চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে গড়া ওঠা তারুণ্যনির্ভর রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জুলাই অভ্যুত্থানের মূলমন্ত্র পুরোনো বন্দোবস্তের পরিবর্তন এনে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের কথা বারবার বলে আসছে দলটি।
দলের শীর্ষ নেতারা বলছেন, এনসিপি অন্তর্ভুক্তিমূলক মধ্যমপন্থার রাজনীতির মাধ্যমে দেশের মধ্যকার বিভাজন ঘোচাতে চায়। বিভাজনবাদী রাজনীতিকে ছাপিয়ে একটা রাষ্ট্রবাদী রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে তারা কাজ করছেন।
গত বছরের ৪ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনে এক দফা ঘোষণার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ২৪ দফা ঘোষণা করে এনসিপি। তাতে পরিবারতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিলোপ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকল্যাণমুখী সেকেন্ড রিপাবলিক গঠনের কথা বলা হয়।
সেখানে রাষ্ট্রের একাধিক বিষয়ে ২৪টি ইশতেহার দেয় দলটি। এ ইশতেহারগুলো থেকে দলটির আগামীর পথক্রম সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
এনসিপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, এনসিপির কিছু কার্যক্রমে জাতীয়তাবাদের উপাদান রয়েছে। তবে এটি জাতীয়তাবাদী দল নয়। একইসঙ্গে এটি ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু ধর্মীয় রাজনীতি করে না। বরং একটি রাজনৈতিক জনগগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে দলটি কাজ করবে।
নেতারা আরও জানান, এনসিপি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ বিশ্লেষণ করে যেসব বিষয় ভালো এবং এদেশের সঙ্গে মানানসই, সেসব বিষয় তাদের দলের নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
এ বিষয়ে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বাংলানিউজকে বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র তো ৫৫ বছর হয়ে গেছে। যেকোনো রাষ্ট্র দল মতের ঊর্ধ্বে উঠে তার দায়িত্বের জায়গা থেকে মূলত নাগরিকের অধিকারগুলো রক্ষা করে। মানুষের নাগরিক হিসেবে মানবিক মর্যাদা থাকে। এটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে বাস্তবায়ন হয়নি। বিএনপি জাতীয়তাবাদের কথা বলছে, আওয়ামী লীগ তার আগে বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেছে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রে জনগণ নাগরিক হয়ে উঠতে পারেনি। সে জায়গা থেকে আমরা বলি-দল, মত, ধর্ম, আর্থিক অবস্থা-সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যেক মানুষের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। এটা একেবারে মূল জায়গা আমাদের। এছাড়া একটি গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রগঠনের দিকে আমাদের নজর রয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের মধ্যমপন্থার জায়গাটা হলো একটি গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে অপর গোষ্ঠীর অধিকার হরণের ঘটনা যেন না ঘটে। এটাকে আমরা বলছি, অন্তর্ভুক্তিমূলক মধ্যমপন্থা। সেখানে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি সবকিছুকে বিবেচনায় রাখার বিষয়টা রয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রগঠনের দিকে আমাদের নজর রয়েছে।
দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বাংলানিউজকে বলেন, বাংলাদেশে যে ধরনের মতাদর্শিক বিভাজনগুলো আছে, যেমন ধরুন মৌলবাদ বনাম সেক্যুলারিজম বা ইসলাম বনাম প্রগতি-এ মতাদর্শগুলো আমাদের সামনে এগোতে দিচ্ছে না। জনগোষ্ঠী হিসেবে বিভক্ত করছে। আমাদের মধ্যমপন্থা হলো এ মতাদর্শিক বিতর্কগুলোকে ছাপিয়ে যাওয়া।
তিনি বলেন, কিন্তু আমাদের রাজনীতি হচ্ছে গঠনের রাজনীতি। আমরা রাষ্ট্র প্রকল্প নিয়ে আমরা কাজ করি। আমরা মতাদর্শ নিয়ে আগ্রহী না।
মধ্যমপন্থী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি বজায় রাখতে জাতীয় নাগরিক পার্টি একাধিক ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় নিজেদের রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করছে।
৫ মে শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড দিবসকে স্মরণ করে দলটি আলোচনা সভা আয়োজন করেছে। যেখানে তারা ওই দিনের নিহতদের শহীদের স্বীকৃতি এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছে। একইসঙ্গে দলটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন, পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসবও পালন করছে। দুটি ঘটনা থেকে এনসিপির রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
তবে এক্ষেত্রে এনসিপি এটাও ঠিক, আবার ওটাও ঠিক, এমন ধোঁয়াটে অবস্থান নেবে না বলে জানান সরোয়ার তুষার। তিনি বলেন, আমরা যে বিভাজনগুলো ছাপিয়ে যাওয়ার কথা বলছি, তার মানে এই নয় যে, এনসিপি নীতির প্রশ্নে ধোঁয়াটে অবস্থান নেবে।
মতাদর্শিক রাজনীতির বাইরে জাতীয় নাগরিক পার্টি রাষ্ট্রবাদী রাজনীতি করবে বলে জানান তিনি। যেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হচ্ছে ‘রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী’। বাংলাদেশ ভূখণ্ডের মানুষের ধর্ম যাই হোক, তারা এ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর একজন সদস্য এবং তাদের জন্য একটি রাষ্ট্র নির্মাণে এনসিপি কাজ করবে।
তুষার বলেন, সে কারণে আমরা সংস্কার নিয়ে সিরিয়াস। সংবিধান নিজেই যে বিভাজন উসকে দেয়, তা আমরা দেখতে পাই। এজন্য আমরা মতাদর্শিক রাজনীতির মধ্যে খুব একটা পড়ি না।
এখানেই পোস্ট-আইডিওলজি কথাটা আসে। অর্থাৎ বিবদমান আইডিয়াগুলোকে ছাপিয়ে সবাইকে ধারণ করার একটি জায়গা তৈরি করা, যোগ করেন তিনি।
এনসিপির ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা বাংলানিউজকে বলেন, নিজেদের এ জায়গাটা এনসিপির ডিফাইন করা দরকার৷ কেননা দলটি মধ্যপন্থার কথা বলছে। এ বিষয়টির সংজ্ঞা দেওয়া জরুরি। কেননা এ নিয়ে একটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল। এ দলের নেতৃত্বে যারা আছেন, তারা জুলাই আন্দোলনের অগ্রগামী সৈনিক। ফলে এ দল নিয়ে প্রত্যাশাও অনেক বেশি ছিল। তবে দল গঠনে একটা তাড়াহুড়া দেখা গেছে। তারপরও দলটির সম্ভাবনা আছে। কেননা এখানে নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আব্দুল্লাহর মতো নেতা আছেন। তাই আমার মনে হয়, অন্যান্য দল থেকে তারা যে আলাদা, এ বিষয়টি নিয়ে তাদের নিজদের অবস্থান সংজ্ঞায়িত করা জরুরি। এটা না হলে দলটি এগোতে পারবে না। তরুণ এবং ভাসমান ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারবে না।