Image description

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার ঘটনায় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুঃখ প্রকাশের পর দুর্ভোগ পোহানো সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কিছুটা প্রশমন হয়েছিল। তবে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নানা মন্তব্যে ‘তপ্ত উনুনে যেন ঘি পড়েছে’। গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদকে তিনি জানিয়েছেন, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার খবর বানোয়াট, ভিত্তিহীন। সামাজিক মাধ্যমে আগের বছরগুলোর জলাবদ্ধতার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। 

আগের দিন বুধবার চট্টগ্রামে গিয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন কথা বলার সময় হঠাৎ তাঁকে থামিয়ে দিয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রী। বিষয়টি কারও নজর এড়ায়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আরেক কাণ্ড ঘটিয়েছেন। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিমকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করে বলেছেন, তিনি ‘সরকারের বিরুদ্ধের লোক’। তিনি গণমাধ্যমের ওপরও ক্ষোভ ঝাড়েন, সামাজিক মাধ্যম নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন। 
এদিকে গতকাল প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম চট্টগ্রামে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে দফায় দফায় সভা করেছেন। বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১৯ সদস্যের কমিটি গঠন করেন। নগরের সব খাল ও পানি নিষ্কাশনের নালাগুলো সারাবছর সচল রাখাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের সমন্বয় করবে এই কমিটি। সিটি করপোরেশনের মেয়রকে কমিটির আহ্বায়ক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। গতকাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী। এই সময়ও বিতর্কিত মন্তব্য করেন তিনি। পরে গতকাল জাতীয় সংসদেও একই বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী।

‘জলাবদ্ধতা নয়, জলজট হয়েছে’
গত বুধবার সন্ধ্যায় প্রবর্তক মোড়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহর পানিতে ভাসছে না, সুন্দর আছে। হঠাৎ অতিবৃষ্টির কারণে কিছুটা পানি জমা পড়লেও সঠিক সময়ে তা নিষ্কাশন হয়ে গেছে। এটাকে আমরা জলাবদ্ধতা বলব না, এটাকে আমরা জলজট বলব।’ প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘প্রথমত আমি মিডিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই, আপনারা যেভাবে নিউজটি করেছেন বা সামাজিক মাধ্যমে বলছে, আমি চট্টগ্রামে সন্ধ্যার পর থেকে ঘুরে দেখলাম। চট্টগ্রাম শহর পানির ওপর ভাসছে না।’ প্রবর্তক মোড়ে জলাবদ্ধতা খুব বেশি হয়নি– এমন ধারণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘৬০ কিলোমিটার আয়তনের একটা সিটি করপোরেশন। প্রবর্তক মোড়ে আমরা পানির মধ্যে যতটুকু হাঁটলাম, এটা ৬০ ফুটও হবে না। সর্বোচ্চ ৩০ ফুট জায়গা; এক গোছা পানি হবে।’ প্রতিমন্ত্রীর এসব মন্তব্য নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে চলছে তুমুল সমালোচনা। 

চট্টগ্রামে যা বললেন প্রতিমন্ত্রী
গতকাল দুপুরে চাক্তাই এলাকায় সাংবাদিকদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ২০২৩-২৪ সালের ছবি দিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে পাঠিয়েছেন। উনার কাছে খবর ছিল, চট্টগ্রামে ব্যাপক জলাবদ্ধতা হয়েছে। এই খবরে উনি সংসদে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম নগরবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তারপর সংসদেই তাঁর কার্যালয়ে ডেকে উনি আমাকে নির্দেশনা দিয়েছেন, আপনি এক্ষুনি চট্টগ্রাম যান; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে নিয়ে বসে কী সমস্যা আছে, সমাধান করে তারপর আপনি ফিরবেন।’ 
তিনি বলেন, ‘আমি বুধবার সন্ধ্যার পরে এসেছি, ঘুরেছি। যেভাবে মিডিয়াতে নিউজটা এসেছে, সামাজিক মাধ্যমেও, এ রকম জলাবদ্ধতা আমি এসে দেখিনি। অনেকে ট্রল করে বলেছেন, মাননীয় মন্ত্রীর চশমার সমস্যা আছে। চোখে কম দেখে। কিন্তু আপনারা তো কাল থেকে আমার সঙ্গে ছিলেন। আজকেও আছেন। আপনাদের কাছেও আমি প্রশ্ন রাখতে চাই– আজকে তো কোথাও আপনারা জলাবদ্ধতা দেখেননি।’

‘জলাবদ্ধতার খবর বানোয়াট, ভিত্তিহীন’
ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা হলেও গতকাল  জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতিতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, জলাবদ্ধতার খবর বানোয়াট, ভিত্তিহীন। সামাজিক মাধ্যমে আগের বছরগুলোর জলাবদ্ধতার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। 
প্রতিমন্ত্রী সংসদকে জানান, প্রধানমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করায় চট্টগ্রামবাসী আনন্দিত হয়েছেন, খুশি হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বড় মনের পরিচয় দিয়ে একজন সংসদ সদস্য বা খবরের ওপর ভিত্তি করে দুঃখ প্রকাশ করে ফেলেছেন। 

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, নগরবাসী বলেছেন, এক-দুই বছর আগে যে রকম জলাবদ্ধতা হতো, তা এখন নেই। চট্টগ্রাম মহানগরে মোট ৫৭টি খাল রয়েছে। ৩৬টি খাল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পুনর্খনন করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর প্রকৌশল ব্রিগেড যা বাস্তবায়ন করছে। এ  কাজ করতে গিয়ে কিছু জায়গায় বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। হঠাৎ অতিবৃষ্টির কারণে ওই বাঁধগুলোর কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল। মঙ্গলবার ২২০ মিলিমিটার বৃষ্টিতে প্রবর্তক মোড়সহ পাঁচটি জায়গায় জলজট তৈরি হয়েছিল।
প্রতিমন্ত্রী সংসদকে বলেছেন, বড় ধরনের বৃষ্টি বা জলোচ্ছ্বাস না হলে চট্টগ্রাম মহানগরীতে আগামীতে জলবদ্ধতার শঙ্কা থাকবে না।  

সিডিএ চেয়ারম্যানকে ধমকালেন
গতকাল সকালে সিটি করপোরেশনে সিডিএ চেয়ারম্যানকে দেখে ক্ষোভ ঝাড়েন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। নগরীর টাইগারপাস সিটি করপোরেশন কার্যালয়ে এক সভায় সিডিএ চেয়ারম্যানকে ‘সরকারের বিরুদ্ধের লোক’ বলে অভিযুক্ত করেন।
প্রতিমন্ত্রী সিডিএ চেয়ারম্যানের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি তো প্ল্যানিং করে ষড়যন্ত্র করছেন। আপনি সরকারের বিরুদ্ধের লোক।’ প্রতিমন্ত্রীর এমন মন্তব্যে সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘শাহাদাত ভাই (মেয়র) আমাকে চেনে স্যার।’ প্রতিমন্ত্রী প্রতি-উত্তরে বলেন, ‘শাহাদাত ভাই চিনলে কী হবে! চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ৩৬টি খাল সংস্কার করছে। সমস্যাটা হয়েছে আপনাদের নিয়ে। মিডিয়ায় আপনার কোনো বক্তব্য নাই। সাধারণ মানুষ রাগ-ক্ষোভ ঝাড়ছে মেয়র শাহাদাতের ওপর।’

‘গাড়িতে পানি সরানোর পাম্প নিয়ে ঘুরছি’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বুধবার আসার পর আমি মেয়র সাহেবকে মজা করে বলছিলাম, কিছু পানি নিষ্কাশনের পাম্প গাড়ির মধ্যে নেওয়ার জন্য। আমরা কোথাও যদি পানি পাই, নিজেরাই তা নিষ্কাশন করে দেব। কিন্তু কাল থেকে আমরা ঘুরছি। পাম্পও আমাদের গাড়িতে আছে। কিন্তু আমরা কোথাও পাম্প ইউজ করতে পারিনি। এটাই বাস্তবতা। এই কথা নিয়েও অনেক কথা হবে।’

বিশিষ্টজনের ভাষ্য
জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেছেন, ‘প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম আসলে চট্টগ্রামের মানুষকে অপমান করার জন্য এসেছেন বলে আমার মনে হয়েছে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী জলাবদ্ধতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন, সেখানে প্রতিমন্ত্রী উল্টো কথা বললেন। তিনি তো চট্টগ্রামের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে উপহাস করলেন। মেয়র শাহাদাত যখন কথা বলতে চাইছিলেন, তখন প্রতিমন্ত্রী তাঁকে থামিয়ে দিলেন, পরে শুনলাম তিনি সিডিএ চেয়ারম্যানের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করেছেন।’
দেলোয়ার মজুমদার আরও বলেছেন, ‘কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার বা জলাবদ্ধতাকে অস্বীকার করলে তো সমস্যার সমাধান হবে না। সংকটটা কোথায় সেটা দেখতে হবে। আট বছরেও কেন সিডিএর মেগা জলাবদ্ধতা প্রকল্প শেষ হলো না, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। প্রতিমন্ত্রী সেসব না করে জলাবদ্ধতার নতুন সংজ্ঞা দিলে তো হবে না। তিনি বলতে পারতেন, সরকার মাত্র এসেছে, কেন জলাবদ্ধতা হচ্ছে সেটা খতিয়ে দেখা হবে, জলাবদ্ধতা হয়নি– এই মিথ্যা কথা বলার কী দরকার ছিল?’
মহানগর বিএনপির সাবেক নেতা বলেছেন, ‘চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের। এ বছর জলাবদ্ধতার মূল কারণ হলো খাল-নালায় সিডিএর দেওয়া অস্থায়ী বাঁধ। এখানে মেয়রের দায় কম। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর হঠকারী মন্তব্যে সাধারণ মানুষের ক্ষোভটা গিয়ে পড়েছে সরকারের ওপর।’

ফেসবুকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া
চট্টগ্রামের সাংবাদিক মুহাম্মদ শামসুল হক ফেসবুকে মন্তব্য করে বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী খুব একটা খারাপ বলেননি। আসলে পানিতে শহর ভাসছে না! বরং ডুবেছে শহরবাসী, ঘরবাড়ি, জানমাল, যানবাহন।’ 
রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী আবু বক্কর মেহেদী মন্তব্য করেন, ‘সরকার পতনের 
জন্য বিরোধী দল লাগে না, এ রকম একজন প্রতিমন্ত্রীই যথেষ্ট।’ 

জরুরি সমন্বয় সভা
গতকাল বিকেল সোয়া ৩টায় নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে বিভিন্ন সেবা সংস্থার সঙ্গে জরুরি সভা হয়। সভা শেষে ব্রিফিংয়ে মেয়র বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিয়ে আমরা একে অপরকে দোষারোপ করলে হবে না, সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’