Image description

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) অফিস মানেই বস্তায় বস্তায় কাগজ। কর্মীদের টেবিলের ওপর, নিচ, সামনে-পেছনে শুধু নথিপত্র। আবার কখনো বারান্দা কিংবা আনাচে-কানাচে যখন স্তূপ দেখা যায়— ধরে নিতে হবে কোনো শুমারি চলছে। সেই চিরচেনা রূপ বদলেছে, ট্রাকে ট্রাকে তৈরি হয় না কাগজের বর্জ্যও। কারণ, শুমারি হচ্ছে যন্ত্রে। রক্ষা পেয়েছে বহু গাছের জীবন।

 

দেশের প্রথম ডিজিটাল শুমারি হয় ২০২২ সালে। এটি ছিল জন ও গৃহগণনা প্রকল্প। শুধু এই এক শুমারিতেই বেঁচে যায় প্রায় ৪ কোটি ২২ লাখ পৃষ্ঠা কাগজ। সম্পূর্ণ পেপারলেসে গণনায় বিপুল কাগজ তৈরিতে যে গাছ কাটতে হতো, সেগুলো রক্ষা পেয়েছে। সেই সঙ্গে সাশ্রয় শ্রম, সময়, অর্থেরও।

 

হিসাব করে দেখা গেছে, ডিজিটাল পদ্ধতিতে না হলে জনশুমারিতে প্রশ্নপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হতো প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ পৃষ্ঠার কাগজ। সেই সঙ্গে ফর্ম পাঁচ লাখ, চার লাখ গণনাকারীর জীবনবৃত্তান্তের জন্য চার লাখ এবং টালির জন্য লাগত আরও তিন লাখ কাগজ। যন্ত্রে গণনা করায় লাগেনি কিছুই। শুধু কি তাই; আরও আছে পেনসিল, ইরেজার এবং শার্পনার, যার কোনোটিই সরকারকে কিনতে হয়নি। পাশাপাশি কাগজের বস্তা ট্রাকে দেশের সব জেলা, উপজেলা ও গ্রাম পর্যন্ত পরিবহনে জ্বালানি, চালকসহ অনেক খরচ সাশ্রয় হয়েছে। হিসাবনিকাশের ঝামেলাও আগের তুলনায় নেমেছে শূন্যে।

 

ডিজিটাল ছোঁয়ায় বদলে গেছে সব। এখন সব শুমারি ও জরিপ হচ্ছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে— অর্থাৎ কম্পিউটার অ্যাসিস্টেড পারসোনাল ইন্টারভিউইং (কেপি)। ডিজিটাল হওয়ায় কম সময়ে প্রতিবেদন তৈরি এবং প্রকাশও সম্ভব। পাশাপাশি ভুলও হয়েছে কম। আগে যেখানে একটি শুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদন দিতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগত, সেখানে জনশুমারির ক্ষেত্রে লেগেছে মাত্র এক মাস। এতে যেসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, অন্য সময় তার চেয়েও অনেক কম তথ্য দেওয়া হতো। কিন্তু শুরুর ইতিহাসটা এত সহজ ছিল না।

 

প্রথম ডিজিটাল শুমারি হওয়ায় ছিল নানা চ্যালেঞ্জ। সেগুলো মোকাবিলা করতে গিয়ে নানা উদ্যোগ নিয়ে আটঘাট বেঁধেই নামতে হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো— প্রায় ২০ থেকে ২৫টি সফটওয়্যারকে এক করে এই শুমারির একটি সিস্টেমে দাঁড় করানো হয়েছিল। ট্যাবের নিরাপত্তার জন্য চার লাখ ট্যাবের প্রতিটিতে সফটওয়্যার ইনস্টল করতে হয়। এ ছাড়া তথ্যেও নিরাপত্তার জন্য গাজীপুরে অবস্থিত ফোর টায়ার ডেটা সেন্টারে যেতে হয়েছে। সেখান থেকে আবার বিবিএস এই সেন্টারের সংযোগ স্থাপন। হ্যাকারদের হাত থেকে তথ্য বাঁচাতে করা হয়েছে মাল্টিলেয়ার ফায়ার ওয়াল ইনস্টল। মোবাইল নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করতে দরপত্রের মাধ্যমে রবিকে যুক্ত করা হয়েছিল। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে নেটওয়ার্ক ছিল না, সেখানে ছিল অন্য মোবাইল অপারেটরের সহায়তা। চার লাখ ট্যাবে সিম ইনস্টল করতে সরাসরি সহায়তা দিয়েছে সরকারি সংস্থা বিটিআরসি।

 

প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বললেন জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রকল্পের ওই সময়ে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) দিলদার হোসেন। আগামীর সময়কে জানালেন, বেশ আগে থেকেই ডিজিটাল শুমারির চিন্তা চলছিল। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ওই সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক সচিব ইয়ামিন চৌধুরীর ব্যাপক সহায়তা এবং আগ্রহ ছিল। সেই সঙ্গে সবার সহযোগিতায় আমরা সফল হতে পেরেছিলাম। এটি ছিল আমাদের জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেটি কাজে লাগিয়ে এখন বিবিএসের প্রায় সব শুমারিই ডিজিটালি পরিচালিত হচ্ছে।

 

বিবিএস সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ১৫-২৮ জুন পর্যন্ত হয় গণনা কার্যক্রম। জনশুমারি ও গৃহগণনার ফল অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯২১। এর মধ্যে নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যা বেশি। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ১১৯। বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২২ শতাংশ। শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ হয়েছে।

 

এই শুমারিতে প্রথমবারের মতো গণনা করা হিজড়া জনগোষ্ঠী পাওয়া যায় ১২ হাজার ৬২৯ জন। সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা ঢাকা বিভাগে ৪ কোটি ৪২ লাখ ৪৪ হাজার ৭২৩ জন।

 

অন্যদিকে সবচেয়ে কম মানুষ বরিশাল বিভাগে ৯১ লাখ ১০২ জন। এতে প্রথম দেশে কর্মরত বিদেশি এবং শুমারি চলার সময় বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশির হিসাবও তুলে আনা হয়েছিল।