আয় না বাড়লেও খরচ বাড়ছে লাগামহীনভাবে। বিলাসিতা তো অনেক দূরের কথা, মিতব্যয়িতার চরম পাঠ নিতে হচ্ছে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে। চাল-ডাল-তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে স্কুল-কলেজের ফি, চিকিৎসা, যাতায়াত খরচসহ জীবনযাত্রার সামগ্রিক ব্যয়। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে আয়ের সংকটে পড়েছেন নির্ধারিত আয়ের এসব মানুষ।
মধ্যবিত্তরা বলছেন, তাঁরা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন, কর দেন, সঞ্চয় করেন, বাজারে চাহিদা তৈরি করেন।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মধ্যবিত্ত শ্রেণির সুরক্ষায় নীতি গ্রহণ করলেও বাংলাদেশ এখনো সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা বলয় তৈরি করেনি। আগামী বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, নিত্যপণ্যে ভ্যাট-কর কমানো ও টার্গেটেড অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে এই জনগোষ্ঠীকে বাঁচানোর দাবি অর্থনীতিবিদদের।
ঠিক কতজন মধ্যবিত্ত?
নির্ধারিত আয়ের মানুষ—যাঁরা মাসিক বেতনের ওপর নির্ভরশীল, যাঁদের বেতনের বাইরে বাড়তি আয় নেই, তাঁরাই মূলত মধ্যবিত্ত। বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা নিয়ে নানা মত আছে।
সঞ্চয় ভাঙার রেকর্ড, বাড়ছে ঋণনির্ভরতা
মধ্যবিত্তের এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলছে সঞ্চয় ভাঙার তথ্যে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে সঞ্চয়পত্র ভাঙার পরিমাণ ৩২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মানুষ এখন আর বিলাসী প্রয়োজন বা বিনিয়োগের জন্য নয়, বরং সংসার চালাতেই ভবিষ্যতের এই শেষ ভরসাটুকু ভাঙছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, সঞ্চয় ভাঙাটা অর্থনীতির জন্য একটি অশনিসংকেত। এর অর্থ হলো, মানুষ ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কথা ভুলে বাঁচার তাগিদে তাঁর দীর্ঘদিনের জমানো পুঁজি শেষ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
একই চিত্র ফুটে উঠেছে মানুষের ঋণনির্ভরতায়। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দেশের এক-তৃতীয়াংশ পরিবার এখন ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শহরের পরিবারগুলোর মাসিক গড় আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২২ সালে নগর পরিবারের মাসিক গড় আয় ছিল ৪৫ হাজার ৫৭৮ টাকা, যা বর্তমানে নেমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকায়। অথচ পরিবারের খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৪৫ হাজার টাকায়।
কর্মহীনতা যেন নতুন মহামারি
আয়ের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাকরি হারানোর শঙ্কা। শিল্প মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে এক লাখ ৬০ হাজার মানুষ কাজ হারিয়েছেন। কিন্তু ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই এই সংখ্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে—কাজ হারিয়েছেন প্রায় ২১ লাখ মানুষ। বেকারত্বের এই উল্লম্ফন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এক অন্ধকার ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেকারত্বের হার ৪.৬৩ শতাংশ, বা প্রায় ২৭ লাখ বেকার হয়েছেন।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও যাতায়াতে বাড়তি চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা ও যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট দেশীয় বাজারে যাতায়াত ও পরিবহন ব্যয়কে উসকে দিয়েছে। জ্বালানি তেল, এলপিজির দাম বাড়ায় শুধু যাতায়াত নয়, নিত্যপণ্যের পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে প্রতিটি জিনিসের দাম আরো এক দফা বেড়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে বাসাভাড়া কোনো কোনো এলাকায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বেড়েছে শিক্ষা খরচ, বাড়ছে ঝরে পড়া
স্কুলের বেতন, কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, বই—সব মিলিয়ে শিক্ষা খাতে খরচ বেড়েছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে অনেক দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার বাধ্য হচ্ছে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করতে। বেসরকারি গবেষণা বলছে, বর্তমানে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী কোনো না কোনো পর্যায়ে ঝরে পড়ছে, যার মূল কারণ দারিদ্র্য ও শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সেলিনা আক্তার বলেন, তিন সন্তানের বাবা স্বামীর বেসরকারি চাকরির বেতন ৩৫ হাজার টাকা। খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসাভাড়া—সব খাতে ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ইউনেসকোর তথ্য বলছে, দেশে শিক্ষার পেছনে গড় খরচ বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। দেশের প্রায় ৭ শতাংশ পরিবার সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি ‘কমলেও’ বাস্তব ভিন্ন
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮.৭১ শতাংশে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯.১৩ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.২৪ ও খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৯.০৯ শতাংশ। কিন্তু একই সময় জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৯ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘নিম্ন মধ্যবিত্তরা জীবন ধারণের জন্য যেসব পণ্য ক্রয় করেন সেগুলোর মূল্য সাধারণ মূল্যস্ফীতির চেয়ে দুই-তিন গুণ বেড়ে গেছে। এর ফলে তাঁদের ক্রয়ক্ষমতার অবনমন হয়েছে। দেশে এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, যা প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম বাড়ায় নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত—সব শ্রেণির মানুষ চাপে পড়েছে।’
বেড়েছে দারিদ্র্য, কমেছে শহরের মানুষের আয়
পিপিআরসির সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, গত তিন বছরে দারিদ্র্যের হার লাফিয়ে ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭.৯৩ শতাংশে। প্রতি চারজনে একজন এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে। চরম দারিদ্র্যের হার ৫.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৯.৩৫ শতাংশ। আর প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে, যেকোনো সময় তারা দারিদ্র্যের গভীরে পড়ে যেতে পারে।
উদীয়মান মধ্যবিত্তই দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছেন। তাঁরাই মূলত ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের চালিকাশক্তি। তবে শুধু খাদ্যে আয়ের ৫৫ শতাংশ চলে যাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে এক-তৃতীয়াংশ পরিবার ঋণনির্ভর হওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে শঙ্কাজনক। শিক্ষিত ও চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনমান হুমকিতে রয়েছে—যা দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ২০ শতাংশ। তাঁদের সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও সংকট মোকাবেলার সক্ষমতা কমছে, যার চাপ সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর দৃশ্যমান।’
মধ্যবিত্তদের জন্য দেশে দেশে সুরক্ষা নীতি
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের মধ্যবিত্তকে রক্ষা করতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গ্রহণ করেছে। ভারত সম্প্রতি তাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ১২ লাখ রুপি করেছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া জ্বালানি ও খাদ্যে টার্গেটেড ভর্তুকি দিচ্ছে। ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এমনকি পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাও সম্প্রতি তাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়েছে। অথচ বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের জন্য এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হয়নি।
বাজেট প্রত্যাশা ও করণীয়
আসন্ন বাজেটে মধ্যবিত্তের জন্য কেবল সরাসরি নগদ সহায়তা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্ভাবনী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য সুদ-সহায়তা বা করছাড়সহ শিক্ষা ঋণ, স্বাস্থ্যবীমা প্রিমিয়ামে সরকারি ভর্তুকি এবং স্বল্প সুদে আবাসন ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যা এই শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে সহায়ক হবে। এ ছাড়া সন্তানদের উচ্চশিক্ষার ব্যয় মেটাতে বিশেষ সঞ্চয় স্কিম চালুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের সহায়তাগুলো সরাসরি দান বা খয়রাতি সাহায্যের মতো নয়; বরং এটি একটি নীতিগত স্বীকৃতি ও টেকসই সুযোগ, যা মধ্যবিত্তের আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যতের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
প্রাক-বাজেট বৈঠকে এরই মধ্যে বিভিন্ন চেম্বার ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমানে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা, যা মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় অপর্যাপ্ত। ডিসিসিআই সীমা পাঁচ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের ওপর কর রিবেট বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘নিত্যপণ্যের মূল্য সহনীয় করতে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে এসব পণ্য ন্যায্যমূল্যে সরবরাহের পরিধি বাড়ানো জরুরি। দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য টার্গেটেড ক্যাশ ট্রান্সফার চালু করা যেতে পারে। খাদ্য ও জ্বালানি আমদানি শুল্ক-ভ্যাট হ্রাস করলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে।’ ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘আসন্ন বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা সমন্বয় করে পাঁচ লাখ টাকা করা যেতে পারে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মানুষের ওপর চাপ কিছুটা কমাবে এবং তাঁদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে। নির্দিষ্ট আয়সীমার নিচে থাকা পরিবারের জন্য বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিত্যপণ্যে ডিজিটাল ওয়ালেট বা সরাসরি ভর্তুকি দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা উচিত।’
দ্রুত ফ্যামিলি কার্ডের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩টি জেলা এবং তিনটি সিটি করপোরেশনে ৩৭ হাজার ৮১৪টি পরিবারের নারী প্রধানকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে মাসিক দুই হাজার ৫০০ টাকা দিচ্ছে সরকার।
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘সরকার নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার সংকট মোকাবেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মতো কিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে এই কার্যক্রমগুলো এখনো মূলত পাইলট পর্যায়ে রয়েছে, যার পরিধি আরো বাড়িয়ে নির্দিষ্ট আয়সীমার নিচে থাকা প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছানো জরুরি।’