Image description

দেশের অন্যতম আলু উৎপাদনকারী জেলা জয়পুরহাটে প্রান্তিক কৃষকদের জন্য নির্মিত অহিমায়িত আলু সংরক্ষণাগারগুলো কার্যত উদ্দেশ্যহীন স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং টেকসই বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে সরকারের কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মডেল ঘরগুলো এখন কোথাও বসতঘর, কোথাও গুদাম, আবার কোথাও রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অধিকাংশ ঘরেই নেই আলুর কোনো অস্তিত্ব।

 

কৃষকদের অভিযোগ, নির্মাণগত ত্রুটি, প্রয়োজনীয় উপকরণের ঘাটতি, অপর্যাপ্ত তদারকি এবং সংরক্ষণ উপযোগী পরিবেশের অভাবে এসব ঘরে আলু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রকল্পটির কার্যকারিতা শুরু থেকেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

 

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ‘আলুর বহুমুখী ব্যবহার, সংরক্ষণ ও বিপণন উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জয়পুরহাটের পাঁচ উপজেলায় ৫২টি অহিমায়িত মডেল ঘর নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। সে হিসাবে মোট ব্যয় প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

 

পাকা পিলারের ওপর বাঁশ, কাঠ ও টিন দিয়ে নির্মিত এসব ঘরে ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২৫ থেকে ৩০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণের পরিকল্পনা ছিল। কৃষকদের ক্যারেট, ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র, নেট, ত্রিপল ও স্প্রে মেশিন দেওয়ার কথাও ছিল। তবে অধিকাংশ কৃষকের দাবি, তারা প্রতিশ্রুত উপকরণের বেশির ভাগই পাননি।

 

 

সদর উপজেলার রাংতা গ্রামের কৃষক একাব্বর আলী বলেন, যে ঘর আলু রাখার জন্য দেওয়া হয়েছিল, সেখানে এখন আমরা থাকি। রান্নাবান্নাও করি। প্রতিশ্রুত মালামালের বেশির ভাগ পাইনি। ঠিকাদার নিজের টাকায় বাঁশ-বালু কিনতে বলেছিল, সেই টাকাও দেয়নি।

 

মীরগ্রামের কৃষক ইয়াহিয়া মিয়া বলেন, ঘরের ভেতর এত গরম হয় যে আলু দ্রুত পচে যায়। বৃষ্টির সময় পানি ঢোকে, নিচ দিয়ে ইঁদুর ঢুকে আলু নষ্ট করে। তাই আলু রাখা বাদ দিয়েছি।

 

একই চিত্র দেখা গেছে আক্কেলপুর উপজেলার রুকিন্দিপুর ও সদর উপজেলার পলিকাদোয়া গ্রামেও। কৃষকেরা জানান, সংরক্ষিত আলু নষ্ট হয়ে লোকসানের মুখে পড়ার পর তারা বাধ্য হয়ে ঘরগুলো গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করছেন। কোথাও মাছ-মুরগির খাদ্য রাখা হচ্ছে, কোথাও আসবাবপত্র কিংবা জ্বালানির খড়।

 

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, সামান্য রক্ষণাবেক্ষণ করলেই এসব মডেল ঘর ১৫ থেকে ২০ বছর ব্যবহারযোগ্য থাকার কথা। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অধিকাংশ ঘরের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, পর্যাপ্ত কারিগরি পরিকল্পনার অভাব এবং নিয়মিত তদারকির ঘাটতিই এই ব্যর্থতার মূল কারণ। তাদের দাবি, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় ঘরগুলো সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করে আলু সংরক্ষণের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।

 

জয়পুরহাট জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) রতন কুমার রায় বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নির্মিত ৪০টি ঘরের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কিছু উপকরণ দেওয়া হয়েছিল। তবে পরের বছরে নির্মিত ১২টি ঘরে শুধু ত্রিপল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। অন্য উপকরণের জন্য বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।

 

তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে আলু দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। আবার বাজারমূল্য কম থাকায় অনেক কৃষক দ্রুত আলু বিক্রি করে দেন। ফলে অনেক ঘর খালি পড়ে আছে।