ঢাকার আদালত অঙ্গনে চাঞ্চল্যকর ভুয়া ওয়ারেন্ট কেলেঙ্কারির ঘটনায় বেরিয়ে এলো ভয়ঙ্কর তথ্য। ‘বিচারকের সিল-স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া ওয়ারেন্ট ইস্যু’-এমন বিস্ফোরক অভিযোগে প্রকাশিত সংবাদের পর নড়ে চড়ে বসেছে আদালত। এরইমধ্যে গঠিত ৩ সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি মাত্র ১৫ কর্মদিবসের মধ্যেই তাদের অনুসন্ধান শেষ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আদালতের ভেতরে ভয়াবহ অনিয়ম, জালিয়াতি এবং দায়িত্বে অবহেলার চিত্র। শুধু তাই নয়, ভুয়া ওয়ারেন্ট ইস্যু থেকে শুরু করে হাজতখানা ও রেকর্ডরুমে সংঘটিত নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দেয়া হয় ১৩ দফা সুপারিশ।
১. ঢাকার আদালতসমূহ হতে ডিসি প্রসিকিউশন অফিসের ডব্লিই/এ (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা) রিসিভ শাখা রেজিস্ট্রার মেইনটেইনপূর্বক বাহকের তথ্য ব্যতীত গ্রহণ করতে পারবে না।
২. জিআর শাখা সংশ্লিষ্ট আদালত হতে সরাসরি কোনো ডব্লিই/এ (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা)-এর কপি রিসিভ করতে পারবে না।
৩. আদালতের কর্মচারী ব্যতীত অন্য কেউ ডব্লিই/এ (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা) রিসিভ শাখায় জমা দিতে পারবে না।
৪. রিসিভ শাখা থেকে সংশ্লিষ্ট জিআর শাখা ডব্লিই/এ (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা) যথাযথভাবে সংগ্রহ করবে।
৫. ডব্লিই/এ (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা)’র সম্পূর্ণ তথ্য ফরমেট অনুযায়ী (সংশ্লিষ্ট কোর্টের কর্মচারীর স্বাক্ষরসহ) থাকার পরেই কেবলমাত্র সি.ডি.এম.এস এ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অসম্পূর্ণ ডব্লিই/এ (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা) ফেরতপূর্বক সঠিক ডব্লিই/এ সংগ্রহ করতে হবে।
৬. ইতিমধ্যে ভুয়া ডব্লিই/এ (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা) নিয়ে দায়েরকৃত মামলাসমূহ ও তদন্তাধীন মামলা ডি.সি প্রসিকিউশন অফিস কর্তৃক নিবিড় তদারকির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৭. ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় প্রেরিত ও সংশ্লিষ্ট সংবাদে প্রকাশিত ৮টি ভুয়া ডব্লিই/এ (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা)-এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৮. ডব্লিই/এ (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা) এর যথাযর্থতা যাচাই করে সি.ডি.এম.এস এ এন্ট্রি দিতে হবে। ব্যর্থতায় জি.আর.ও এর ব্যক্তিগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট জিআরও এই বিষয়ে দায়ী থাকবেন মর্মে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৯. কোন আদালত হতে কতোটি ডব্লিই/এ (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা) ইস্যু করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট জি.আর শাখা কতোগুলো ডব্লিই/এ রিসিভ করেছে তা সংশ্লিষ্ট আদালতসমূহ প্রত্যেক মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে স্টেটমেন্টসহ দাখিল করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১০. আদালতে আসামিদের এন্ট্রি এবং এক্সিটের সময় বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সুপারিশ।
১১. হাজতখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের সঠিক মনিটরিং নিশ্চিত করার জন্য সিসি ক্যামেরার আওতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।
১২. সিএমএম আদালতের রেকর্ডরুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত রেকর্ড কিপার মো. আব্দুর রহমান আজাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ।
১৩. মহানগর দায়রা জজ আদালত ও অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতসমূহে সংশ্লিষ্ট আদালতগুলোয় সিআর মিস শুনানির দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাগণ যেন শুনানিতে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে সে বিষয়ে ডিসি প্রসিকিউশন, ঢাকা কর্তৃক তদারকি বৃদ্ধিকরণ ও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ।
প্রতিবেদন হাতে পেয়েই নড়ে চড়ে বসেন মহানগর দায়রা জজ মো. সাব্বির ফয়েজ। গত ৪ঠা মে তিনি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে আয়োজন করেন জরুরি মতবিনিময় সভা। সভায় বিচার বিভাগ, আইনজীবী সমিতি, পুলিশ, কারা কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় আলোচকরা একবাক্যে প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোকে যথাযথ বলে মত দেন এবং দ্রুত দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও নিয়মিত মামলা দায়েরের তাগিদ দেন। এই ঘটনায় আদালতপাড়ায় তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।