রাজধানীতে সড়কে শৃঙ্খলার অভাবে সৃষ্ট যানজটে প্রতিদিন লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে বড় অংকের আথিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে রাষ্ট্র। গত ১০ বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশি। প্রতিদিন গড়ে ১৪০ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থার সমন্বয়হীনতা, দুর্বল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অদক্ষতাই এই বিশৃঙ্খলার মূল কারণ।
সড়কে বিশৃঙ্খলা রোধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (২০১২ সাল) ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু এটির আইনি ক্ষমতা থাকলেও প্রায়োগিক ক্ষমতা না থাকায় পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।
তথ্যমতে, রাজধানীর পরিবহন পরিকল্পনা, প্রকল্প অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব ডিটিসিএর ওপর ন্যস্ত। তবে ট্রাফিক পুলিশ, সিটি করপোরেশন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিএমটিসিএলসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রতিদিন লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে রাষ্ট্রের।
গত ১৪ মার্চ আইজিপি আলী হোসেন ফকির গাজীপুরে এক সভায় বলেছেন, শুধু যানজটের কারণে রাজধানীতে প্রতিদিন ১৪০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এই হিসাবে বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
গত বছরের ২৬ জুন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) সেমিনারে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. শেখ মঈনুদ্দিন বলেছিলেন, রাজধানীতে যানজটে বছরে যে ক্ষতি হচ্ছে তা দিয়ে দুটি করে এমআরটি লাইন তৈরি করা সম্ভব।
ডিটিসিএর অধীনে ২০১৬ সালে অনুমোদিত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) অনুযায়ী মেট্রোরেল, বিআরটি, সড়ক নেটওয়ার্কসহ একটি সমন্বিত নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ডিটিসিএর অভিযোগ, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এবং ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সহযোগিতা করছে না।
ডিটিসিএর বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ধ্রুব আলম বলেন, আমরা ঢাকার পরিবহনের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকলেও অন্যান্য সংস্থার পর্যাপ্ত সহযোগিতার অভাবে প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
এদিকে বাস রুট নির্ধারণ ঘিরে সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও দৃশ্যমান। বাস চলাচলে বিশৃঙ্খলা রোধে ডিটিসিএ ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। এই পরিকল্পনায় রুট কমিয়ে ৪২টি রুট নির্ধারণ করে ডিটিসিএ। তবে একই সময়ে ট্রাফিক পুলিশ নিজস্ব উদ্যোগে নতুন বাস রুট পরিকল্পনা করেছে, যা ডিটিসিএর পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আইন অনুযায়ী ডিটিসিএর সঙ্গে সমন্বয় করে রুট নির্ধারণের কথা থাকলেও বিভিন্ন কমিটি ও সংস্থা আলাদাভাবে রুট অনুমোদন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে একই রুটে একাধিক পরিকল্পনা তৈরি হয়ে বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
ডিটিসিএর প্রধান নির্বাহী পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, উদ্যোগ নেওয়ার কথা আমাদের, কিন্তু করছে পুলিশ। সম্প্রতি এক মিটিংয়ে আমরা বলেছি, পরিকল্পনা তারা করতে চাইলে করুক, কিন্তু আমাদের পরামর্শ যেন নেয়।
সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব জিয়াউল হক বলেন, ডিটিসিএর উদ্যোগ নেওয়ার কথা থাকলেও ট্রাফিক পুলিশ করছে। তবে সবাই মিলে আমরা যানজটমুক্ত গণপরিবহনব্যবস্থা গড়তে চাই। তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ