Image description
চট্টগ্রামে ঘণ্টা চারেকের বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। ছবিটি মঙ্গলবার নগরীর মুরাদপুর এলাকা থেকে তোলা

মৌসুমের প্রথম ভারি বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম মহানগরীর অধিকাংশ নিচু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। নগরীর সড়ক-মহাসড়ক, অলিগলি পানিতে থইথই করছে। কোথাও কোমরসমান, কোথাও হাঁটুসম, আবার কোথাও বুকসমান পানি। দোকানপাঠ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতেও উঠেছে পানি। ৫০ বছর পানি উঠেনি-এমন এলাকায়ও এবার জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ভয়াবহ এ জলাবদ্ধতা নিয়ে ক্ষোভ, দুঃখ, কষ্ট আর দুর্ভোগের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তুলে ধরেছেন।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) উদ্যোগে ১০ হাজার কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ শেষের দিকে। অথচ এবার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর পাঁচলাইশের বাসভবন হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে জলাবদ্ধতা কমে আসার কথা থাকলেও উলটো বেড়ে যাওয়ায় কাজ নিয়ে সাধারণ নগরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রকল্পের হাজার হাজার কোটি টাকা কি তাহলে জলেই যাচ্ছে?

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন সকাল থেকে জলমগ্ন নগরীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। খাল-নালায় জমে থাকা বর্জ্য অপসারণে করপোরেশনের কর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছেন। বান্ডেল রোড, ফিরিঙ্গিবাজার, বদরখালী খালসহ বিভিন্ন এলাকা তিনি পরিদর্শন করেছেন। তবে তিনি বলেন, জামালখান খাল, হিজড়া খালসহ বেশকিছু খালের খননকাজ চলছে। কোথাও কোথাও খাল বাদ দিয়ে রিটেইনিং ওয়াল (মাটি ধরে রাখা) দেওয়া হয়েছে। এতে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চউকের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড। প্রকল্পের কাজ শেষের পথে। মের দিকে কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে হয়তো সুফল আসবে।

বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি ২টা পর্যন্ত চলে। ১২টার দিকে নগরীর সড়ক-মহাসড়ক তলিয়ে যায়। বিভিন্ন সড়কে প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল পানির নিচে তলিয়ে যায়।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন গন্তব্যের মানুষ বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ে। কোনো কোনো এলাকায় কোমরসমান পানি মাড়িয়ে মানুষকে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। মৌসুমের প্রথম কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায় চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে। দিনে নেমে আসে রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার। ক্ষণে ক্ষণে আকাশে মেঘের গর্জন ও বজ্রপাতে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে নগরবাসী।

আবহাওয়া অফিস জানায়, কালবৈশাখী ঝড়ের প্রভাবে বৃষ্টি হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরে বজ্রমেঘ সৃষ্টি অব্যাহত থাকায় চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগে ৪৮ ঘণ্টায় ভারি বর্ষণ হতে পারে। জলাবদ্ধতার পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের শঙ্কা রয়েছে। সরেজমিন নগরের জিইসি মোড়, প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর বিশ্বরোড, কাতালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়-কোথাও কোমরসমান আবার কোথাও বুকসমান পানি। জিন্নাহ চৌধুরী ফেসবুকে লেখেন, ‘জলাবদ্ধতার কারণে ৩ ঘণ্টা আটকে আছি আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায়।’ মেহেদীবাগের গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ম্যানেজার মোবারক আলী যুগান্তরকে বলেন, মেহেদীবাগের সড়কে সাধারণত পানি ওঠে না। কিন্তু মঙ্গলবারের বৃষ্টিতে সেই সড়কও তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতায় ফিরতে পারছি না বাসায়। নগরীর জুবিলী রোড ও তিন পোলের মাথা এলাকায় সাধারণত পানি উঠে না। জুবিলী রোডও কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রবর্তক মোড়ে সবচেয়ে বেশি পানি জমে। এখানে বুকসমান পানি সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সড়কে প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা অর্ধডুবন্ত অবস্থায় দেখা গেছে।

আসকার দিঘির বাসিন্দা ওমর ফারুক যুগান্তরকে জানান, এ এলাকায় ৫০ বছরেও পানি ওঠেনি। অথচ এবার ৪ ঘণ্টার বৃষ্টিতে সড়ক ডুবেছে। দোকানপাঠ ও বাড়িঘরে পনি ঢুকেছে। জামালখান খালে বাঁধ দিয়ে খনন করায় ও রিটেইনিং ওয়াল দেওয়ায় পানি নিষ্কাশন হতে পারছে না। ফলে পানি উঠেছে। পাঁচলাইশে সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর বাসভবনে পানি ঢুকে গেছে। নিচতলায় কোমরসমান পানি জমেছে। এতে আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে গেছে।

মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, অতীতে আমার বাসা কখনো পানিতে তলিয়ে যায়নি। তিনি জানান, ১০ হাজার কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প আগামী মাসে শেষ হবে। অথচ এভাবে নগরী ডুববে, তা মাথায় আসছে না। তিনি আরও বলেন, মেয়রকে ফোন করেছিলাম দুপুরে। আমার বাসার কী অবস্থা দেখার জন্য। তিনি আসবেন আসবেন বলেও আসেননি। কাকে কী অভিযোগ দেব।

পানির তোড়ে কোতোয়ালি থানা এলাকার জহুর হকার্স মার্কেটের দোকানের মালামাল ভেসে গেছে। হালিশহরের বিভিন্ন সড়কের ওপর যেন বইছে নদী। পথচারীদের পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। স্থানীয়রা জানান, খাল-নালা ভরাট, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং ময়লা-আবর্জনায় ড্রেন আটকে থাকায় জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করছে। বৃষ্টির পানিতে রাস্তা-ফুটপাত, নালা একাকার হয়ে গেছে। পলিথিনসহ নানা বর্জ্য ভেসে যেতে দেখা গেছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম জানান, মঙ্গলবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। ৯৬ ঘণ্টা ভারি বৃষ্টিপাতের শঙ্কা রয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।