‘আমলাতন্ত্রকে মেধার ভিত্তিতে সাজাতে বেগ পাচ্ছে সরকার’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক আয়োজন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস ডিনারে যোগ দেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং।
সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ভালো রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও একটি ভালো জনপ্রশাসন অভিন্ন লক্ষ্যে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করলে সাফল্য মেলে।’ শক্তিশালী ও উদ্ভাবনী সরকারি নীতি তৈরি এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণকে উচ্চমানের সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করে দেশটির জনপ্রশাসন। বিভিন্ন বৈশ্বিক ও স্থানীয় সংকট পরিস্থিতিতেও সিঙ্গাপুর যে এগিয়ে গেছে, তার পেছনে দেশটির প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উদ্ভাবনী নেতৃত্বের ভূমিকার কথা স্মরণ করেছেন লি সিয়েন লুং। তিনি মনে করেন, এসব কারণে সিঙ্গাপুরের প্রশাসনিক কাঠামো রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো কিংবা জনপ্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতাহারে ‘মেধাভিত্তিক’ জনপ্রশাসন বা মেরিটোক্রেসি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ ছিল। মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র গড়ে তোলার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় আনুগত্য ও রাজনীতিঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কৃতি গড়ে ওঠায় মেধাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রশাসন সাজাতে বর্তমান বিএনপি সরকারকে বেগ পেতে হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারের দায়িত্বশীলরাও বলছেন, অতীতের দলীয়করণের সংস্কৃতির কারণে তাদের জন্য কাজটি সহজ হচ্ছে না।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসন পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল এবং বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তাদের রদবদল শুরু হয়েছে। তবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের জন্য উপযুক্ত কর্মকর্তা বাছাই নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। জানা গেছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব পদে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে কর্মকর্তাদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করা হলেও বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইতিবাচক সাড়া মিলছে না। আবার যেসব কর্মকর্তার এসিআর ইতিবাচক, তাদের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকায় চূড়ান্ত বিবেচনায় আটকে যাচ্ছেন। ফলে বর্তমান সরকারের সচিব নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মেধাভিত্তিক প্রশাসন বলতে শুধু কাগজে ভালো ফল করা মানুষদের খুঁজে এনে বসানো নয়। আমরা আগেও দেখেছি, বিশেষ করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, এ ধরনের কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু মূল বিষয় হলো যোগ্য মানুষকে সঠিক জায়গায় দেয়া এবং তার কাজ করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। শুধু যোগ্য লোক নিয়োগ দিলেই হবে না; নিয়ম-কানুন, সমন্বিত কাজের পরিবেশ এবং পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন—সবকিছু নিশ্চিত করলেই প্রকৃত অর্থে মেরিটোক্রেসি প্রতিষ্ঠা পাবে। এ জায়গায় এখনো শক্তিশালী অগ্রগতি চোখে পড়ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিভিন্ন সেক্টরে দলীয় আনুগত্য এতটাই প্রভাবশালী যে পেশাদারত্ব অনেক সময় চাপা পড়ে যাচ্ছে। এতে যারা সত্যিকার অর্থে পেশাদার মনোভাব নিয়ে এগোতে চান, তারা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন। সব মিলিয়ে বিষয়টি এখনো পর্যবেক্ষণের পর্যায়ে আছে। সময় দিলে হয়তো কিছু পরিবর্তন দেখা যাবে। তবে স্পষ্টভাবে বলা যায়, বাংলাদেশকে এগোতে হলে এ জায়গাগুলো অতিক্রম করতেই হবে। দলীয় আনুগত্য নয়, পেশাদারত্বই হতে হবে মূল মানদণ্ড।’
মন্ত্রিপরিষদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট ৮১ কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদমর্যাদায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন। সরকারের সচিব বা সমমর্যাদাসম্পন্ন ও তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ২০ সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কর্মরত রয়েছেন।
সর্বশেষ গত রোববার খাদ্য, পরিবেশ, কৃষি বিপণন, ট্রেড মার্কস, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগ, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোসহ ১১ অধিদপ্তর ও সংস্থায় নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের রেজিস্ট্রার জেনারেল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ১৯ এপ্রিল সচিব পদমর্যাদায় এনজিও-বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক, ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ওয়াক্ফ প্রশাসক পদে তিনজন কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় সরকার। তার আগে ১৬ এপ্রিল চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সাবেক সচিব আব্দুন নাসের খানকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব ও দুজন অতিরিক্ত সচিব বণিক বার্তাকে বলেছেন, মেধাবী ও দক্ষ আমলাতন্ত্র গঠনের জন্য পেশাদার কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করতে হবে। এ কাজের জন্যও পেশাদার লোক দরকার। অপেশাদার বা দীর্ঘদিন সিভিল সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত নন এমন কারো দ্বারা কখনো সেটি সম্ভব নয়। তবে খুঁজে বের করার পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।
সরকারের আরেক অতিরিক্ত সচিব বলেন, জনমুখী প্রশাসনের জন্য মেধা ও দক্ষতার পাশাপাশি দুর্নীতিমুক্ত কর্মকর্তা প্রয়োজন। এজন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা দেশের তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্য নিতে পারেন। সংস্থাগুলোর তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর শুধু মেধা বিবেচনা করলে চাকরিতে প্রবেশের সময় প্রত্যেকের যে ক্রমিক নম্বর সেটিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
ডিসি নিয়োগের ফিটলিস্ট প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সম্প্রতি প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ফিটলিস্টের জন্য আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয়া এবং মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট বা নোটিস বোর্ডে কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাচভিত্তিক প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের চিঠির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় ও প্রস্তুতির সুযোগ দিয়ে সাক্ষাৎকারে ডাকা হয়। ওয়েবসাইটেও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়। তবে এবার টেলিফোনের মাধ্যমে ডেকে ২৮ ও ২৯তম ব্যাচের প্রায় ৯০ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে অনেক কর্মকর্তা অংশ নেয়ার সুযোগ না পাওয়া এবং পছন্দমতো কর্মকর্তাদের ডাকার অভিযোগ তুলেছেন।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউএনও, ডিসি ও সচিব নিয়োগ একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ইউএনও ও ডিসিদের ক্ষেত্রে ফিটলিস্ট প্রণয়ন কমিটি কাজ করে, যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা ও রেকর্ড মূল্যায়ন করে তালিকা তৈরি হয়। এপিডি, একজন যুগ্ম সচিবসহ কয়েকজনের একটি কমিটির মাধ্যমে ইউএনও নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়। ডিসি নিয়োগের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে পৃথক একটি কমিটি রয়েছে, যেখানে চারজন শীর্ষ পর্যায়ের সচিব—ভূমি, স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব যুক্ত থাকেন। এ কমিটি ফিটলিস্ট চূড়ান্ত করার পর তা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয় এবং অনুমোদনের পর ধাপে ধাপে পদায়ন কার্যকর হয়। সচিব নিয়োগ তুলনামূলকভাবে নীতিনির্ধারণী ও উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত, যেখানে প্রধানমন্ত্রী, জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং সেখানে যোগ্যতা ও সিনিয়রিটির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশাসনিক বিবেচনাও কাজ করে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রসঙ্গে সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিয়মিত ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। কারণ দীর্ঘদিন বঞ্চিত বা উপেক্ষিত হলেও অনেক দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ পান। একইভাবে বর্তমান প্রশাসনে থাকা কর্মকর্তাদেরও বিবেচনায় নিতে হয়। ফলে সবকিছু মিলিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হয়।’
মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ পুরো প্রক্রিয়া একদিনে পরিবর্তনযোগ্য নয়, বরং ধীরে ধীরে সময় নিয়ে গড়ে তোলার একটি প্রশাসনিক বাস্তবতা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের কাঠামোগত সংকট দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার জনপ্রশাসন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ও কমিশন গঠন করলেও কার্যকর পরিবর্তন আসেনি।
বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র ব্রিটিশ আমলে গঠিত অভিজাত কাঠামোর ধারাবাহিকতা বহন করছে। ১৯৭২ সালের সংস্কার প্রস্তাবে জনমুখী প্রশাসনের কথা থাকলেও সে সময়ের আমলাদের প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতায় তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে জিয়াউর রহমানের সময়ে প্রশাসনে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেয়া হয়। এতে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও তা পরবর্তীকালে স্থায়ী হয়নি। পরবর্তী শাসকের আমলে পুরনো ধারা ফিরে আসে। ক্ষমতা ধরে রাখতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রশাসন ও সামরিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করেন। গণতান্ত্রিক আমলে বিভিন্ন সরকার প্রশাসনিক সংস্কার কমিটি গঠন করলেও সেগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে জনপ্রশাসন সংস্কারে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনও আসেনি।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসন টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে প্রশাসন—এমন অভিযোগ এসেছে বিভিন্ন মহল থেকেই। একই সঙ্গে বড় প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও ওঠে সে সময়ের প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে বিদেশে সম্পদ গড়া, বিনিয়োগ ও পরিবারের বসবাসসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে আর্থিক ও নিয়ন্ত্রক খাতে। ফলে জনপ্রশাসনে দক্ষতা ও সেবামুখী সংস্কৃতির ঘাটতি তৈরি হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা দেখায়, ভালো রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও একটি দক্ষ জনপ্রশাসন যখন অভিন্ন লক্ষ্যে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে, তখনই জনগণের জন্য কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা যায়। শক্তিশালী নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি জনমুখী প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব, যা সংকটকালেও দ্রুত ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম। রাষ্ট্র পরিচালনায় কার্যকর আমলাতন্ত্র অপরিহার্য। এজন্য কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা, বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অর্থনীতি-ভূরাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে। এ কমিশন ২০৮টি সুপারিশসহ সরকারের কাছে প্রতিবেদন পেশ করে। এর মধ্যে আশু বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল ১৮টি সুপারিশ। পরে তার মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত সহজে বাস্তবায়নযোগ্য আটটি প্রস্তাব বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন করা হয়েছে মাত্র তিনটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদিক হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার বারবার আমলাতান্ত্রিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগই কার্যকর হয়নি। এর প্রধান কারণ বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র নিজস্ব একটি শক্তিশালী কাঠামো ও স্বার্থ নিয়ে পরিচালিত হয়। এ কাঠামো স্বাভাবিকভাবেই এমন কোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করে, যা তাদের বিদ্যমান ক্ষমতা, প্রভাব বা সুবিধা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে রাজনৈতিকভাবে চাপ প্রয়োগ করে বা আমলাতন্ত্রকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে সংস্কার আনার চেষ্টা করলে তা সাধারণত সফল হয় না। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক সরকারকে শেষ পর্যন্ত আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই সংস্কার সফল করতে হলে তাদের অংশীদার করে, সঙ্গে নিয়েই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চালাতে হয়।’
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে আমলাতন্ত্র কেবল প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবেই থাকেনি; বরং তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি নির্ধারক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে মনে করেন গবেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। নীতিনির্ধারণ থেকে বাস্তবায়ন—সব ক্ষেত্রেই প্রশাসনের ভূমিকা ক্রমেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এ কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে একটি শক্তিশালী কিন্তু একই সঙ্গে অতিকেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক বলয় তৈরি হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের এ অবস্থা ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা বর্তমান নির্বাচিত সরকারের জন্য সহজ হবে না। কারণ চ্যালেঞ্জটি শুধু প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে আনা নয়, বরং সেটিকে পুনর্গঠন করা, যাতে রাষ্ট্র পরিচালনা আরো গতিশীল ও সেবামুখী করা যায়। প্রশাসন যদি নাগরিক সেবার বদলে নিয়ন্ত্রণের কাঠামো হিসেবেই কাজ করে, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তনও মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারে না। ফলে বর্তমান সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জটি দ্বিমুখী—একদিকে শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে পরিবর্তন আনা, অন্যদিকে সেই কাঠামোকে এমনভাবে রূপ দেয়া, যাতে তা রাষ্ট্রের গতিশীলতা ও নাগরিক সেবাকে অগ্রাধিকার দেয়।
জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমলাতন্ত্রকে পুরোপুরি রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছিল। সেখানে মেধাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, যার প্রভাব আমরা স্পষ্টভাবে দেখেছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভাঙা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’
মেরিটোক্রেসিকে প্রাধান্য দেয়া নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পোস্টিং, প্রমোশন বা নিয়োগ—কোনোটাই যেন প্রভাবান্বিত না হয়, সেটাই আমাদের মূল পরিকল্পনা। নিয়োগের সময় থেকেই মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। মেরিটোক্রেসি অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা তা বোঝারও উপায় আছে। যেমন যদি তালিকায় যোগ্য কাউকে বাদ দিয়ে কম যোগ্য কাউকে নেয়া হয়, তাহলে বোঝা যাবে যে মেধার নীতি মানা হচ্ছে না। অর্থাৎ যাচাইয়ের জন্য একটি স্পষ্ট মানদণ্ড থাকতে হবে।’
জনপ্রশাসন উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘আগের সময়ে প্রশাসনে যে অবস্থা ছিল, তা মূলত দলীয়করণ—সবকিছুই রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে ছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রশাসন গড়ে তোলা সহজ নয়। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করাও কঠিন। এটা এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে সমস্যা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে গেলে পুরো কাঠামোটাই নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তার পরও আমাদের এগোতে হচ্ছে। কারণ সবাই খারাপ নয়; এ ব্যবস্থার ভেতরে থেকেই কাজ করতে হবে। আমরা সবাই এ দেশেরই মানুষ। অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এটি খুবই কঠিন কাজ, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য একটাই—জনগণের কল্যাণ। সবশেষে জনগণের স্বার্থই আমাদের মূল ফোকাস।’
প্রথম আলো
‘আইসিইউ খুঁজতে খুঁজতে নিভে যায় শিশুদের প্রাণ’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, নাটোরের সোহাগ কুমার আর বন্দনা রানীর ঘরে প্রথম সন্তান এসেছিল মাত্র ছয় মাস আগে। ছোট্ট গৌরী—যার কান্না, হাসি আর নড়াচড়ায় ভরে উঠেছিল পুরো ঘর। কিন্তু সেই ঘরই এখন নিঃশব্দ।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ঢোকার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একসময় থেমে যায় গৌরীর শ্বাস। ১৮ এপ্রিল হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে মৃত্যু হয় শিশুটির।
গৌরীর বাবা সোহাগ কুমার ২০ এপ্রিল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইসিইউতে ভর্তির জন্য যখন সিরিয়াল পাওয়া গেল, ততক্ষণে আমার গৌরী আর নাই। আমি চেষ্টা করলাম, ডাক্তাররা চেষ্টা করলেন। কিন্তু আইসিইউতে যারা ভর্তি ছিল, তাদের সবার অবস্থাই খারাপ ছিল। সিরিয়াল তো আর ভাঙা যাবে না। সরকার যদি পারে আইসিইউর শয্যা বাড়াক।’
গৌরীর মতো অনেক শিশুর বাবা–মায়েরা চিকিৎসকের পরামর্শে যখন পিআইসিইউ শয্যার খোঁজে, তখন তাঁরা পাচ্ছেন সন্তানের মৃত্যুসংবাদ। পিআইসিইউর সংকট নতুন করে সামনে এসেছে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে। বিভিন্ন ঘটনা জানা যাচ্ছে, যেখানে শিশুদেরকে জরুরিভাবে পিআইসিইউতে নেওয়ার জন্য চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু শয্যা খালি পাওয়া যাচ্ছে না।
বড়দের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রকে বলা হয় আইসিইউ বা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ)। শিশুদের জন্য একই সেবার নাম পিআইসিইউ (পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট)। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, বড়দের ও ছোটদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের কিছু দিক দিয়ে ভিন্নতা রয়েছে।
কোভিড মহামারির সময় দেশে আইসিইউর সংকট বড় হয়ে উঠেছিল। তখন হাইকোর্টের এক আদেশে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ৭৩৩। পরিস্থিতির চাপে তখন আরও আইসিইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২২ সালের নভেম্বরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক তথ্যে দেশে তখন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট ১ হাজার ১৬৯টি আইসিইউ থাকার কথা বলা হয়।
বর্তমানে আইসিইউর সংখ্যা জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে দেশের ৭৪টি মেডিকেল কলেজ, জেলা, বিশেষায়িত ও জেনারেল হাসপাতালে মোট ১ হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যার তথ্য পাওয়া যায়। তবে শিশুদের জন্য পিআইসিইউর আলাদা কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি।
জেলা হাসপাতাল, এমনকি বিভাগীয় হাসপাতালেও অনেক ক্ষেত্রে পিআইসিইউ নেই। সেখান থেকে হামে আক্রান্ত মুমূর্ষু অনেক শিশুকে ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকার হাসপাতালগুলোতেও এখন পিআইসিইউ শয্যা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
যেমন বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পিআইসিইউ নেই। এই হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো সাপোর্ট প্রয়োজন হলে সে ক্ষেত্রে আমরা রোগীকে ঢাকায় স্থানান্তর করি।’
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেরও একই অবস্থা। এই হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আ ন ম তানভীর চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেটা দেওয়ার সুযোগ এখানে নেই। এ কারণে বেশির ভাগ রোগীকে ঢাকায় রেফার করতে হয়।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ৩৪ হাজার ৬৬২ জন, তার মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হন ২৩ হাজার ৩৪৮ জন। ৪ হাজার ৮৫৬ জনের হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে। হামে সংক্রমিত শিশুদের মধ্যে মারা গেছে ৪৭ জন, আর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২২৬ জনের। মোট মৃত্যু ২৭৩ জনের।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রথম পাতার প্রতিবেদন ‘আ.লীগের বোঝা বিএনপির কাঁধে’। খবরে বলা হয়, অনেক হইচই করেই মঙ্গলবার উদ্বোধন করা হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র। কিন্তু এই প্রকল্প নিয়েই চিন্তায় অস্থির বিদ্যুৎ বিভাগ। কারণ, প্রতিবেশী দেশ ভারতের চেয়ে এই প্রকল্পের ব্যয় দ্বিগুণ। এমনকি ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায়ও রূপপুরের নির্মাণ ব্যয় অনেক। তাই এত ব্যয়বহুল প্রকল্প পুরো জাতির জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প আপাদমস্তক দুর্নীতিতে ডুবে আছে। বালিশকাণ্ড থেকে শুরু করে এমন কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই যা এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ওঠেনি। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকার আমলে রূপপুর প্রকল্প থেকে পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের সদস্য যুক্তরাজ্যে বসবাসরত টিউলিপ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও আনা হয়। সেই অভিযোগ এখন দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক তদন্ত করছে।
অভিযোগ আছে, রূপপুর কেন্দ্রের ঠিকাদার রোসাটম শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারকে ওই টাকা দিয়ে এই প্রকল্পের ব্যয় ১২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত করেছে। অথচ অন্যান্য দেশে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হয় না। এখন পুরো জাতির কাছে এই প্রকল্প ব্যয় একটি বড় ধরনের বোঝা। আর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের এই বোঝা এখন এসে পড়েছে বিএনপির সরকারের কাঁধে।
রূপপুর কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনে বিতরণ করবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি। ওই সংস্থার একজন পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, রূপপুর কেন্দ্রে প্রচুর অনিয়মের অভিযোগ আছে। প্রকল্প ব্যয় নির্মাণের কাগজপত্র সহজে রোসাটম দেখাচ্ছে না; যা বেশ সন্দেহজনক। পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেছেন, কত দামে রূপপুরের বিদ্যুৎ কেনা হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। এজন্য তাদের কাছে কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে।
রূপুপর প্রকল্পের ব্যাপারে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, রূপপুর প্রকল্পে শেখ হাসিনা পরিবারের দুর্নীতির অভিযোগ বেশ আলোচিত। বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, রূপপুর প্রকল্পের দুর্নীতির সঙ্গে টিউলিপ সিদ্দিকী জড়িত। বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। তাই বর্তমান সরকারের উচিত এই প্রকল্প নিয়ে আরও অধিকতর অনুসন্ধান করা। তিনি বলেন, কোনো প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি মানে দুর্নীতির সুযোগ করে দেওয়া। অনেক প্রকল্পের মতো রূপপুর প্রকল্পেও তাই করা হয়েছে। সুতরাং বিষয়টিকে সেভাবে দেখে তদন্ত করা দরকার। সংশ্লিষ্টরা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মেগা দুর্নীতির একটি হচ্ছে রূপপুর প্রকল্প। বিএনপি সরকার সেই দুর্নীতির দায় না নিয়ে ঠিকমতো তদন্ত করলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হয়ে আসবে।
মঙ্গলবার রূপপুর কেন্দ্রের একটি ইউনিটের জ্বালানি লোড করা হয়। এর ফলে রূপপুর থেকে আগস্টে প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।
যেভাবে ব্যয়বহুল রূপপুর কেন্দ্র : ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের তিরুনেলভেলি জেলায় নির্মাণ করা হচ্ছে দেশটির বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কুদানকুলাম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট। নিউক্লিয়ার পাওয়ার করপোরেশন অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের ভিত্তিতে এটি নির্মাণ করছে রুশ প্রতিষ্ঠান রোসাটমের শতভাগ মালিকানাধীন সাবসিডিয়ারি অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট।
এই রোসাটমই পাবনার রূপপুরে নির্মাণ করছে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ ও ভারতের বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটির নির্মাণ ও উৎপাদন সম্পর্কে তুলনামূলক ব্যয়ের বিশ্লেষণ করেছেন বাংলাদেশের নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গৌর গোবিন্দ গোস্বামীসহ যুক্তরাজ্যের বোর্নমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন গবেষক। আন্তর্জাতিক জার্নাল স্প্রিঙ্গারে ‘এস্টিমেটিং দি ইকোনমিক কস্ট অব সিটিং আপ আ নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট অ্যাট রূপপুর ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে তাদের এই গবেষণা ও বিশ্লেষণ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়েছে।
কালের কণ্ঠ
‘মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে সংসদে উত্তেজনা’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রথম পাতার প্রতিবেদন। খবরে বলা হয়, জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তুমুল উত্তেজনা ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বিরোধী দলের সদস্যদের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে তাঁর দেওয়া বক্তব্যের সময় দফায় দফায় বিরোধী দলের প্রতিবাদে অধিবেশনে অচলাবস্থার পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকারকে একাধিকবার হস্তক্ষেপ করতে হয় এবং সংসদীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহবান জানাতে দেখা যায়।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ‘চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান’-এর তুলনা প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ফজলুর রহমান।
তিনি বিরোধীদলীয় নেতা শহীদ পরিবারের সদস্য উল্লেখ করে বলেন, শহীদ পরিবারের কোনো সদস্যের জামায়াতে ইসলামী করা ‘ডবল অপরাধ’।
এর জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তাঁর পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যা ‘গুরুতর অপরাধ’। তিনি বলেন, ‘আমি বলে থাকি, আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য। এটি চ্যালেঞ্জ করার কোনো অধিকার কারো নেই। আমি কোন দল করব, কোন আদর্শ অনুসরণ করব—এটি আমার নাগরিক অধিকার।’
অধিবেশনে বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিরোধী দলের নেতা বলেন, উনাকে আমি অসম্মান করি না, সব সময় ‘মাননীয়’ বলে কথা বলি। কিন্তু উনার দলের লোকজন এখানে বসে আছে, তারা আমাকে ‘ফজা পাগলা’ বলে। তারা নাকি সভ্য! তারা নাকি ইসলামের অনুসারী। বিরোধীদলীয় নেতা আমার চেয়ে ১০ বছরের ছোট। আমার বয়স ৭৮ বছর।”
এ পর্যায়ে স্পিকার তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনাকে কি কেউ এই ধরনের উক্তি করেছে? এ রকম তো সংসদে কেউ বলেনি।’ জবাবে ফজলুর রহমান বলেন, ‘করেছে।’ স্পিকার পুনরায় বলেন, ‘আপনি কেন নিজের গায়ে টেনে নিচ্ছেন?’ ফজলুর রহমান তখন জোর দিয়ে বলেন, ‘করেছে’।”
স্পিকার তাঁকে বক্তব্য চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলে জামায়াতে ইসলামী ও মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে কঠোর মন্তব্য করেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আচ্ছা, বিরোধী দলের নেতা বলেছেন উনি মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের লোক। উনি জামায়াতে ইসলামী করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না। শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করা ডাবল অপরাধ।’
তাঁর এই মন্তব্যের পর সংসদে ব্যাপক হট্টগোল শুরু হয়। বিরোধী দলের হট্টগোলের প্রতিবাদ জানাতে থাকেন সরকারি দলের সদস্যরা। স্পিকার পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে বলেন, ‘মাননীয় সদস্যকে বলতে দেন। সদস্যবৃন্দ, আপনারা শৃঙ্খলা রক্ষা করুন। সদস্যবৃন্দ, সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করুন।’ তখন ফজলুর রহমান আবারও বলেন, ‘আমি আবারও বলে রাখলাম, শহীদ পরিবারের লোক তো জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করতেছে।’ বক্তব্যের যাঁরা প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন, তাঁদের দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘ওই দেখেন, তারা কী ধরনের আচরণ করছে।’
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, পারমাণবিক শক্তি! শুনলেই কেমন যেন ভীতি কাজ করে। পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন তামাম দুনিয়ায় অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি প্রক্রিয়া। ৩৩তম দেশ হিসেবে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলো বাংলাদেশ।
পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে গতকাল মঙ্গলবার জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম প্রবেশ করানোর মাধ্যমে শুরু হয়েছে যাত্রা। সবার আশা, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে আগামী ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারে কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটটি।
আর্থিক বিবেচনায় বাংলাদেশের একক প্রকল্প হিসেবে সবচেয়ে বড় এটি। এখানে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সব সহযোগিতা করছে রাশিয়া। প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণ দিচ্ছে রাশিয়া, যেটি ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। এই সময়ে এখান থেকে মিলবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। তবে প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত কেন্দ্রটির আয়ু বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর।
ইত্তেফাক
‘মুক্তিযুদ্ধ, রাজাকার ও জামায়াত ইস্যুতে ফজলুর রহমানের বক্তব্যে সংসদে তীব্র হইচই’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধ, রাজাকার, আল বদর, জামায়াত ও চব্বিশের আন্দোলন ইস্যুতে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বক্তব্যে উত্তাপ ছড়িয়েছে সংসদে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর গতকাল মঙ্গলবার তার বক্তব্যের সময় বিরোধীদল ও সরকারি দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে ১০ মিনিট পরস্পরকে লক্ষ্য করে তীব্র হইচই করেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে এক পর্যায়ে নিজ আসন থেকে দাঁড়িয়ে যান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। উভয় পক্ষকে শান্ত হওয়ার জন্য তিনি বারবার অনুরোধ করলেও কোনো পক্ষই তাতে সায় দিচ্ছিলেন না। পরিস্থিতি শান্ত হলে স্পিকার সরকারি ও বিরেধী দলের উদ্দেশে বলেন, সারা জাতি দেখছে। লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। সংসদ যদি বিধি মোতাবেক না চলে, তাহলে এই সংসদ আর থাকবে না। সদস্যদের কর্মকা্লে শিশুরাও লজ্জা পাবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, যারা অলরেডি দাদা হয়ে গিয়েছেন, তাদের নাতিরা হয়তো এখানে গ্যালারিতে বসে দেখছে। তারা কী ভাববে এটা সম্পর্কে?
স্পিকার বলেন, ‘সংসদের স্পিকার যখন দাঁড়ায়, তখন এটি অবশ্যই কর্তব্য, সবাই এখানে বসে পড়বেন। আমাকে তো আপনারাই স্পিকার বানিয়েছেন।
সংসদের অভিভাবকের প্রতি যদি সম্মান আপনাদের না থাকে, তাহলে জাতীয় সংসদের প্রতি মানুষের কোনো রেসপেক্ট থাকবে না আগামীদিনে।’
ফজলুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না, কোনো শহিদ পরিবারের কেউ জামায়াত করতেই পারে না, করলে এটা ডাবল অপরাধ। মূলত তার এই বক্তব্য ঘিরেই দেখা দেয় উত্তেজনা। বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করলে সরকারি দলের সদস্যরাও প্রতিবাদ জানান।
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের তুলনার বিরোধিতা করে ফজলুর রহমান বলেন, আমি বলব, এই কথাটা বলাই অন্যায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে কুয়ার তুলনা করা। বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তারা বলেছিল, কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। সেইদিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বলেছিলাম, এই আল বদরের বাচ্চারা, এই রাজাকারের বাচ্চারা- এখনও কিন্তু ফজলুর রহমান জীবিত আছে। মুক্তিযুদ্ধ হইছে, মুক্তিযুদ্ধই সত্য। ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে, এটাও সত্য। আমরা সেদিন তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম।’
তিনি বলেন, ‘অনেক চক্রান্তের মধ্য দিয়ে ইলেকশন হইছে। সেই ইলেকশনে তারা কী করেছে? আজকে যারা আমার ডান দিকে (বিরোধী দল) বসে আছে, তারা কী করেছে? তারা যা করেছে, সেটা কল্পনা করার মতো না। সেই চক্রান্তের ভেতর দিয়ে যখন তারা প্রচার করতে শুরু করল, দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে তারা পাস করবে। আমি ফজলুর রহমান বলেছিলাম, জামায়াত জোট যদি দুই-তৃতীয়াংশ পায়, তাহলে আমি বিষ খাব। তারা কখনো যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারে না, রাজনৈতিক যুদ্ধে। তাদের পূর্ব পুরুষ বাংলাদেশ চায় নাই। যতদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার বেঁচে থাকবে, ততদিন রাজাকার এদেশে কখনো জয়লাভ করতে পারবে না।’
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘রূপপুরে ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু’। খবরে বলা হয়, পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক শক্তিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করল এবং বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হলো।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ভার্চুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অগ্রগতি শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
কিভাবে কাজ করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল ভিত্তি হলো নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়া। চুল্লিতে ইউরেনিয়াম জ্বালানি প্রবেশ করানোর পর এর পরমাণু বিভাজনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। এই তাপ ব্যবহার করে পানি বাষ্পে রূপান্তরিত করা হয়, যা উচ্চচাপে টারবাইন ঘোরায়। টারবাইনের সাথে সংযুক্ত জেনারেটরের মাধ্যমে এই যান্ত্রিকশক্তি বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হচ্ছে রাশিয়ার আধুনিক ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি, যা তৃতীয় প্রজন্মের উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থাসম্পন্ন রিঅ্যাক্টর হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এতে ডাবল কনটেইনমেন্ট সিস্টেম রয়েছে, যা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয়তা বাইরে ছড়িয়ে পড়া রোধ করে। এ ছাড়া কোর ক্যাচার প্রযুক্তি গলিত জ্বালানিকে নিরাপদে ধারণ করতে সক্ষম, যা বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমায়। স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে যে নিরাপত্তা মানদণ্ড জোরদার করা হয়েছে, এই ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি তা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আজকের পত্রিকা
‘দেশের অর্থনীতি: সব খাতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ক্ষত’-এটি দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কালো ছায়া পড়েছে বিশ্বের দেশে দেশে। নানা সংকটে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। বাংলাদেশও এর বাইরে নেই। অনিশ্চয়তার ছাপ এসে পড়েছে দেশের অর্থনীতির প্রতিটি খাতে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পরিবহন ব্যয় থেকে বাজারদর, শিল্প উৎপাদন থেকে আমদানি-রপ্তানিতে। সব জায়গায় বেড়ে যাচ্ছে ব্যয়। আর তাতে শেষ পর্যন্ত ভুগতে হচ্ছে মানুষকেই।
অর্থনীতির এই অবস্থা নিয়ে এরই মধ্যে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, যুদ্ধকেন্দ্রিক সংকটের কারণে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। পাশাপাশি প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচেই থেকে যেতে পারে।
এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দু জ্বালানি খাত। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে বিশ্ববাজারে যে দামে জ্বালানি আমদানি করা হতো, এখন তা প্রায় দ্বিগুণ। এরই মধ্যে জ্বালানি আমদানিতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার।
তবে বেসরকারি আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের মতে, এ ধাক্কা শুধু জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার বাড়লে আমদানি ব্যয় গড়ে ৮০০ থেকে ১,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়ে। সাম্প্রতিক দুই মাসে এই চাপ মিলিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকায়।
এই বাড়তি ব্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তেল, কয়লা ও এলএনজি থেকে পাওয়া দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৬৫ শতাংশই আসে আমদানি করা জ্বালানিনির্ভরতা থেকে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে গত এক বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ১২ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে, আর সাম্প্রতিক দুই মাসে সেই চাপ আরও তীব্র হয়েছে। ফলে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে, যা সরাসরি সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় প্রতিফলিত হচ্ছে।
বাণিজ্য খাতে এই সংকটের আরেকটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি জানায়, আমদানির পরিমাণ কমলেও ব্যয় কমছে না, বরং বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি ‘কম ভলিউম, বেশি ব্যয়’—আমদানি করা মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ।
এই পরিস্থিতির সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব তুলে ধরেছে সানেম। তাদের ‘সিজিই’ মডেল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তেলের দাম ৪০ শতাংশ এবং এলএনজি ৫০ শতাংশ বাড়লে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১.২ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি ২ শতাংশ এবং আমদানি ১.৫ শতাংশ কমতে পারে। মূল্যস্ফীতি বর্তমানের চেয়ে বাড়তে পারে আরও ৪ শতাংশের মতো, যা সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে এবং প্রকৃত মজুরি কমাবে। গত মার্চ মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭১ শতাংশ।
ব্যবসায়ীদের কাছে গেলে সংকটের আরও কঠিন বাস্তবতা পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি উৎপাদন খরচে পড়ে। পরিবহন থেকে কাঁচামাল—সব খরচ একসঙ্গে বাড়ে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম চাইলেই বাড়ানো যায় না, ফলে ব্যবসার লাভের মার্জিন কমে যাচ্ছে।’
এ ছাড়া সরবরাহ ব্যবস্থায়ও চাপ স্পষ্ট। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ গড়ে সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে সমুদ্রপথে শিপিং খরচ ৩৫-৪৫ শতাংশ এবং বিমা প্রিমিয়াম ৫০-৬০ শতাংশ বাড়ায় আমদানি-রপ্তানি উভয় খাতে ব্যয় বেড়েছে। ফলে কাঁচামাল আমদানির খরচ বাড়ছে, আবার রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির গত সপ্তাহে জাতীয় সংসদে বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে আমদানি ব্যয়, শিপিং ও বিমা খরচ বেড়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি কমেছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
দেশ রূপান্তর
দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘সংসদীয় গণতন্ত্রে সুবাতাস’। খবরে বলা হয়, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোয় হাজার মানুষের আত্মত্যাগ ও নাগরিকদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে পাওয়া বর্তমান জাতীয় সংসদ দেশে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রচর্চার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, কেবল নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুমোদন নয়, সংসদ সদস্যরা (এমপি) নাগরিক স্বার্থের নানা বিষয়ে প্রশ্ন করছেন, দাবি তুলছেন। সরকারের মন্ত্রীরা জবাবদিহি করছেন সেখানে। এতে সংসদ ফিরে পেয়েছে তার প্রত্যাশিত ছন্দ।
প্রধান রাজনৈতিক দল, সংসদ পরিচালনায় জড়িত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও বিশ্লেষকদের আশা সংসদীয় গণতন্ত্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করতে সরকারি ও বিরোধী দল সবাই মিলে চেষ্টা করবে। সে ক্ষেত্রে তারা সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের ভূমিকার প্রশংসাও করেছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সরব উপস্থিতিতে সংসদ প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে। এখন পর্যন্ত সংসদ নিয়ে গণমানুষের যে প্রত্যাশা, তা পূরণ হতে চলেছে এটা বলা যায়। সংসদ এখন কেবল সরকারি সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জায়গা নয়, বরং প্রকৃত অর্থেই জবাবদিহিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বিরোধীদলীয় এমপিদের জোরালো কণ্ঠস্বর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংসদ আবার কার্যকর হতে শুরু করার প্রমাণ, এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সংসদীয় কার্যক্রমের এই পরিবর্তনশীল ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।’
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ। আগামীকাল বৃহস্পতিবার এ অধিবেশন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন ছাড়াও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, জ্বালানি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দল নির্বিশেষে এমপিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। এতে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের সুবাতাস নতুন করে বইছে এমনটি মনে করছেন প্রায় সবাই।
সরকারি দল বিএনপির মহাসচিব, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিএনপি সংসদ কার্যকর করতে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। সংসদীয় কার্যক্রমে বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখা যাচ্ছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ মনে করেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান সংসদ কার্যকর ও প্রাণবন্ত। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো মতভিন্নতা। এটি ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ স্পিকার আশা প্রকাশ করেন, সরকার ও বিরোধী দল এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
চলমান জ্বালানি সংকট নিরসনে আলোচনার জন্য বিরোধী দলের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ কমিটি গঠনের কথা বলেন। শেষ পর্যন্ত উভয় দিক থেকে পাঁচজন করে নিয়ে মোট ১০ সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে।