নেত্রকোণার মদন উপজেলায় ১১ বছরের মাদ্রাসাছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি অভিযুক্ত মাদ্রাসার শিক্ষককে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে ওই শিক্ষক ফেসবুক লাইভে এসে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বক্তব্য দিয়েছেন। মঙ্গলবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে পুলিশ বলছে- মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করতে বিভিন্নস্থানে অভিযান চালানো হয় এবং তা অব্যাহত আছে।
৫ মিনিট ৪ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে শিক্ষককে বলতে শোনা যায়-অসুস্থতার জন্য তিনি কথা বলতে পারছেন না। তারপরেও একটা বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন মনে করে তিনি বলেন- আমাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা বিষয় ভাইরাল হয়েছে। তা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও টেলিভিশনে প্রচার হয়েছে। ওই মেয়েটার সঙ্গে আমার ছবি দিয়ে যে বিষয়ে অপপ্রচার করা হচ্ছে তার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত না এবং এ বিষয়ে আমার কিছুই জানা নাই। আমি শুধু জানি মেয়েটা আমার মাদ্রাসায় গত বছর এবং আগের বছর পড়াশোনা করেছে। তবে গতবছরের শুরুতে সে মাদ্রাসা থেকে চলে যায়। পরে খোঁজ নিয়ে জানি সে তার মা ও সৎ বাবার সঙ্গে ঢাকায় চলে গেছে।
তারপর পাঁচ ছয় মাস আগে সে আবার আমাদের মাদ্রাসায় আসলো। জিজ্ঞাসা করলে মেয়েটি জানায়- আমি ঢাকায় ছিলাম, আমার নানা ভাই আমাকে জোর করে নিয়ে এসেছে। মেয়েটি একটু অবাধ্য, হিজাব পরে না বোরকা পরে। বিভিন্ন কথা জিজ্ঞাসা করলে সে জানায়, রাতে সে তার নানা ভাইয়ের সঙ্গে থাকে। ওই শিক্ষক নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন-এখন এ ঘটনা শোনার পর আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি।
আমার বিবি আছে, বাচ্চা আছে, আত্মীয়স্বজন ও সমাজ আছে। আমি কখনোই দেশের আইনের প্রতি অবাধ্য নই। আমি চাই- সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হোক। প্রয়োজনে টেস্ট (পরীক্ষা) করা হোক আসলে এই বাচ্চার বাবা কে। আমাকে যদি প্রথমেই মিথ্যাভাবে অপরাধী বানানো হয় তাহলে তো প্রকৃত অপরাধী পার পেয়ে যাবে। এই ভিডিও’র বিষয়ে জানতে ওই শিক্ষকের সঙ্গে গতকাল বেলা ১২টার দিকে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। এদিকে ওই মেয়েটির শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা চিকিৎসক সাইমা আক্তারকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। গতকাল ১২টা ৫ মিনিটে সায়মার ব্যবহৃত মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার স্বামী মো. আসিফুল ইসলাম ধরেন।
তিনি বলেন-গত দু’দিন আগে এ বিষয়টি নিয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে সাইমা বক্তব্য দেয়ার পর থেকে তাকে নানাভাবে হ্যারেজমেন্ট করা হচ্ছে। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। জীবন দুর্বিষহ হয়ে যাচ্ছে। সায়মা এবং আমি এখন ট্রমাট্রাইজ অবস্থায় আছি। সায়মার চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন সার্টিফিকেট ও কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে। ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হচ্ছে। তাকে ধর্ষণের হুমকি দেয়া হচ্ছে। এ বিষয় নিয়ে আমরা এখন আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছি। স্থানীয় বাসিন্দা, এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে-ওই শিক্ষক চার বছর আগে একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। শিশুটি তার নানার বাড়িতে থেকে সেখানে লেখাপড়া করতো। শিশুটির বাবা তার মাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় জীবিকার তাগিদে মা সিলেটে একটি বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন।
শিশুটির মা বলেন-গত বছরের ২রা নভেম্বর বিকালে মাদ্রাসা ছুটির পর মাদ্রাসার হুজুর আমার মেয়েকে ডাইক্কা মাদ্রাসাসংলগ্ন মসজিদ ঝাড়ু দিতে বলেন। এ সময় মাদ্রাসার অন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যায়। ঝাড়ু শেষে হুজুরের কক্ষে ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণ করে। পরে আমি তারে জিজ্ঞাসা করলে সে জানায় হুজুরে এই কাজ করছে। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হই সে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আমি থানায় মামলা করেছি। পুলিশ এখনো আসামি ধরতে পারছে না। এ ঘটনার বিচার চাই। ওই মেয়েটি বলে, হুজুর ভয়ভীতি দেখিয়ে আমার সঙ্গে এসব করেছে। মদন থানার উপ-পরিদর্শক (এস আই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আখতারুজ্জামান মুঠোফোনে বলেন-শিশুটিকে মদন থানার একটি ক্লিনিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অন্তঃসত্ত্বার বিষয়টি পরিবার নিশ্চিত হয়ে মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করে।
তারপর পুলিশের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে নেত্রকোণা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালেও পরীক্ষা করে অন্তঃসত্ত্বার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। আসামিকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে। মদন থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন-আসামিকে ধরতে বিভিন্নস্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে আসামিকে পুলিশ দ্রুত গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হবে।