্মাণ কাজও অব্যহত রয়েছে।
 
গত ২ জানুয়ারি রেলমন্ত্রীর বরাবরে করা আবেদনে ‘গ্যাস মিন লিমিটেড’ ২২৩ ফুট দৈর্ঘ্যে এবং ২১০ ফুট প্রশস্থে ৪৬ হাজার ৮৩০ বর্গফুট (১০৭ দশমিক ৫ শতাংশ) জমি বরাদ্দের অনুরোধ জানায়। ওই আবেদনে সুপারিশ করেন মাহবুব উর রহমানের বাবা গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। মন্ত্রী আবেদনপত্রের উপরে লেখেন, ‘আবেদনের প্রেক্ষিতে বিবেচনার জন্য জোর সুপারিশ করা হলো’। এ লেখার নীচে মন্ত্রীর সই ও সিল রয়েছে। ৪ জানুয়ারি আবেদন পত্রের উপর রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক লেখেন, ‘ডিজি/রেলপথ : নীতিমালার আলোকে ব্যবস্থা নিন এবং জরুরী অবহিত করুন।’
গ্যাস মিন লিমিটেডে’র ওয়েব সাইটে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ওই বছর তিনি মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলে তার ছেলে মাহবুব উর রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নেন।
 
মন্ত্রীপুত্র মাহবুব উর রহমান বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন। তার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক প্রজেক্ট। কোন প্রজেক্ট কীভাবে চলছে তা আমি জানি না। ম্যানেজার ইঞ্জিয়াররা বলতে পারবেন।’ রেলের জমি দলখের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটা জমির বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছি।’ বরাদ্দ পাওয়ার আগে স্থাপনা নির্মাণ ও তার জান্য রেলের কাছে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আবেদনে লেখা থাকলে সত্য। আবেদনে আমার সই থাকলেও আমি এ ব্যাপারে জানি না। ’
 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোশাররফ হোসেন নিশ্চিত করেন, গ্যাস মিন তার পরিবারের মালিকানধীন প্রতিষ্ঠান। তবে তিনি দাবি করেন রেলের জমি দখল করেননি। বরং বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করার পরই কারখানা নির্মাণ কাজ শুরু করেন। বরাদ্দ পাওয়ার আগেই কেনো কাজ শুরু করে ‘গ্যাস মিন লিমিটেড’ এ প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম রেল আমাদের বরাদ্দ দেবে।’ মন্ত্রী জানানা, জমি বরাদ্দ চেয়ে আবারও আবেদন করেছেন। আবেদনটি রেল মন্ত্রনালয়ের বিবেচনাধীন রয়েছে বলে দাবি করেন মোশাররফ হোসেন।
 
মোশরারফ হোসেন বলেন, ভাটায় ভূ-উপরিভাগের মাটি পুড়িয়ে ইট তৈরি করা হয়। এতে পরিবেশ দূষণ হয়। তিনি দাবি করেন, গ্যাস মিনের উৎপাদিত বালি ও সিমেন্টের ব্লক পরিবেশ বান্ধব। তিনি বলেন, ‘আমারা তো দেশের ভালোর জন্য কারখানা করেছি।’ জমি বরাদ্দ না নিয়েই রেলের জমিতে কারখানা করার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘রেল ফাইনালি যদি সরিয়ে নিতে বলে, জমি না দেয়, তাহলে কারখানা সরিয়ে নেবো।’
রেলের ইজারা দেওয়া জমি বরাদ্দ পাওয়ার আগেই দখল নেওয়ার অভিযোগের জবাবে মন্ত্রী দাবি করেন, ওই জমির কোনো ইজারাদার নেই। গত ২৫ বছরে চাষাবাদ হয়নি। পতিত জমিতে কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে। কাউকে উচ্ছেদ করা হয়নি। তবে ইজারাদার একরামুল হক সমকালকে জানান, ২০০৭ সালে তিনি রেলের কাছ থেকে কৃষি কাজের ১ একর ৭২ শতাংশ জমি ইজারা নেন। পরবর্তীতে ৪১ শতাংশের আরেকটি পুকুর ইজারা নেন। বাংলা ১৪২৩ সন পর্যন্ত ইজারা মূল্য পরিশোধ করেছেন। যে জমিতে মন্ত্রীর ছেলে কারখানা নির্মাণ করেছেন, তার একাংশে ফেনী থেকে তোলা বালি রাখা হতো। অপরাংশে কৃষি কাজ করতেন।
‘গ্যাস মিন লিমিটেড’ তার মালাকানাধীন জমিতে কীভাবে স্থাপনা করেছে- এ প্রশ্নে একরামুল হক বলেন, ‘এ নিয়ে আমি কথা বলতে পারব না।’ জমি বেদখল হওয়ার পর রেলের কাছে অভিযোগ করেছেন কি না- এ প্রশ্নে বলেন, ‘আমার করারও কিছু নেই। বলারও কিছু নেই। রেলের ভূসম্পত্তি অফিস থেকে উচ্ছেদ নোটিশ দিয়েছিল। এরপর কী হয়েছে জানি না।’
 
মন্ত্রী যদিও দাবি করছেন জমিটি কৃষি কাজের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে না। কিন্তু তার ছেলের আবেদনেই বলা হয়, কৃষি জমি বাণিজ্যিক কাজের জন্য বরাদ্দ দিলে রেলের আয় বাড়বে। আবেদনপত্রে লেখা হয়, ৪৬ হাজার ৮৩০ বর্গফুট (১০৭ দশমিক ৫ শতাংশ) জমি গ্যাস মিন লিমিটেডকে বরাদ্দ দিলে রেলের বছরে আয় হবে ৫ লাখ ৬১ হাজার ৯৬০ টাকা। কিন্ত কৃষি কাজের জন্য বরাদ্দ দিয়ে রেল মাত্র ৫ হাজার ১৬০ টাকা আয় করতে পারছে না।
 
রেলের পূর্বাঞ্চলের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে নিশ্চিত করেন মন্ত্রীর পরিবারের মালিকানাধীন কারাখানাটি উচ্চেদের চেষ্টা করা হয়েছিল। উচ্ছেদ নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তবে উচ্ছেদকারী দল উচ্ছেদ না করেই ফিরে আসতে বাধ্য হয়। এ বিষয়ে রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজী হননি। রেলের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক আবদুল হাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মীরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান ফেনী নদীর চরে জমি কিনে কারখানা স্থাপন করেছে। কিন্তু মন্ত্রীর পরিবার ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যের জমিতে রাতারাতি কারখানা গড়ে তুলেছে। কেউ প্রতিবাদ করতে পারেনি।
 
ছবিতে রেলের জমি দেখল করে সেই কারখানা
 
May be an image of timber yard