Image description
এক দিনে সর্বোচ্চ ১৭ শিশুর মৃত্যু দুজনের হাম নিশ্চিত, ১৫ জনের ছিল উপসর্গ হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৩০২ শিশু

কোনো পরিবারে একটি শিশুর জন্ম হলে চারপাশের সবটুকু আলো চলে যায় তার দিকে। সবার মনোযোগ, ভালোবাসা, স্বপ্ন তখন শুধু তাকে ঘিরে। শিশু কেন কাঁদে, কেন সে খেতে চায় না, কেন ঘুমাচ্ছে না সময়মতো, ওর কি পেটে ব্যথা, নাকি সর্দিতে নাক বন্ধ— এমন নানা চিন্তায় দিশাহারা থাকেন মা-বাবা। বাজারের সবচেয়ে সুন্দর জামাটাও যেমন শিশুর জন্য চাই, সবচেয়ে নরম তোয়ালেটাও চাই তার শরীর মোছাতে।

এত আদর, এত স্বপ্ন নিয়ে জন্ম নেওয়া সেই ফুলের মতো শিশুর যখন আসে তীব্র জ্বর, শরীর ভরে যায় লালচে ফুসকুড়িতে, তাকে নিয়ে দৌড়াতে হয় হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে; তখন সেই মা-বাবার মনের ওপর দিয়ে কী যায়; তা বোঝার সাধ্য কারও নেই।

অথচ এমন দুশ্চিন্তায় এখন দিন পার করছেন দেশের হাজারো অভিভাবক। যাদের কারও শিশুর শরীরে দেখা গেছে হামের এসব উপসর্গ, হাম নিশ্চিত হওয়ায় কাউকে ভর্তি করতে হয়েছে হাসপাতালে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ১৭ শিশু, যা ১৫ মার্চ দেশে হাম শনাক্ত শুরুর পর থেকে এক দিনে সর্বোচ্চ। এর আগে এক দিনে ১২ শিশুর মৃত্যুর কথা জানা গিয়েছিল। মৃতদের মধ্যে দুজনের হাম হয়েছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি ১৫ জনের শরীরে ছিল রোগটির নানা উপসর্গ।

গতকাল অধিদপ্তরের সবশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও বলছে, শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৩০২ শিশু। তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৬১৮ জন, এরপর চট্টগ্রামে ১৯২ জন।

হামের প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই শিশুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবার ও স্বজনরা। শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন অনেক মা।

চার মাসের শিশু রায়হান রহমানকে নিয়ে উদ্বিগ্ন মা ছালমা আক্তার। ঢাকার যাত্রাবাড়ীর এ বাসিন্দা বলছিলেন, ‘চারদিকে শিশুদের যেভাবে হাম হচ্ছে,  হামে মারা যাচ্ছে— নিজের ছেলেকে নিয়ে ভয়ে আছি।’

গত ১৫-২০ দিন তিনি যেমন বাসা থেকে বের হচ্ছেন না, ছেলেকেও বের করছেন না। অফিস ফেরত স্বামীকেও ঘরে ফিরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক নানা নিয়ম-কানুন মেনে তবেই সন্তানের কাছে যেতে হচ্ছে।

কেন এবার হামে এত শিশুর মৃত্যু হচ্ছে— জানতে কথা হয় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘মূলত অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়ে নানা জটিলতায় মারা যাচ্ছে। পাশাপাশি এসব শিশুর অধিকাংশ ভিটামিন এ ক্যাপসুলও পায়নি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৩১১ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে ৫২ শিশু হামে মারা গেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

হঠাৎ দেশের শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের টিকার কাভারেজ কমে যাওয়ায় শিশুদের একটি অংশের ‘হার্ড ইমিউনিটি’ দুর্বল হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি হাম উচ্চ সংক্রামক রোগ হওয়ায় দ্রুত বেশিসংখ্যক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। হামে আক্রান্ত এক শিশু থেকে ১২ থেকে ১৮ জন সংক্রমিত হতে পারে। এ ছাড়া যে মায়েরা হামের টিকা পাননি এবং যাদের কখনো হাম হয়নি, এমন মায়ের শিশুরাও রয়েছে ঝুঁকিতে।

হামে মৃত্যু বাড়ার কারণ হিসেবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ইকবাল বলছেন, পারিবারিক সচেতনতার অভাবে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হচ্ছে। পাশাপাশি রোগীর তুলনায় হাসপাতালে জনবল ও অন্যান্য সংকটের কারণে সেবার সুযোগ সীমিত। ফলে হামে শিশু মারা যাওয়ার ঘটনা বাড়ছে।

জেলা পর্যায়ে সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের জন্য স্পেশাল ওয়ার্ড চালুর পরামর্শ দিলেন তিনি। যাতে অন্তত হামের চিকিৎসার জন্য শিশুদের নিয়ে বিভাগীয় শহরে না যেতে হয়। এসব ওয়ার্ডে রোগীর আনুপাতিক হারে দক্ষ জনবল নিয়োগের পরামর্শও তার।

সরকার হামকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বলে জানালেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক মো. হালিমুর রশীদ। আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলেও আশার বাণী শোনালেন তিনি।