Image description

ঈদুল আজহা সমাগত। এবারের ঈদযাত্রা কেমন হবে তা নিয়ে ঈদে ঘরমুখো মানুষ শঙ্কিত। মহাসড়ক মেরামতে ধীরগতি, সড়কে বর্ষায় পানি জমে থাকা, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, মহাসড়কের পাশে কোরবানির হাট বসাসহ নানা কারণে এবার ঘরমুখো যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়বে। একই সাথে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে এবার বাড়তি ভাড়া যাত্রীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হবে বলে ধারণা করছেন ভুক্তভোগীরা। বর্তমান সরকারের আমলে প্রথম ঈদে ভোগান্তি ইউনূস সরকারের আমলের চেয়ে বেশি ছিল। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ঈদের সময় মহাসড়কে কঠোর নজরদারি করায় ভোগান্তি খুব একটা ছিল না বললেই চলে।

এদিকে, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের অনেক স্থানে এখনো কাজ চলমান। সে কারণে সেসব স্থানে ভয়াবহ যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। পরিবহন মালিক সমিতি ইতোমধ্যে ঘেষণা করেছেÑ এবারের ঈদে বাস ভাড়া বাড়বে না। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, এক শ্রেণির মালিকপক্ষ বাস ভাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে দূরপাল্লার যেসব বাস ছাড়ে তার বেশির ভাগই কৃত্রিম টিকিট সংকট দেখিয়ে ভাড়া বাড়িয়ে দেন। মোবাইল কোর্টের অভিযান চালিয়েও তাদের নিবৃত করা যায় না।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ইনকিলাবকে বলেন, গত সোমবার সরকারের সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে আমরা বলেছি, ঈদকে কেন্দ্র করে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নজরদারি করা হয় না; বরং নজরদারির দায়িত্ব দেয়া হয় পরিবহন শ্রমিকদের। তারা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন না করায় যাত্রাপথে যানজটে পড়ে যাত্রীদের সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়। এবার যাতে সরকারের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানো হয় সেই অনুরোধ করেছি।

দেশের মহাসড়কগুলোর অবস্থা নিয়ে আমাদের জেলা সংবাদদাতাদের পাঠানো রিপোর্ট অনুযায়ী এখনো কোনো কোনো মহাসড়কে সংস্কার বা ফোর লেনের কাজ চলমান। সেসব মহাসড়কে কোনো কোনো স্থানে সরু লেন দিয়ে যানবাহন চলাচল করে। এর মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যাত্রীচাপ বাড়তে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আগের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হলেও চলমান নির্মাণকাজ ও বিভিন্ন স্থানের সংকীর্ণতা এখনো ভোগান্তির বড় কারণ হয়ে রয়েছে।

সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ চলমান থাকায় বিভিন্ন স্থানে ধীরগতিতে যান চলাচল করছে। বিশেষ করে রাস্তার একাংশ খোঁড়া, অস্থায়ী ডাইভারশন এবং ভারী যানবাহনের চাপ মিলিয়ে যাত্রাপথ দীর্ঘ হচ্ছে। এতে করে স্বাভাবিক সময়ে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার পথ এখন অনেক ক্ষেত্রে আট থেকে ১০ ঘণ্টা লাগছে।

মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, কাঁচপুর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল বিশ্বরোড পর্যন্ত অংশটি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে যানবাহনের চাপ বেশি থাকায় সামান্য দুর্ঘটনা বা কোনো যানবাহন বিকল হলেই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া ঢকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা সেতু ও দাউদকান্দি এলাকাও ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

সম্প্রতি কিছু স্থানে সেতু মেরামত কাজ চলায় সাময়িকভাবে যান চলাচলে বিঘœ ঘটেছে, যা ঈদযাত্রার সময় ভোগান্তি বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধির ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, আমরা চেষ্টা করছি ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক রাখতে। তবে চলমান উন্নয়নকাজের কারণে কিছুটা চাপ থাকবেই। কুমিল্লার চান্দিনা থেকে কামাল আতাতুর্ক মিসেল জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বর্তমানে যানবাহন চলাচল গতিশীল থাকলেও, মহাসড়কটিতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ের মেঘনা টোলপ্লাজা এলাকার মধ্যে গাড়ির চাপ বেড়ে ধীরগতিতে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি মহাসড়কটিতে যাত্রীবাহী বাসের সাথে পাল্লা দিযে মালবাহী ট্রাকের চাপ দিন দিন বাড়ছে। কুমিল্লা অংশে বিশেষ করে নিমসার, ইলিয়টগঞ্জ ও পদুয়ার বাজার এলাকায় স্থানীয় বাজারের কারণে মহাসড়কের গাড়ি চলাচল ধীরগতি। এদিকে মহাসড়কে অবৈধভাবে তিন চাকার যানবাহন চলাচল এবং বিপরীত দিক থেকে গাড়ি চালানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি দিন দিন বেড়েছে চলছে মহাসড়কটিতে। সাম্প্রতিক সময়ে মহাসড়কটির বিভিন্ন অংশে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত।

এদিকে এই সহাসড়কের কোনো কোনো স্থানে বৈদ্যুতিক ক্যাবল লাইনের কাজ চলায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় শনির আখড়ায় মহাসকের কিছু অংশ কেটে বৈদ্যুতিক পাইপ লাইন বসানো হচ্ছে। এতে করে একদিকের সার্ভিস লেন বন্ধ থাকায় উল্টেপথে যান চলাচল করায় যানবাহন চলাচল করতে গিয়ে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। উল্লেখ্য, এখানে মহাসড়কের উপরেই প্রতি বছর কোরবানির হাট বসে। আট লেনের মহাসড়কের কমপক্ষে দুই লেন কোরবানির হাটের গরু দিয়ে ভরে যায়।

সাদিক মামুন, কুমিল্লা থেকে জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে বর্তমানে যান চলাচল মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও কয়েকটি পয়েন্ট এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মহাসড়কের কুমিল্লা অংশকে ঘিরে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে আবারো বাড়ছে আলোচনা। রাজধানী থেকে চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাতায়াতের প্রধান করিডোর কুমিল্লা অংশের বর্তমান অবস্থা মিশ্র। কোথাও স্বস্তি, কোথাও আবার সামান্য কারণেই দীর্ঘ যানজট তৈরি হচ্ছে।

এদিকে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কুমিল্লা অংশে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কোরবানির পশুবাহী ট্রাক, দূরপাল্লার বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং পণ্যবাহী যান একই সময়ে মহাসড়কে নামায় স্বাভাবিকের তুলনায় চাপ অনেক বেশি হতে পারে। জানা গেছে, মহাসড়কের ক্যান্টনমেন্টসহ কয়েকটি স্থানে সড়ক সংস্কার কাজ চলছে, যদি সংস্কার কাজ ঈদের আগে পুরোপুরি গুছিয়ে না আনা যায় এবং মহাসড়কের পাশে অবৈধ পার্কিং, যাত্রী ওঠানামা ও ফুটপাত দখল নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে পদুয়ার বাজার, নিমসার, কাবিলা, দাউদকান্দি ও চৌদ্দগ্রামের মতো পয়েন্টগুলোতে ভোগান্তি বাড়তে পারে।

আতাউর রহমান আজাদ, টাঙ্গাইল থেকে জানান, নানা জটিলতায় টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। এতে আসন্ন ঈদযাত্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহসড়কে যানজটের আশঙ্কা করছেন পরিবহন চালকরা ও যাত্রীরা। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক। রাজধানী ঢাকার সাথে সড়কপথে উত্তরবঙ্গের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম এই মহাসড়কটি। শুধু ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের টাঙ্গাইলের অংশ ৬৫ কিলোমিটার। ঈদের সময় ঘরমুখো মানুষের যানবাহনের ভিড়ে এই মহাসড়কে সৃষ্টি হয় যানজটের। প্রতি বছর ঈদে এ মহাসড়ক দিয়ে উত্তরবঙ্গের লাখ লাখ মানুষ যাতায়াত করেন, যা অন্য সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি হয়। এ সড়ক দিয়ে প্রায় উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ২৪ জেলার যানবাহন চলাচল করে। তাই এই সড়কে গাড়ির চাপ থাকে বেশি। এ কারণে প্রতি বছর ঈদে এ সড়কে যানবাহনের চাপে জটলা লাগে।

বর্তমানে ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাসের কাজ চলমান রয়েছে। সেই সাথে সার্ভিস লেনসহ মহাসড়কের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, যমুনা সেতুতে টোল আদায়ের সফটওয়্যারে সমস্যার কারণে যদি টোল আদায় দীর্ঘক্ষণ বন্ধ থাকে এবং সেতুর উপর যদি দীর্ঘ সময় গাড়ি আটকা থাকে; এতে করে টাঙ্গাইলের অংশে দীর্ঘ যানজট হয়। প্রতি বছরই ঈদকে সামনে রেখে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সড়কে লক্কড়ঝক্কড় এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি বের করে। এসব গাড়ি হঠাৎ করেই মহাসড়কে বিকল হয়ে যায়। এতে উভয় পাশের গাড়ি থেমে যায়। এক পর্যায়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। অনেক সময় চালকের অদক্ষতা, সড়ক দুর্ঘটনা এবং গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় যানজট হয়।

সরেজমিন মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, মহাসড়কের এলেঙ্গা থেকে সেতুর বিভিন্ন পয়েন্টে কাজ চলছে। এলেঙ্গায় ফ্লাইওভারের কাজ চলছে। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে আন্ডারপাসের কাজও চলমান। ঈদের আগে তড়িঘড়ি করে এসব স্থানে কাজ করা হচ্ছে। মহাসড়কের এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেনের সুবিধা রয়েছে। কিন্তু এলেঙ্গার পর থেকে সিঙ্গেল লেনে যানবাহন চলাচল করতে হয়।

পরিবহন শ্রমিক নেতা মো. হানিফ খোকন বলেন, ঈদে কোনো পরিবহনই যাত্রীদের কাছে নির্ধারিত ভাড়া নেয় না। এবারো তাই ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে এবার পরিবহন ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সরকার চাইলে কঠোর নজরদারি করলে এটি নিয়েন্ত্রণ করা সম্ভব। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এক নেতা বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছি, এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে ভাড়া না বাড়ানোর পাশাপাশি মহাসড়কে নিরাপত্তা জোরদারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আমাদের শ্রমিকরা নিয়োজিত থাকবে। আশা করছি, ঈদযাত্রা এবার স্বস্তিদায়ক হবে।