আমাদের নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রবর্তিত ‘থ্রি জিরো’ বা তিন শূন্য তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা হয় বিভিন্ন মহলে। যুক্তরাষ্ট্রে যখন গিয়েছি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানে, তখন ড. ইউনূস বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা। সেসময় যাই করেন না কেন তিনি; মন্ত্রমুগ্ধের মতো একদলকে তাতে বাহবা দেয়। যেন তার চেয়ে ভালো শাসক আর কখনো পায়নি বাঙালি!
যাক; সে ভিন্ন আলাপ।
সেই ইউনূস নির্বাচন দিয়ে চলে যাওয়ার পরও নতুন থ্রি জিরোর প্রবক্তা হিসেবে নাম আসছে তার। আর তা হলো তিন শূন্য শূন্য (৩০০-এর অনেক বেশি) শিশুর মৃত্যু হামে।
কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা জানেন যে, বাংলাদেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে এ রোগ। যার জন্য দায়ী সাবেক ইন্টেরিম সরকার।
হ্যাঁ এটা সত্য দেশে হাম নতুন কোনো আতঙ্ক নয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞান স্পষ্ট বলছে; হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সময়মতো টিকা পেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব। আর আক্রান্ত হলেও সঠিক সময়ে চিকিৎসা মিললে অধিকাংশ শিশুই সুস্থ হয়ে ওঠে। তাহলে এত এত মৃত্যু কেন? কেন এখনো এমন দৃশ্য দেখতে হচ্ছে—যেখানে শিশুর জ্বর, র্যাশ আর শ্বাসকষ্ট ধীরে ধীরে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে! কী অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে যাচ্ছে এক একটি প্রাণ! বাবা-মায়ের কোলের ওপরে ফেলছে শেষ নিঃশ্বাস আমাদেরই ভবিষ্যৎ!
শত শত শিশুর মৃত্যুকে হত্যা না বলে কি উপায় আছে? হয়তো গণহত্যাও বললে ভুল হবে না। আইন অনুযায়ী, মানবতাবিরোধী অপরাধ বলাই যায়। কারণ উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইউনূস গং শিশুদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে, গণমৃত্যুতে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তারা।
এই সব প্রাণনাশের উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি ধাপ সামনে আসে। প্রথমত, টিকা ব্যবস্থার ফাঁক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকা সরবরাহে বিঘ্ন, সময়মতো কর্মসূচি বাস্তবায়নে ধীরগতি—এসব বিষয় নিয়ে স্বাস্থ্য খাতে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার সতর্ক করেছে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরের নীতিনির্ধারণের টেবিলে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ যখন আবার মাথা তোলে, তখন ধরে নিতে হয়- প্রতিরোধ ব্যবস্থার কোথাও না কোথাও ভাঙন ছিল। এর দায় প্রধান উপদেষ্টা আর স্বাস্থ্য উপদেষ্টার নিতে হবে সবার আগে। তাদের কাছে জবাব চাই। শত শত শিশু মারা যাওয়ার পরও জবাব তো দূরের কথা শোক-সমবেদনা জানাতে তাদের দেখলাম না।
দ্বিতীয়ত, চিকিৎসা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। অনেক শিশুই হাসপাতালে পৌঁছাচ্ছে দেরিতে, আর পৌঁছানোর পর দেখা যাচ্ছে- আইসিইউ নেই, অক্সিজেন সংকট, প্রশিক্ষিত জনবলও সীমিত। এতে রোগের জটিলতা বাড়ার পর চিকিৎসা কার্যত লড়াইয়ে পরিণত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি হঠাৎ সৃষ্ট নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা আর বিনিয়োগের ঘাটতির ফসল। সংস্কার বলে মুখে ফেনা তোলা সরকার এ খাতে কী অবদান বা পরিবর্তন করেছে তা জানার বড্ড ইচ্ছে।
তৃতীয়ত, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব। টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব কিংবা সমন্বয়ের অভাব- এসব সিদ্ধান্ত সরাসরি জনস্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। এখানেই আসে নেতৃত্ব ও যোগ্যতার প্রশ্ন। নীতিনির্ধারণে যারা ছিলেন- এর মধ্যে ড. ইউনূসের মতো প্রভাবশালী নেতৃত্ব এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা নূরজাহান বেগমের মতো কর্মকর্তারা; তাদের সিদ্ধান্ত ও তদারকি কি যথেষ্ট ছিল? সংকটের আগাম ইঙ্গিত কি তারা বুঝতে পেরেছিলেন? নাকি বিষয়টি অবহেলার স্তরেই থেকে যায়!
এই মৃত্যুগুলোকে শুধুই ‘দুর্ভাগ্য’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যখন একটি রোগ প্রতিরোধের উপায় জানা, টিকা সহজলভ্য হওয়ার কথা, আর চিকিৎসা ব্যবস্থাও ন্যূনতম মান বজায় রাখার কথা- তখন প্রতিটি মৃত্যু একেকটি ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। যা অপরাধ। এই অপরাধ গণহত্যার। যার বিচার এই বাংলার মাটিতে হতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যও জরুরি। যেসব শিশুরা সুস্থ হয়ে বাড়ি গেছে অন্তত প্রাণে বেঁচেছে। কিন্তু পরবর্তী জীবন তাদের ভোগাবে। মেধা বিকাশ বা স্বাভাবিক কাজকর্ম বাধাগ্রস্ত হবে। এই সংখ্যাটা অর্ধ লাখের দিকে ঊর্ধ্বমুখী। এ যেন ম্যাটিকুলাস ডিজাইন করে আরো একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো কাজ! কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এর উত্তর দিতে হবে সামনে।
বরাবরই ইউনিসেফ দেশে টিকা সরবরাহ করতো। যার অর্থায়ন হতো মূলত বিশ্বজুড়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে পরিচালিত টিকার জোট ‘গ্যাভি’ ও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে। অথচ টিকা কর্মসূচিতে ‘বিতর্কিত’ পরিবর্তন আনে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে দিয়ে ‘উন্মুক্ত দরপত্র’ পদ্ধতি সামনে এনে। ইউনিসেফ এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করে সতর্ক করেছিল ঢাকাকে। সংস্থাটি বলেছিল, এই নিয়ম টিকা ব্যবস্থা ব্যাহত করতে পারে এবং মহামারির ঝুঁকি তৈরি করবে। একবার নয়; বেশ কয়েকবার বলার পরও শুনেনি সরকার। নতুন দরপত্র প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যাওয়ায় টিকার মজুদ ফুরিয়ে যায় এবং নিয়মিত টিকা কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে। যা আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এই ধরনের সংকট আমাদের নতুন নয়। অতীতেও আমরা দেখেছি, সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হলে তার মাশুল গুনতে হয় সাধারণ মানুষকে, এই প্রেক্ষাপটে বলি শিশুরা। এবারের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে স্পষ্ট বোঝাই যাচ্ছে যে এমন অবস্থা ইচ্ছাকৃতভাবে ডেকে আনা হয়েছে। হাম শুধু একটি রোগ নয়; এটি একটি সূচক। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতার সূচক। যখন এই সূচক নেমে যায়, তখন বুঝতে বাকি নেই বাংলাদেশকে তারা কোথায় নিতে চেয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকে যায়—শত শত শিশুর মৃত্যু কি আমরা মেনে নেব স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে? নাকি জবাবদিহি করতে বাধ্য করা হবে? বর্তমান সরকারের কাছে অনুরোধ এই বিষয়ে কঠোর হোন। আপনাদের দায়িত্বটুকু পালন করুন। প্রতিটি ঝরে যাওয়া শিশুজীবন নীরবে বলে যায় বিচার অতি গুরুত্বপূর্ণ আগামীর কোনো ‘ইউনূসীয় ছেলেখেলা’ ঠেকাতে।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক; কানাডা।
কালের কণ্ঠ অনলাইন থেকে