ইতিহাসের পাতায় আবু জাহল নামটি এক অন্ধকার প্রতীকের মতো জ্বলজ্বল করে। তার জীবন ছিল কপটতা, অহংকার ও সত্যবিমুখতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। সে শুধু নিজে পথভ্রষ্ট ছিল না, বরং অন্যদেরও সত্যের পথ থেকে সরিয়ে রাখতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করত। সে সময় আরব সমাজ ছিল চরম অবক্ষয়ের মধ্যে নিমজ্জিত—অন্যায়, অত্যাচার, কুসংস্কার, এবং নৈতিক অবনতির এক ভয়াবহ সমুদ্রে ডুবে ছিল। মানুষ এক আল্লাহকে ভুলে গিয়ে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়েছিল, গোত্রীয় সংঘর্ষ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা, আর কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর প্রথাও তখন প্রচলিত ছিল।
এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে আলোর দিশা নিয়ে আসেন হজরত মুহাম্মাদ (সা.)। তিনি মানুষের সামনে সত্য, ন্যায় এবং কল্যাণের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তাঁর প্রচারিত ইসলাম ছিল মানবমুক্তির এক অনন্য পথ, যা মানুষকে অজ্ঞতা ও অন্যায়ের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে সক্ষম। কিন্তু আবু জাহল এবং তার অনুসারীরা এই আলোকে গ্রহণ করতে পারেনি। বরং তারা এই আলোর বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয় এবং নবীজির (সা.) ওপর ও তাঁর অনুসারীদের ওপর চরম নির্যাতন চালায়।
আবু জাহলের এই বৈরিতার ধারাবাহিকতা দেখা যায় তার ছেলে ইকরিমা ইবনে আবু জাহলের মধ্যেও। পিতার মতো তিনিও ইসলামের ঘোর বিরোধী ছিলেন। ইসলামের প্রতি তার বিদ্বেষ ছিল গভীর ও প্রবল। মুসলমানদের ওপর নির্যাতন চালানো, তাদের অপমান করা—এসবই ছিল তার দৈনন্দিন কাজ। ইসলামের আলো তার হৃদয়ে পৌঁছাতে পারেনি; বরং এই আলো ছড়িয়ে পড়তে দেখে তার অন্তরে আরও বেশি ক্ষোভ জন্ম নেয়।
কিন্তু সত্যের আলো চিরকালই অন্ধকারকে পরাজিত করে। ধীরে ধীরে ইসলামের দাওয়াত মক্কার প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের হৃদয়ে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তে থাকে, তাদের শক্তিও বৃদ্ধি পায়। এরই ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ। এই যুদ্ধে সংখ্যায় ও শক্তিতে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও মুসলমানরা আল্লাহর সাহায্যে বিজয় অর্জন করে। কাফেরদের জন্য এটি ছিল এক বড় ধাক্কা। এই যুদ্ধে আবু জাহল নিহত হন। তবে তার ছেলে ইকরিমা বেঁচে ফেরেন।
এরপর সময়ের প্রবাহে আরও বহু যুদ্ধ সংঘটিত হয়, এবং প্রতিবারই ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত—মক্কা বিজয়। মহানবী (সা.) দশ হাজার সাহাবী নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন এবং প্রায় বিনা রক্তপাতে শহরটি জয় করেন। যারা এক সময় মুসলমানদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল, তারাই সেদিন ভয়ে কাঁপছিল। তারা ভেবেছিল প্রতিশোধের আগুনে তাদের জীবন শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু নবীজি (সা.) ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের অধিকারী। তিনি প্রতিশোধ নয়, বরং ক্ষমাকে বেছে নিলেন। তাঁর এই অভূতপূর্ব উদারতা ও দয়ার মনোভাব মানুষকে বিস্মিত করে দেয়। যারা তাঁর চরম শত্রু ছিল, তাদের অনেককেই তিনি ক্ষমা করে দেন। এই মহানুভবতা মানুষের হৃদয় জয় করে নেয় এবং তারা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে।
মক্কা বিজয়ের দিন মক্কার যে অল্প কয়েকজন মানুষ অস্ত্র হাতে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করেছিলেন, ইকরিমা ছিলেন তাদের অন্যতম। নিজের কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে খালিদ ইবনে ওয়ালিদের (রা.) নেতৃত্বাধীন মুসলমানদের একটি ছোট দলের ওপর আক্রমণ করেছিলেন তিনি। মুসলমানদের ছোট দলটি তাদের পরাজিত করে এবং ইকরিমা পালিয়ে যান। নিজের অতীত কর্মকাণ্ড ও মক্কা বিজয়ের দিনও তিনি যা করেছেন, সব কিছু সামনে রেখে স্বাভাবিকভাবেই তার মনে হয়েছিল নবীজি (সা.) কোনোভাবেই তাকে ক্ষমা করবেন না। তাই তিন মক্কা ছেড়ে জেদ্দার উপকূল থেকে নৌকায় করে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সমুদ্রের ভয়ঙ্কর ঝড় তাকে বিপদের মুখে ফেলে দেয়। এই সংকটময় সময়ে তার স্ত্রী উম্মে হাকিম তাকে খুঁজে বের করেন এবং নবীজির (সা.) পক্ষ থেকে নিরাপত্তার বার্তা দেন।
প্রথমে ইকরিমা এই সংবাদ বিশ্বাস করতে পারেননি। কিন্তু তার স্ত্রী বারবার আশ্বাস দেন, তার মত অনেককেই নবীজি (সা.) ক্ষমা করেছেন এটাও জানান। অনেক ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত তিনি নবীজির (সা.) কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
নবীজি (সা.) তাকে দেখে নিজেই এগিয়ে আসেন এবং তাকে আলিঙ্গন করেন। এই আচরণ পুরনো ইকরিমাকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়। যে মানুষটিকে সে এতদিন চরম শত্রু ভেবেছিল, সেই মানুষই তাকে এমন ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করছেন বিজয়ী হওয়ার পরও—এটা তার হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি অনুতপ্ত হয়ে নিজের ভুল স্বীকার করেন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
ইকরিমা আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন, তিনি তার অতীতের সব অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করবেন। তিনি বলেন, ইসলামের যতটা বিরোধিতা তিনি করেছেন, ইসলামের জন্য তার দ্বিগুণ কাজ করবেন। নবীজি (সা.) তার জন্য দোয়া করেন এবং তাকে সাদরে গ্রহণ করেন।
এরপর ইকরিমার জীবনে ঘটে আমূল পরিবর্তন। তিনি পুরোপুরি বদলে যান। ইসলামের প্রতি তার ভালোবাসা ও নিষ্ঠা তাকে এক নতুন মানুষে পরিণত করে। জীবনের বাকি পুরোটা সময় তিনি ইসলামের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। একসময় যিনি ইসলামের চরম শত্রু ছিলেন, তিনিই হয়ে ওঠেন ইসলামের একজন নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক।
নবীজির (সা.) নেতৃত্বে সংঘটিত পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে এবং আবু বকরের (রা.) খেলাফতকালে মুরতাদ ও ভণ্ড নবীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ওমরের (রা.) খেলাফতকালে ৬৩৪ সালে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আজনাদায়নের যুদ্ধে অথবা ৬৩৬ সালে ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।