ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আরবি বিভাগের ছাত্র মনির উদ্দিন। থাকতেন শেখমুজিবুর রহমান হলে। গ্রামের বাড়ি ফেনী; বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রি। দুই ভাই ও তিন বোনের সংসারে মনির ছিলেন সবার বড়। পরিবারের স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষে পরিবারের হাল ধরবেন মনির। কিন্তু ছাত্রলীগের নির্যাতনে সব শেষ হয়ে যায় তার। নিভে যায় একটি পরিবারের জ্বলে থাকা শেষ আশার প্রদীপটি।
ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে ২০১০ সালের ৩ মার্চ রাতে মনিরকে মারতে মারতে ছাদে নিয়ে যায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। পরে আবার গেস্টরুমে এনে রাতভর নির্যাতন চালানো হয় তার ওপর।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনরা জানান, মনিরকে হলের ছাদে নিয়ে গলায় ছুরি ধরে ‘জবাই’ করার হুমকি দেয় ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। মেরে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার জন্য উদ্যত হয় তারা। পরে আবার নিচে এনে হলের ‘গেস্টরুমে’ সারা রাত নির্যাতন চালানো হয়। সেখান থেকে হাসপাতালে না পাঠিয়ে সকালে প্রক্টরিয়াল টিমের মাধ্যমে মনিরকে পুলিশে দেয় ছাত্রলীগ। সেই থেকে শারীরিক নানা জটিলতায় ভোগার পাশাপাশি মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন মনির। পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করতে আসা মনির এখন ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্নে মৃত্যুভয়ে আঁতকে ওঠেন। সেদিনের নির্যাতনের পর থেকে তার লিভারে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। সেই থেকে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি।
জানা গেছে, সেই রাতে মনির ছাড়াও বেশ কয়েকজনকে নির্যাতন করা হয়েছে। এর মধ্যে মনিরের ওপর নির্যাতনের মাত্রা এতই ব্যাপক ছিল যে, তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তার এক মামা ও ঢাবির সাবেক শিক্ষার্থী ওমর ফারুকের সঙ্গে গত সপ্তাহে যোগাযোগ করে আমার দেশ। ফারুক জানান, সেই নির্যাতনের পর শারীরিক ও মানসিক বিপর্যস্ততা আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি মনির। এখন পর্যন্ত বিয়ে বা চাকরি কিছুই জোটেনি তার কপালে। পড়ালেখা করে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও মাস্টার্সও কমপ্লিট করা হয়নি তার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মনিরের এক সহপাঠী জানান, পরিবারে একমাত্র মনিরই পড়ালেখা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তার এমন ঘটনার পর পরিবারের অন্যরাও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তাদের পরিবারের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, শেষবার যখন বাড়ি গিয়েছিলাম, তখনো দেখেছি, তাদের ঘরের পাতার বেড়া ঝরে ঝরে পড়ছে। এমন পরিবারের পক্ষে মনিরের চিকিৎসা তো দূরের কথা, ভরণপোষণই দুঃসাধ্য বিষয়। তবে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া গেলে এখনো মনিরের পক্ষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আশা সম্ভব বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।
অন্যদিকে, ২০১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নিজের ক্যালকুলেটর ফেরত চাওয়ায় ঢাবির সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তিন দফা নির্যাতন চালায় দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের তখনকার দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এহসান রফিকের ওপর। এতে তার একটি চোখ ও মস্তিষ্ক বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বিদেশে তার চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের বেশ কজনকে হল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তারা হলেই থাকত। উল্টো চোখের অনিশ্চয়তা ও জীবনাশঙ্কা নিয়ে প্রথমে হল এবং পরে দেশের মাটি ছেড়ে দেন ড. জিগাবো কানো জুডো প্রতিযোগিতায় ২০১৭ সালে রানার্সআপ হওয়া এহসান।
শুধু মনির কিংবা এহসানই নন, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের দুঃশাসনে ২০০৯-২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে ঢাবিতে দুই শতাধিক ঘটনায় অন্তত ৩৬১ জন ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সে হিসাবে প্রতিবছর গড়ে নিষিদ্ধ সংগঠনটির নেতাকর্মীদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ঢাবির প্রায় ২৪ শিক্ষার্থী। আর প্রতি মাসে অন্তত দুজন ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে নিষিদ্ধ সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নির্মমভাবে খুন হন একজন। এর মধ্যে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে নিহত হন স্যার এএফ রহমান হলের ছাত্র আবু বকর, যার বিচার আজও পায়নি তার পরিবার।
ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী নির্যাতন নিয়ে কাজ করা বিচার ফাউন্ডেশন, ‘ক্যাম্পাস নিপীড়ন-প্রতিরোধ সমাজ’, স্টুডেন্ট অ্যাগেইনস্ট টর্চার (স্যাট) এবং প্রথম সারির বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইনের সংবাদে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের শিকার সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২০০৯ সালে ছয়জন, ২০১০ সালে সাত, ২০১১ সালে ১১, ২০১২ সালে ১২, ২০১৩ সালে ৪১, ২০১৪ সালে ২৩, ২০১৫ সালে ১৪, ২০১৬ সালে চার, ২০১৭ সালে ৩২, ২০১৮ সালে সর্বোচ্চসংখ্যক ৬৪, ২০১৯ সালে চার, ২০২০ সালে ছয়, ২০২১ সালে ছয়, ২০২২ সালে ৩০ এবং ২০২৩ সালে ১০ শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর তথ্যমতে, বিগত সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন; কিন্তু নানা কারণে খবরের অংশ হননিÑএমন রয়েছেন ৬১ জন। তারাও ফ্যাসিবাদী আমলে গেস্টরুম, গণরুমে কিংবা ক্লাস-পরীক্ষা দিতে এসে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তবে চাকরিতে সমস্যা হওয়ার ভয়ে এবং ছাত্রলীগের আরো নিপীড়নের শঙ্কায় এতদিন আইনের শরণাপন্ন হননি তাদের অনেকেই। তবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মুখে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের পতন ও স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার ভারতে পালানোর পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলাসহ ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী হন তারা।
উল্লেখ্য, কেবল একক ব্যক্তি ও গেস্টরুম, গণরুমে নির্যাতনের সেসব ঘটনা এখানে স্থান পেয়েছে। তবে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিরোধীদের ওপর সংঘটিত হামলায় ভুক্তভোগীদের সংখ্যা এখানে উল্লেখ করা হয়নি। সেটি ধরা হলে এ সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যেত বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
জড়িত ছাত্রলীগের দুই হাজারের বেশি নেতা
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিটি নির্যাতনের ঘটনায় গড়ে সর্বনিম্ন পাঁচজন করে জড়িত ধরলেও ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের এসব ঘটনায় জড়িত ছিল নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রায় দুই হাজার নেতা। জড়িত কর্মীর সংখ্যা ছিল এর কয়েকগুণ। ভুক্তভোগীদের দাবি, ফৌজদারি অপরাধ করেও ছাত্রলীগের নিপীড়ক নেতাকর্মীদের অনেকে এখনো সরকার ও প্রশাসনের বিভিন্ন পদে কর্মরত। অন্যদিকে ভুক্তভোগীরা জীবন নিয়ে সংগ্রাম করছেন। দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তারা বিচারটুকুও পাচ্ছেন না। সে কারণে নির্যাতনকারীদের আইনের আওতায় আনা, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং নিপীড়নের কারণে শিক্ষাজীবন শেষ করতে না পারাদের জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তারা।
৫০টির বেশি কক্ষ ছিল ‘টর্চার সেল’
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের সময়ে ঢাবির ১৩টি ছাত্র হলে ৫০টির বেশি কক্ষ ব্যবহৃত হতো ছাত্রলীগের ‘টর্চার সেল’ হিসেবে। এসব কক্ষে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতেন অনেক শিক্ষার্থী। বিশেষ করে হল ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের কক্ষগুলো এ ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হতো।
আবার পরিবেশ-পরিস্থিতিতে কখনো অতিথি কক্ষ, হলের ছাদ, মাঠ কিংবা গণরুমগুলোও ‘টর্চার সেল’ হয়ে উঠত। তবে নির্যাতনের পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীকে হাসপাতালে না নিয়ে পুলিশে সোপর্দ করা হতো। আবার কাউকে কাউকে হল থেকে তাড়িয়ে দিয়ে সিট দখল করা হতো। আধিপত্য বিস্তারে নিজ সংগঠনের পদধারী নেতাকেও ছাত্রদল-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ভুয়া অভিযোগে পিটিয়ে হলছাড়া করার একাধিক ঘটনা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
আসন সংকট পুঁজি করে চলত ‘গণরুম-গেস্টরুম’
ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা গেছে, আবাসিক হলগুলোর আসন সংকটকে পুঁজি করে আধিপত্য বিস্তার করত ছাত্রলীগ। সংগঠনটির কর্মসূচিতে কর্মী বাড়াতে নানা কৌশলে তারা নবীন শিক্ষার্থীদের গণরুম-গেস্টরুমে যেতে বাধ্য করত। অনেকে পড়াশোনাটা শেষ করার জন্য ছাত্রলীগের নির্দেশনা মেনে হলে উঠতে বাধ্য হতো।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শুধু ছেলেদের নয়, মেয়েদের হলেও ছিল শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনা। কিন্তু ছাত্র হলের তুলনায় সে সংখ্যা ছিল খুবই কম। তবে সে সময়ে বরাবরই ছাত্রলীগের দাবি ছিলÑঢাবি ছাত্রলীগের গণরুম-গেস্টরুম থাকলেও কোনো ‘টর্চার সেল’ নেই। আর আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা তো গেস্টরুম নির্যাতনের কথা স্বীকারই করতেন না।
জুলাই বিপ্লবের পর গেস্টরুম-গণরুম প্রথামুক্ত শিক্ষার্থীরা
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দীর্ঘ ২৮ বছরের অচলাবস্থার পর ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনের পর ‘গেস্টরুম’ সংস্কৃতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসে। তবে গণরুমের অবস্থা অনেকটা আগের মতোই থেকে যায়। ছেলেদের হলগুলোতে আটজনের কক্ষে গণরুমে থাকতে হতো হলভেদে ২৫-৩০ জনকে। মূলত সিটের রাজনীতিকে কেন্দ্র করেই এ গণরুম-গেস্টরুম প্রথা তৈরি হয়। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর এই সংস্কৃতি উঠে যায়।
ছাত্রদল-শিবির ট্যাগ দিয়ে নির্যাতন
ভুক্তভোগীদের দাবি, শিবির-ছাত্রদল ট্যাগ দেওয়াটা ছিল নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাদের নির্যাতন ও স্বার্থসিদ্ধির একটি অপকৌশল। এর মধ্য দিয়ে হীন ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতেন সংগঠনটির নেতারা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শেখ মুজিব নিহত হওয়ার মাস আগস্টে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করত ছাত্রলীগ। সেই কর্মসূচিতে না যাওয়া, কিংবা কর্মসূচিতে কমসংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতির ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঘটত নির্যাতনের ঘটনা। অন্যদের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার করতে কাউকে কাউকে প্রকাশ্যেই মারা হতো। এছাড়া ছাত্রলীগের হল, বিশ্ববিদ্যালয় ও কেন্দ্রীয় কমিটির আগে-পরে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ট্যাগ দিয়েও নির্যাতন চালানো হতো। এর দুটি কারণ ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। একটি হলো ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের প্রতি নির্মমতা দেখানোর মাধ্যমে কমিটিতে শীর্ষ পদে আসা; অন্যটি হলো সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে ট্যাগ দিয়ে হল থেকে বের করে স্বার্থসিদ্ধি করা।
এর পাশাপাশি কোনো শিক্ষার্থীর দামি মোবাইল, ল্যাপটপ কিংবা ব্যবহারের অন্যান্য জিনিস হাতিয়ে নিতেও ছাত্রশিবির ট্যাগ দিয়ে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ঢাবির বিজয় একাত্তর হলের একাধিক ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতা আবু ইউনুসের বিরুদ্ধে একাধিকবার এ অভিযোগ পাওয়া যায়। এমনকি যৌক্তিক কোনো দাবি উপস্থাপন কিংবা সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেও নেমে আসত নির্যাতনের অভিশাপ।
গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৫ বছরে ঢাবির দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীকে হল ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। ‘ছাত্রদল-শিবির’ করার অভিযোগে এদের অধিকাংশকে নির্যাতনের পর পুলিশে দেওয়া হয়; কিন্তু অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে তাদের অনেককে থানা থেকে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অনেকে আবার বিভিন্ন মামলায় জেলে গেছেন। এর মধ্যে অন্তর্কোন্দলের কারণে স্যার এএফ রহমান হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ছাত্রলীগের পদধারী নেতাকেও ‘ছাত্রদল-শিবির’ অভিযোগে পিটিয়ে হলছাড়া করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিতে এসে ছাত্রদল ও শিবিরের অনেকে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া ছিল ‘আই ওয়াশ’
ভুক্তভোগীদের দাবি, ঢাবিতে ছাত্রলীগের নিপীড়নের ঘটনাগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই সাময়িক উত্তেজনা এড়াতে দু-একজনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের কৌশল অবলম্বন করা হতো। তবে সেটি ছিল আই ওয়াশ। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ, বিশ্ববিদ্যালয় ও হল শাখার কমিটি ঘোষণার আগে বহিষ্কারাদেশ তুলে নিয়ে অনেককে কমিটিতে স্থান দেওয়া হতো। আবার হল থেকে বহিষ্কার দেখানো হলেও নিপীড়করা হলে অবস্থান করত নির্দ্বিধায়। যে কারণে এক সময় ছাত্রলীগের উচ্ছৃঙ্খল ও স্বার্থান্বেষী নেতাকর্মীদের মধ্যে এ মনোভাব ফুটে ওঠে যে, ‘নির্যাতন করলেও আসলে পার পাওয়া যায়’।
এছাড়া বিরোধী মতের শিক্ষার্থী কিংবা বিরোধী ট্যাগিংয়ে নির্যাতনকারীদের আরো বড় পদ দিয়ে পুরস্কৃত করা হতো। এ কারণে অনেক সময় ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকেও রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা চালাত নিষিদ্ধ সংগঠনটির কেউ কেউ।
আ.লীগের দলবাজ শিক্ষকরাও দায়ী
ঢাবিতে গেস্টরুম নির্যাতনের পেছনে আওয়ামী লীগের দলবাজ শিক্ষকদেরও দায় দেখছেন ভুক্তভোগীরা। সূত্র বলছে, ২০২৩ সালের ২১ জুন সিনেটের অধিবেশনে বিএনপি সমর্থিত সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক লুৎফর রহমান ছাত্রলীগের হামলা ও বিরোধী মত দমনের অভিযোগ তুলে এর প্রতিবাদ জানান। পাশাপাশি গেস্টরুম নির্যাতনের অভিযোগও তোলেন তিনি।
এরপর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে অধ্যাপক এম অহিদুজ্জামান, আবদুর রহিমসহ আওয়ামীপন্থি নীল দলের কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেন, ঢাবিতে গেস্টরুম নির্যাতন নেই। অন্যদিকে ‘গেস্টরুম নির্যাতন শব্দের সঙ্গে পরিচিত নই’ উল্লেখ করে উপাচার্য আখতারুজ্জামান বক্তব্যের সংশ্লিষ্ট অংশ ‘এক্সপাঞ্জ’ করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সিনেটে থাকা অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলামসহ সাদা দলের শিক্ষকদ্বয় অধিবেশন বর্জন করে বের হয়ে যান।
নিপীড়নবিরোধী অ্যাক্টিভিজমেও আপত্তি ছাত্রলীগের
শুধু শিক্ষার্থী নির্যাতনেই সীমাবদ্ধ ছিল না ছাত্রলীগ; বরং এটি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ছাত্রলীগের রোষানলে পড়তে হয়েছে অনেককে। এ বিষয়ে স্টুডেন্ট অ্যাগেইনস্ট টর্চারের (স্যাট) প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক সালেহ উদ্দিন সিফাত আমার দেশকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকে গেস্টরুম কালচারের নামে শিক্ষার্থীদের ভয়াবহ নির্যাতন করত ছাত্রলীগ। কিন্তু এসবের কোনো প্রোপার ডকুমেন্টেশন আমরা তখন পাইনি। ফলে এসব নির্যাতনের ঘটনা নথিবদ্ধ করা, ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা এবং তাদের জন্য অ্যাক্টিভিজম করার লক্ষ্যে আমরা স্যাট গঠন করেছিলাম। এসব কাজ করতে গিয়ে আমরা কয়েক দফা ছাত্রলীগের হামলা ও নির্যাতনের শিকার হই, তবুও দমে যাইনি।’
‘নিপীড়নের দুষ্টুচক্রে’ বিচারবঞ্চিত ভুক্তভোগীরা
ভুক্তভোগী ও স্বজনদের দাবি, বিচার দূরে থাকÑঅনেক সময় থানায় অভিযোগও নেওয়া হতো না। এমনকি স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পরও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এসব ঘটনার মামলা নিতে অনীহা দেখা গেছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সে কারণে এখনো বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কূলকিনারা পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। এ ক্ষেত্রে ‘নিপীড়নের দুষ্টুচক্রকে’ দায়ী করছেন তারা।
একাধিকবার ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হন ইতিহাস বিভাগের ২০০৯-১০ সেশনের শিক্ষার্থী ফখরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হলো মামলা করতে গেলে থানা বলে মেডিকেল ডকুমেন্টস নিয়ে আসুন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের নির্যাতনের পর থানায় দিয়ে দেওয়া হতো। চিকিৎসাও নিতে পারতাম না। এ কারণে মামলা করার জন্য মেডিকেল ডকুমেন্টসও জোগাড় করা সম্ভব হতো না। বিচার না পাওয়ার সঙ্গে এর অনেক বিষয়ই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। থানা-পুলিশ একদিকে আমাদের মামলা নিত না, অন্যদিকে চিকিৎসাও পাইনি। চিকিৎসার প্রমাণপত্রের জন্য বিচার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি। এ যেন নিপীড়নের আরেক দুষ্টুচক্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়ে ফখরুল বলেন, ‘যারা আমাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, তারা এখন সরকারের ভালো জায়গায় আছে। আমার দাবি হলোÑযারা নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, মেডিকেল ডকুমেন্টস ছাড়া মামলা নেওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা রাখা, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং যারা মাস্টার্স শেষ করতে পারেনি, তাদের জন্য বিশেষ বিবেচনায় পুনরায় শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হোক।’
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
ক্যাম্পাসে নির্যাতিতদের নিয়ে কাজ করা বিচার ফাউন্ডেশনের প্রজেক্ট ম্যানেজার মির্জা গালিব শিশির আমার দেশকে বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মামলা নিতে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করেনি। এতদিন চেষ্টা করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মাত্র দুটি মামলা দিতে আমরা সক্ষম হয়েছি। এর একটি শাহবাগ থানায়; অন্যটি নিউ মার্কেট থানায়। কিন্তু সেগুলোর চার্জশিট বা আসামিদের ধরার ব্যাপারে পুলিশের তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর যথাযথ প্রতিকারের উদ্যোগ নিলে ভুক্তভোগীদের অনেকে অভিযোগ প্রকাশ করতে সাহস পাবেন।
মামলার অগ্রগতি জানতে শাহবাগ ও নিউ মার্কেট থানার ওসির মোবাইল ফোনে কল দিলেও তারা রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।
এসব বিষয়ে ঢাবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে আমরা অবগত। আমি নিজেই ওই সময় এসব বিষয়ে একাধিকবার প্রতিবাদ জানিয়েছি। এখন আমরা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করব। ক্ষতিগ্রস্তদের শিক্ষাজীবন যেন পূর্ণতা পায়, সেজন্য আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’