Image description

গাজীপুরের পূবাইল থানার মেঘডুবি এলাকার ছোট্ট এক টিনশেড বাড়িতে সন্ধ্যা নামত চায়ের গন্ধে। দোকানের বেঞ্চে বসে মানুষ গল্প করত, কেউ হাসত, কেউ দিনের ক্লান্তি ভুলে এক কাপ চায়ে একটু শান্তি খুঁজত। আর সেই দোকানের মাঝখানে ব্যস্ত হাতে চা বানাতেন ৪০ পেরোনো শেফালী বেগম কুলসুম।

 

স্বামীকে ছেড়ে, একা হাতে সংসার টেনে নেওয়া এই নারীর স্বপ্ন খুব বড় ছিল না। ছোট্ট দোকানটা চলবে, কয়েকটি ভাড়া রুমের টাকায় সন্তানদের মুখে খাবার উঠবে—এতটুকুই ছিল তার চাওয়া। কিন্তু সেই নিরীহ স্বপ্নকেও রেহাই দিল না মানুষের লোভ।

 

২৬ এপ্রিলের সন্ধ্যায় মেঘডুবির সেই ঘরে নেমে আসে মৃত্যু। রাত বাড়লেও দোকানের দরজা খোলেননি শেফালী। আত্মীয়রা ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া পাননি। পরে গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে তারা যে দৃশ্য দেখেন, তা আজও ভুলতে পারেননি কেউ। বিছানার ওপর কম্বল ঢাকা নিথর দেহ। মুখ, হাত, পেট—শরীরের প্রতিটি অংশে ধারালো অস্ত্রের নির্মম কোপ। যেন একজন মানুষকে নয়, ঘাতকরা কুপিয়েছে একজন মায়ের স্বপ্ন, এক নারীর সংগ্রাম, বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টাকে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করে।

 

একা সংগ্রামী জীবন

 

 

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শেফালী বেগম ছিলেন পরিশ্রমী ও দৃঢ়চেতা নারী। পারিবারিক কলহের জেরে প্রায় এক বছর আগে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় তার। এরপর তিনি মেঘডুবির কড়ইটেক এলাকায় একাই বসবাস করতেন। ছোট্ট একটি দোকান আর কয়েকটি রুম ভাড়ার আয়ে চলত সংসার।

 

মেয়ে ময়না আক্তার স্মৃতি মাঝে মধ্যে কালীগঞ্জ থেকে এসে মাকে দেখে যেতেন। বড় ছেলে ও সাবেক স্বামী ঢাকায় খিলক্ষেতে আলাদা থাকতেন। বিচ্ছেদের পরও শেফালী নিজের জীবনটাকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সেই একাকিত্বই শেষ পর্যন্ত তাকে ঠেলে দেয় মৃত্যুর ফাঁদে।

 

শেষ ফোনালাপের কয়েক ঘণ্টা পরই মৃত্যু

 

ঘটনার দিন ২৬ এপ্রিল দুপুরে মেয়ে স্মৃতি ফোন করে মায়ের খোঁজখবর নেন। তখনও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু রাত সাড়ে ৮টার দিকে প্রতিবেশী ও স্বজনরা জানতে পারেন, শেফালীর বাড়ির গেট ভেতর থেকে বন্ধ, ডাকাডাকি করলেও কোনো সাড়া মিলছে না।

 

তারা গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখেন, ঘরের বিছানায় কম্বল ঢাকা অবস্থায় পড়ে আছে শেফালীর নিথর দেহ। মুখ ও শরীরজুড়ে ধারালো অস্ত্রের অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন।

 

খবর পেয়ে পূবাইল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পরদিন নিহতের মেয়ে ময়না আক্তার স্মৃতি বাদী হয়ে পূবাইল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

 

তদন্তে নামে পিবিআই

 

ঘটনার পরপরই পূবাইল থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় ছায়া তদন্তে নামে পিবিআই গাজীপুর জেলা। তথ্যপ্রযুক্তি, স্থানীয় সোর্স ও ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিক বিশ্লেষণ মিলিয়ে তদন্তকারীরা দ্রুত সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করেন।

 

অবশেষে ৮ মে দিবাগত রাতে রংপুরের গঙ্গাচড়া থানার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. কামরুজ্জামান (৩৫), মো. আমজাদ হোসেন (৩০) ও মো. আফজাল হোসেন (৩৩) নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে হত্যার পুরো ছক।

 

পাওনা টাকা থেকেই হত্যার ছক

 

রোববার (১০ মে) পিবিআই সদর দপ্তর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই স্থানীয় একটি পলিমার কারখানার শ্রমিক। তারা প্রায়ই শেফালীর দোকান থেকে বাকিতে কেনাকাটা করতেন।

 

পুলিশ জানায়, আসামি কামরুজ্জামানের কাছে এক হাজার ৬৪৫ টাকা, মনোয়ারের কাছে এক হাজার টাকা ও আমজাদের কাছে এক হাজার ১১৬ টাকা পাওনা ছিল। এই টাকা নিয়ে শেফালীর সঙ্গে তাদের বিরোধ তৈরি হয়।

 

পিবিআই জানায়, হত্যাকারীদের ধারণা ছিল, শেফালী একা থাকেন। সুদের কারবারও আছে, ফলে তার কাছে হয়তো টাকা-স্বর্ণালংকার রয়েছে। সেই লোভ থেকেই হত্যার পরিকল্পনা করেন অভিযুক্তরা।

 

বিশ্বাসের সুযোগ নেয় ঘাতকরা

 

ঘটনার আগের দিন ২৫ এপ্রিল রাতে আসামি মনোয়ার শেফালীর দোকানে গিয়ে জানায়, পরদিন তার এক ‘গার্লফ্রেন্ড’ আসবে। কিছু সময় কাটানোর জন্য একটি রুমে জায়গা দিতে অনুরোধ করে। শেফালী সরল বিশ্বাসে রাজি হন।

 

পরদিন দুপুরে মনোয়ার ফল, বিস্কুট, চানাচুর ও কোমল পানীয় ‘স্পিড’ নিয়ে বাসায় যায়। সঙ্গে ছিল ঘুমের ওষুধ। পরে কৌশলে পানীয়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে শেফালীকে খাওয়ানো হয় বলে জবানবন্দিতে জানায় আসামিরা। প্রায় আধাঘণ্টা পর মনোয়ার ফোন করে কামরুজ্জামানকে ভেতরে ডাকে। তখনও শেফালী ঘোরের মধ্যে ছিলেন।

 

ঘুম ভাঙতেই নৃশংস হামলা

 

তদন্ত সূত্রে জানা যায়, কামরুজ্জামান ঘরে ঢুকে একটি বাঁশের লাঠি দিয়ে শেফালীর মাথায় আঘাত করেন। এতে তিনি চিৎকার দিলে মনোয়ার পাশের ঘর থেকে ধারালো দা এনে খাটের ওপর উঠে তাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। মুখ, হাত, পেট— কোনো অংশই বাদ যায়নি।

 

হত্যা নিশ্চিত হওয়ার পর তারা ঘর তছনছ করে নগদ ৩ হাজার ২৫০ টাকা ও কিছু গহনা নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে বাথরুমে হত্যায় ব্যবহৃত রক্তমাখা দা ধুয়ে রেখে যায়।

 

‘স্বর্ণ’ লুটের পর জানা গেল সিটিগোল্ড

 

ঘটনার পর আসামিরা রংপুরে নিজ এলাকায় পালিয়ে যায়। পরদিন বিকেলে তারা লুট করা গহনা বিক্রির জন্য রংপুর পুরাতন টার্মিনাল এলাকার একটি স্বর্ণের দোকানে যায়। সেখানে গিয়ে জানতে পারে, গহনাগুলো আসল স্বর্ণ নয়—সেগুলো ছিল সিটিগোল্ড। এই তথ্য শুনে হতাশ হয়ে পড়ে অভিযুক্তরা। পরে গহনাগুলো নিয়ে তারা বাড়িতে ফিরে যায়।

 

মাত্র ১২ দিনের ছায়া তদন্তে রহস্য উদ্ঘাটন

 

মামলা দায়েরের পর পূবাইল থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও সমান্তরালে ছায়া তদন্ত চালায় পিবিআই গাজীপুর জেলা। পিবিআই প্রথমে কামরুজ্জামানকে রংপুরের গঙ্গাচড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে আমজাদ ও আফজালকেও আটক করা হয়।

 

গ্রেপ্তারের পর কামরুজ্জামান ও আমজাদ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো দা ও বাঁশের লাঠি উদ্ধার করেছে তদন্তকারী সংস্থা।

 

পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, এই নির্মম হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্থানীয় তথ্য ও পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে খুব অল্প সময়ে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে। এমন নৃশংস অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

 

এক নারীর অসমাপ্ত জীবন

 

মেঘডুবির সেই ছোট্ট চা দোকান এখন বন্ধ। নেই শেফালীর কণ্ঠ, নেই সন্ধ্যার ব্যস্ততা। শুধু রক্তাক্ত স্মৃতি হয়ে আছে তার টিনশেড ঘরটি। যে নারী জীবনভর সংগ্রাম করে সন্তানদের জন্য বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে উঠলেন লোভ আর নিষ্ঠুরতার শিকার।