দেশে হামের টিকার সংকট ও শিশুমৃত্যুর ঘটনা খতিয়ে দেখছে সরকার। এর পেছনে কোনো অবহেলা আছে কিনা, থাকলে কে দায়ী– তা নিশ্চিত করতে তদন্ত শুরু হয়েছে। এ কার্যক্রম শেষ হলে তদন্ত প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী এ তথ্য জানিয়েছেন।
গতকাল শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) ‘হামের প্রাদুর্ভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এক প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায় রাষ্ট্রের দায় আছে। এ জন্য সেসব ঘটনার যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কেন বাচ্চাগুলো হারালাম, কারও কোনো গাফিলতি ছিল কিনা– এর তদন্ত হবে।
স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন এমন সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) বৈঠকটির আয়োজন করে। এ সময় সচিব আরও বলেন, ‘কেন এই বাচ্চাগুলো হারালাম, কোথায় সমস্যা ছিল, আমাদের কোনো গাফিলতি ছিল কিনা বা আমাদের কর্মকর্তাদের দায় কী ছিল– একটা তদন্ত হলে যা হয়, সবকিছুই হবে।’
সাংবাদিকরা পাল্টা প্রশ্ন করেন, তদন্ত শুরু হবে- নাকি তদন্ত হচ্ছে? জবাবে সচিব বলেন, তদন্ত হচ্ছে।
তবে কাদের নিয়ে তদন্ত কমিটি হয়েছে, কবে হয়েছে– এ ধরনের কোনো প্রশ্নের উত্তর কামরুজ্জামান চৌধুরী দেননি। তদন্তের বিস্তারিত তথ্য এবং এর সময়সীমা তাৎক্ষণিক জানতে পারেনি সমকাল।
এদিকে হাম ও এই রোগের উপসর্গে গতকাল আরও ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এ বছর হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৫২ শিশুর মৃত্যু হলো।
রোগ প্রতিরোধ ঘাটতি অন্যতম কারণ
গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পেডিয়াট্রিক ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম। তিনি বলেন, করোনা মহামারিজনিত টিকাদান কার্যক্রম বিঘ্নের কারণে সৃষ্ট রোগ প্রতিরোধ ঘাটতি (ইমিউনিটি গ্যাপ) হামের সংক্রমণ বাড়ার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে নিউমোনিয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো এলাকায় টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের ‘হার্ড ইমিউনিটি’ সীমার নিচে নেমে গেলে সেখানে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। হাম মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনা কৌশলের অংশ হিসেবে আক্রান্ত শিশুর জন্য বাধ্যতামূলক ভিটামিন ‘এ’ গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
মির্জা জিয়াউল বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর অন্যতম কারণ নিউমোনিয়া। পাশাপাশি শিশুর শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অতিরিক্ত জ্বর, খেতে না পারা কিংবা তীব্র ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুর রোগের ধরন ও অন্যান্য জটিলতা নিরূপণের জন্য ইতোমধ্যে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (আইইডিসিআর) জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের অনুরোধ করা হবে। হাম ও হামের উপসর্গে মারা যাওয়া শিশুর ডেথ রিভিউর বিষয়টি আমরা জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপে (নাইট্যাগ) উপস্থাপন করব।
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, মহামারি দেখা দিলে বিষয়টি আমরা স্বীকার করি না। মহামারি ঘোষণা করি না। কিন্তু মহামারি মোকাবিলায় চেষ্টা করি। অথচ পরিস্থিতি স্বীকার করে কাজ করলে উত্তরণ সহজ হয়। হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করে সমন্বিতভাবে কাজ করার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেন্টাল অনুষদের ডিন ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে কিছু অবহেলা এবং কিছু অপরিকল্পিত উদ্যোগ আছে। এর পেছনের দুটি কারণ তো চিহ্নিত– এক, টিকা দেওয়া হয়নি। ঠিকমতো টিকা আনা হয়নি বা এসে বসেছিল যে কারণেই হোক– দুটোই সত্য। ঠিক সময় আনাও হয়নি; আবার যেটুকু এসেছে, সেটা দেওয়া হয়নি। এই বিষয়গুলো তদন্ত জরুরি।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সারাবিশ্বে হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত মৃত্যুহার বাড়েনি। দেশের চলমান হামের প্রাদুর্ভাব আরও এক থেকে দুই মাস থাকবে। তবে মুশকিল হলো, পরিত্রাণের পর আমরা আবার হাম মোকাবিলার কথা ভুলে যাব।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় পোলিও ও হাম-রুবেলা ল্যাবরেটরির সাবেক প্রধান ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল বলেন, হাম-রুবেলা প্রতিরোধে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি করা সবচেয়ে জরুরি। এতে ইমিইউনিটি বাড়ে। আমাদের মধ্যে আবার হামের পুরোনো ভাইরাস ফিরে এসেছে। এটা দেশীয় ভাইরাস। ভ্যাকসিনেশন গ্যাপ, ইমিউনিটি গ্যাপ আর ব্রেস্ট ফিডিংয়ের অভাবে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে বলেন, সারাদেশে শিশুদের প্রথম ছয় মাস মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার প্রবণতা কমে গেছে। ছয় মাস শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর পাশাপশি নিয়মিত ভ্যাকসিন নিতে হবে। সেই সঙ্গে শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে।
পুষ্টিবিদ ও ব্র্যাকের ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ডের প্রধান সাইকা সিরাজ বলেন, হাম আক্রান্তের একটি কারণ অপুষ্টি। মানুষ যেখানে বেঁচে থাকতে হিমশিম খায়, সেখানে কীভাবে তারা পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করবে? তবে কারা অপুষ্টিতে আক্রান্ত, এটি শনাক্তে উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ডা. আব্দুস সবুর খান, ডা. তাজুল ইসলাম এ বারি, ডা. নজরুল ইসলাম, ডা. সৈয়দ আব্দুল হামিদ, ডা. চিরঞ্জিত দাস, ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, ডা. হুমায়ুন কবির হিমু প্রমুখ।
সংক্রমণ চিত্র
হাম ও হামের উপসর্গে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ৯ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে তিন শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের উপসর্গ ছিল ছয়জনের শরীরে। এ সময়ে সারাদেশে আরও ৯৪৬ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আর ২৪ ঘণ্টায় ৪৮৯ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে, অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৩৫ শিশু।
অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, হাম শনাক্ত হয়ে বরিশালে তিন শিশু মারা গেছে। আর হামের উপসর্গে ঢাকায় ৩, খুলনায় ২ ও সিলেটে এক শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ২৯১ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৬১ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৪৭ হাজার ৬৫৬ শিশুর শরীরে। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৩ হাজার ৬৩১টি শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ২৯ হাজার ৭৪৬ শিশু। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে ৬ হাজার ৯৭৯ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।