স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং উপজেলা, জেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচনি প্রচারে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এসব নির্বাচনের আচরণ বিধিমালায় সংশোধনীর মাধ্যমে ইসি এ নিয়ম আরোপ করতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে নীতিগত এ সিদ্ধান্ত হয়। ইতোমধ্যে ইসি সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আচরণ বিধিমালা এবং নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা সংশোধনীর খসড়া তৈরি করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইসি জানিয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সুফল পাওয়া গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে পরিবেশদূষণ বন্ধ ও নির্বাচনি প্রচারে ভিন্নতা আসবে বলে মনে করছে কমিশন। দুজন নির্বাচন কমিশনার এবং একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্র: যুগান্তর প্রতিবেদন
সূত্রগুলো জানাচ্ছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংসদ-সদস্যরা প্রভাব বিস্তার করলে তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা নিয়েও ভাবছে ইসি। আগামী দিনে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে প্রতিটি উপজেলায় সংসদ-সদস্যদের জন্য কার্যালয় তৈরি করছে সরকার। এ অবস্থায় সংসদ-সদস্যরা উপজেলা কার্যালয়ে বসে নির্বাচনে যেন হস্তক্ষেপ করতে না পারেন, সে লক্ষ্যে আচরণ বিধিমালায় নতুন ধারা-উপধারা যুক্ত করার চিন্তা করছে ইসি।
এছাড়া নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালায় মনোনয়নপত্রের ফরমে পরিবর্তন, প্রার্থীর বিদেশে থাকা সম্পদের বিবরণ হলফনামায় উল্লেখ করা এবং দলীয় মনোনয়নে প্রার্থী হওয়া ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষর যুক্ত করার বিধান বাতিল করতে যাচ্ছে ইসি। অপরদিকে আচরণ বিধিমালায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার রোধে নতুন বিধান যুক্ত করা হবে। এক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় ইসি।
ইসির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি বছরের শেষদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে-এমনটি ধরে নিয়েই এসব প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। জেলা প্রশাসকদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছে ইসি। তাদের আরও বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে মানের হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেই মানের ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে। মঙ্গলবার জেলা প্রশাসন সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম, নাসির উদ্দিন ও চার নির্বাচন কমিশনার তাদের বক্তব্যে এসব নির্দেশনা দেন। এর মধ্য দিয়ে মূলত মাঠ প্রশাসনকে নির্বাচনের আগাম বার্তা দিল কমিশন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরিচালনা এবং আচরণ বিধিমালা সংশোধনের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার বিধান রেখে সংসদে আইন পাশ হয়েছে। ওইসব আইনের কপি আমরা পেয়েছি। আইন অনুযায়ী বিধিমালা সংশোধনের খসড়া তৈরি করতে কর্মকর্তাদের বলেছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন কোন সময়ে শুরু হবে, সে বিষয়ে ইসি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। আমরা আপাতত প্রস্তুতি নিয়ে রাখছি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারে পোস্টার বন্ধ করার সুফল ইসি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, পোস্টার ছাড়াও প্রচার চালানো যায়, সংসদ নির্বাচনে সেটি পরীক্ষিত। আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ওই বিধান কার্যকর করার চিন্তা করছি। বিলবোর্ডে প্রচারের সুযোগ থাকবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন, ৪৫০টির বেশি উপজেলা পরিষদ, তিনশর বেশি পৌরসভা ও ৬১টি জেলা পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের সময় অনেক আগেই চলে গেছে। এগুলো এখনই নির্বাচন করার উপযোগী। এসব নির্বাচন আয়োজনে আইনগত কোনো জটিলতাও নেই। এছাড়া প্রায় ছয়শ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করার যে ১৮০ দিন সময়সীমা রয়েছে, তা এপ্রিলে শুরু হয়েছে। সে হিসাবে অক্টোবরের মধ্যে এ নির্বাচন করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। জুলাইয়ের মধ্যে আরও দুই হাজার আটশর বেশি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনি ক্ষণগণনা শুরু হবে। এ অবস্থায় সরকারের সবুজ সংকেত পেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে পারবে ইসি। যদিও সরকারের তরফে এ বছরের শেষদিকে স্থানীয় নির্বাচন শুরু করার কথা বলা হচ্ছে।
ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সময়ে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যবস্থা ছিল। ওই আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং উপজেলা, জেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন পরিচালনায় বিধিমালায় দলীয়ভাবে ভোটের বিধিবিধান রয়েছে। এমনকি দলীয়ভাবে নির্বাচনি প্রচারেরও সুযোগ আছে। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার বাতিলের লক্ষ্যে সিটি করপোরেশন আইনের ৩২(ক), পৌরসভা আইনের ২০(ক), উপজেলা পরিষদ আইনের ১৬(ক) এবং ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ১৯(ক) ধারা বাতিল করে সংসদে পৃথক আইন পাশ হয়। ওই আইন অনুযায়ী, প্রতিটি নির্বাচনের পরিচালনা এবং আচরণ বিধিমালায় সংশোধনী আনার কাজ শুরু হয়েছে। নির্বাচন আয়োজনের আগে এসব সংশোধনী আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ইসি সূত্র আরও জানায়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একক বিধিমালা প্রণয়নের সুপারিশ ছিল নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের। তবে ওই প্রস্তাব আমলে নেবে না ইসি। তারা প্রতিটি নির্বাচনের জন্য প্রচলিত বিধিমালাগুলো বহাল রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেগুলোয় শুধু প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। এছাড়া বিলবোর্ডের মাধ্যমে প্রচার চালানোসহ সংসদ নির্বাচনে যেসব নতুন নিয়মের প্রচলন করা হয়েছে, সেগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আনতে চায় ইসি। স্থানীয় নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের সুযোগ না রাখার পক্ষে ইসি। ফলে পলাতক ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে না।
প্রার্থী হওয়ার পথ সহজ হচ্ছে : ইসির কর্মকর্তারা জানান, পরিচালনা বিধিমালায় সংশোধনী আনা হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পথ সহজ হবে। নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠেয় এসব নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের প্রয়োজন হবে না। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষরসহ নামের তালিকা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়ার যে নিয়ম রয়েছে, তা থাকবে না। ফলে আইন অনুযায়ী যোগ্য যে কেউ প্রার্থী হতে এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। এছাড়া নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে না। সব প্রার্থী নির্দলীয় প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবেন।আস