Image description

দেশে হাম চিকিৎসায় অব্যবস্থাপনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সরকারি হিসাবেই এখন পর্যন্ত ৩২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৫৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামজনিত, আর ২৬৮ জন মারা গেছে হামের লক্ষণ নিয়ে। ভয়াবহ সংক্রামক এ রোগের বিস্তার ও মৃত্যু ঠেকাতে যেখানে প্রয়োজন জরুরি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ, সেখানে দায় চাপানো আর দায় এড়ানোর রাজনৈতিক টানাপোড়েনে প্রতিদিন শূন্য হচ্ছে অসংখ্য মায়ের কোল।

রাজনৈতিক অস্থিরতার আবহে বর্তমান সরকার এই পরিস্থিতির জন্য দায় চাপাচ্ছে আগের সরকারের ওপর। অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একাংশ পর্দার আড়াল থেকে দাবি করছে, এ দায় তাদের নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দায়-দায়িত্বের এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ভেতরেই হারিয়ে যাচ্ছে জরুরি জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ। শিশুর মরদেহ কাঁধে নিয়ে অসহায় পিতার আর্তনাদ যেন রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নির্মম প্রতীক হয়ে উঠছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামসহ যে কোনো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো দ্রুত রোগী শনাক্ত করে আইসোলেশন এবং নিশ্চিত রোগীদের কোয়ারেন্টাইনে রেখে চিকিৎসা নিশ্চিত করা। এতে সংক্রমণ ছড়ানো যেমন কমে, তেমনি আক্রান্তদের দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।

কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। অভিযোগ রয়েছে, সরকার সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও সমন্বয়হীনতায় জনস্বাস্থ্যের এসব মৌলিক প্রটোকল কার্যত উপেক্ষিত। অনেক ক্ষেত্রেই হাম আক্রান্ত রোগীদের সাধারণ ওয়ার্ডেই রাখা হচ্ছে, ফলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে আরও দ্রুত।

স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠেছে অবকাঠামো ব্যবহারে। রাজধানীর আমিনবাজার হাসপাতাল, মহানগর হাসপাতাল, রেলওয়ে হাসপাতালসহ একাধিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব হাসপাতালকে দ্রুত আইসোলেশন ওয়ার্ডে রূপান্তর করা গেলে বর্তমান সংকট অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব হতো। একটি শয্যার জন্য রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়াতে হতো না। অথচ এগুলোর দিকে দৃষ্টি না দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো জনাকীর্ণ স্থানে বদ্ধ তাঁবুতে করা হয়েছে ফিল্ড হাসপাতাল।

কভিড-১৯ মহামারির সময় দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিট ও কোয়ারেন্টাইন ওয়ার্ড স্থাপন করা হয়েছিল। সেই অবকাঠামো এখনো রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই অকার্যকর বা অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে আছে, যা ব্যবহারের কোনো উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি। অথচ সাম্প্রতিক অতীতে কভিডের মতো অচেনা ভয়াবহ সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সফলতা মিলেছে এই পদ্ধতিতে, সেখানে এখন কেন সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হচ্ছে না?

একজন জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকে যে ধরনের কার্যক্রম নেওয়ার কথা ছিল, সেগুলো এখনো নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে, রোগীদের জন্য আইসোলেশন নিশ্চিত করা; সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পরামর্শক কমিটি গঠন ও তাদের পরামর্শ বাস্তবায়ন; সারা দেশের চিকিৎসকদের একটি নির্দিষ্ট হাইডলাইন প্রণয়ন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। কিন্তু সেগুলো না করে বর্তমান সরকার বিগত সরকারের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী গণমাধ্যমে বলেছেন, এ বিষয়ে তাদের কেউ সতর্ক করেনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশে ‘কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি)’ প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ব্যাপক হারে আইসোলেশন ওয়ার্ড এবং কোয়ারেন্টাইন ইউনিট স্থাপন করা হয়। বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির অর্থায়নে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এটি বাস্তবায়ন করে। দেশের বিভিন্ন সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসোলেশন শয্যা, আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) এবং সিসিইউ (করোনারি কেয়ার ইউনিট) স্থাপন ও আধুনিকায়ন করা হয়। প্রকল্পটির মাধ্যমে ৩০টি সরকারি হাসপাতালে সেন্ট্রাল লিকুইড মেডিকেল অক্সিজেন সিস্টেম স্থাপন করা হয়, যা শ্বাসকষ্টের রোগীদের আইসোলেশনে চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি আইসোলেশন ওয়ার্ড পরিচালনার জন্য প্রায় ১ হাজার ২০০ জন স্বাস্থ্যকর্মী (চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট) নিয়োগ দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার প্রাক্তন পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, আপৎকালীন পরিকল্পনা না করায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে হামের চিকিৎসায় কোনো ট্রিটমেন্ট প্ল্যান নেই, ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন নেই; এমনকি স্বাস্থ্যকর্মীদের কোনো প্রশিক্ষণ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। ফলে এখন যে যার মতো চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা দিচ্ছে। যে হাসপাতালে অভিজ্ঞ চিকিৎসক আছেন, সেখানে রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছে। যে হাসপাতালে অভিজ্ঞ চিকিৎসক নেই, সেখানে সঠিক চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা হচ্ছে না। এমনকি ৯৫ শতাংশ শিশুর টিকাদানও নিশ্চিত হয়নি।

অধ্যাপক বে-নজির বলেন, হামের চিকিৎসায় আইসোলেশন জরুরি এবং আমরা এটাতে গুরুত্ব দিই। কিন্তু বর্তমান স্বাস্থ্য প্রশাসন আইসোলেশন নিশ্চিতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং মৃত্যু বাড়ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাদের মতে, জরুরি ভিত্তিতে আইসোলেশন নিশ্চিত করা, অব্যবহৃত হাসপাতালগুলো চালু করা এবং সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা ছাড়া হামের মৃত্যু ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিকল্প কোনো পথ নেই।

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘হামের চিকিৎসায় আইসোলেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকার সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে দায় এড়ানোর, দায় চাপানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় সংসদে ই-সিগারেট নিয়ে আলোচনা হয় এবং শুল্ক মওকুফ করা হয়, অথচ হাম নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। এ থেকেই বোঝা যায়, সরকার এটাকে অতটা গুরুত্ব দিচ্ছে না।’

অধ্যাপক ফয়সাল বলেন, ‘হামের চিকিৎসায় জুনিয়র চিকিৎসকদের পদায়ন করা হচ্ছে, যাদের কোনো প্রশিক্ষণ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। এভাবে একটি সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এটি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য খাতের সব অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশীদ বলেন, হাম রোগীদের আইসোলেশন বিষয়ে সরকারের এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেই। তবে বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।

একদিনে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু: হাম ও হামের লক্ষণ নিয়ে দেশে ২৪ ঘণ্টায় সাত শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সাতজনের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে হামে, বাকি পাঁচজনের মধ্যে হামের উপসর্গে। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম সংক্রান্ত বুলেটিনে বলা হয়েছে, সারা দেশে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৫৬ জনের। হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৬৮ জনের। এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে, ১২৫ জনের। আর ৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে রাজশাহী বিভাগে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৭৩ জন হামে আক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ে ১ হাজার ২৮১ জন হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে, যাদের মধ্যে এক হাজার ৫৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ৪৫০ জন ভর্তি হয়েছে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। সবচেয়ে কম, চারজন ভর্তি হয়েছে রংপুরে।