Image description
বিশেষজ্ঞদের অভিমত

দেশের আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ।’ কিন্তু অধ্যাদেশটিতে সংশোধনী এনে রীতিমতো ব্যাংক লুটেরাদের ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। চলতি সংসদে এই আইন পাশ করা হয়। এর ফলে অতীতে যারা ব্যাংক লুট করেছে, তাদের কাছে ব্যাংকের মালিকানা অনেকটা সহজ শর্তে ফিরে যাবে। ধসেপড়া ব্যাংকগুলোর আর সোজা হয়ে দাঁড়ানোর কোনো পথ খোলা থাকবে না। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীরা আরও বিপদের মুখে পড়বেন।

যুগান্তরের কাছে এমন আশঙ্কা জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে-তার মধ্যে এ অধ্যাদেশটি ছিল অনেকটা আশার বাতিঘর। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে যেভাবে সংশোধন করে আইন পাশ করেছে তাতে তারা একেবারে হতাশ। বিশ্লেষকরা বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হলো-অধ্যাদেশটি সংশোধনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কারও সঙ্গে কোনো সরকারই আলোচনা করেনি। তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতকে টেনে তুলতে সাহসী পদক্ষেপ হিসাবে অনেকটা কঠোর অবস্থান নিয়ে এই অধ্যাদেশটি করেছিল। যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল-লুট হওয়া ব্যাংকগুলো দ্রুত পুনর্গঠন করা এবং যারা লুট করেছে তাদের ব্যাংকের মালিকানা থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু এখন যা করা হলো তাতে দুর্বল ব্যাংকগুলো আরও বিপদে পড়বে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘এটা (অধ্যাদেশে পরিবর্তন) মূলত এস আলমকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের অংশ। এ কারণে তড়িঘড়ি করে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা ছাড়াই আইনটি পাশ করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘আর্থিক খাত ও সরকারের প্রভাবশালীদের সঙ্গে এস আলমের একটা গোপন সম্পর্ক রয়েছে; তা না হলে হঠাৎ করে এ আইন পরিবর্তন করার কথা ছিল না।’ ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন এই আইনের কারণে ব্যাংক লুটেরা ফিরে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। তারা ফিরে এলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এ ধরনের ঘটনা যে ঘটবে, তা আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। তবে এখন উদ্বেগ জানিয়ে রাখলাম।’

আইনটি নিয়ে সমালোচনার পর সংসদে এর জবাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ব্যাংক অধ্যাদেশে এই পরিবর্তন অর্থনীতির বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে একটি নতুন সুযোগের জানালা। সরকার ইতোমধ্যে দুর্বল ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। সামনে আরও বিনিয়োগ করতে হবে। তিনি মনে করেন, আইনে সংশোধিত নতুন ধারা সরকারকে আর্থিক চাপ থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দেবে। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াবে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে। ক্ষুদ্র ও সাধারণ শেয়ারধারীদের স্বার্থ রক্ষা হবে।

প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সবগুলো সরাসরি আইনে রূপ দেওয়া হয়নি। জনগুরুত্বপূর্ণ ১৬টি অধ্যাদেশ সংশোধন করা হয়। আর ২০টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়েছে। যেগুলো সংশোধন করা হয়েছে সে তালিকায় ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ অন্যতম। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশের ক্ষমতা বলে লুট হওয়া ৫টি ব্যাংক ওই সময়ে একীভূত করা হয়। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় এসে হুবহু পাশ না করে সংশোধনী এনে আইনে রূপ দেয়। নতুন ওই আইনে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর মালিকানা, আগের মালিকদের ফিরে পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, একীভূত ব্যাংক বাঁচিয়ে রাখতে সরকার এ পর্যন্ত যে অর্থ দিয়েছে, তার সাড়ে ৭ শতাংশ পরিশোধ করে আগের মালিকরা এর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘রাতের আঁধারে ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ বিলটি পাশ করে নেওয়া হয়েছে। এই সংশোধন নিয়ে সরকার কারও সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা কিছুই করল না। এ ধরনের অধ্যাদেশ নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে পুরোপরি সাংঘর্ষিক।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাংক খাত নিয়ে খেলাধুলা করার পরিণতি কারও জন্যই ভালো হবে না। অতীতেও ভালো হয়নি।’

যেসব বিষয়ে বিতর্ক : অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে অধ্যাদেশটি জারি করেছিল, তার নাম : ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ ২০২৫।’ বর্তমান সরকার এর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধারায় সংশোধন এনে ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন ২০২৬’ নামে গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাশ করে। এই আইনে ‘লুটপাটকারীদের’ কিস্তিতে আবারও ব্যাংক দখলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশে ‘সংস্কার’ ও ‘জবাবদিহি’র ক্ষেত্রে যে কঠোর অবস্থান তৈরি হয়েছিল, নতুন আইনে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করে তা বাতিল করা হয়েছে। এই ধারার মাধ্যমে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর পুরোনো মালিকদের পুনরায় ফেরার আইনি পথ তৈরি করা হয়েছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে-সাবেক পরিচালক বা মালিকরা সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিয়োগ করা অর্থের মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করে ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পেতে পারেন। বাকি ৯২.৫ শতাংশ অর্থ ১০ শতাংশ সরল সুদে দুই বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু অধ্যাদেশে উল্লেখ ছিল, কোনো ব্যাংক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সব অর্থ ফেরত দিলেও তাদের মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যেখানে ব্যাংক লুটেরাদের শাস্তি পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে তাদের পুরস্কার দেওয়া হলো। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অধ্যাদেশটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি ১৮(ক) ধারা যুক্ত করার বিপক্ষে ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকও আনুষ্ঠানিকভাবে এই ধারাটি বাতিলের অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সরকার কোনো কিছুই আমলে নেয়নি। এছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া অধ্যাদেশে মোট ৯৮টি ধারা ছিল। নতুন আইনে তা কমে ৭৫টিতে দাঁড়িয়েছে।

জানতে চাইলে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, দখলবাজ লুটেরাদের হাতে ব্যাংকের মালিকানা তুলে দেওয়া যাবে না। শুধু সাড়ে সাত শতাংশ নয়, শতভাগ টাকা দিলেও এসব লুণ্ঠনকারীর হাতে আর ব্যাংক তুলে দেওয়া উচিত হবে না। তার মতে, এ ধরনের কাজ করলে ব্যাংক খাতে এমন ভয়াবহ পরিণতি নেমে আসবে, যা শেখ হাসিনার পরিণতিকেও ছাড়িয়ে যাবে।