রাজধানীর বিভিন্ন বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অনেকটা প্রকাশ্যেই চলছে মাদক কেনাবেচা। বিশেষ করে মুগদা, মগবাজার, মালিবাগ, কারওয়ান বাজার এবং কড়াইল বস্তি এলাকায় মাদকের কারবার অনেকটা প্রকাশ্য। এমনকি মহাখালী ও মগবাজার ফ্লাইওভার ঘিরে গড়ে উঠেছে মাদক কারবারিদের অভয়ারণ্য। স্থানীয়রা বলছেন, এসব এলাকায় মাদক এখন আর গোপন কিছু নয়; বরং প্রকাশ্যেই চলছে বেচাকেনা।
সরেজমিন দেখা গেছে, মালিবাগ আবুল হোটেলের পাশে ফ্লাইওভারের নিচে সন্ধ্যা নামলেই চলে প্রকাশ্য মাদক সেবন। কাঁথা, পলিথিন ইত্যাদি দিয়ে ছোট্ট বেষ্টনী তৈরি করে মূল সড়কের মাঝেই চলে মাদক সেবন ও বিক্রি। আবুল হোটেলের পেছনে মগবাজার অংশে রড-সিমেন্টের গলির ভিতরে ঢুকতেই আরেকটি গলি চলে গেছে মধুবাগের দিকে। অন্য পাশের গলিতে বসে মাদকের হাট। সেখানে দেখা গেছে মাদকসেবীদের আনাগোনা। শেষ মাথায় যেতেই চোখে পড়ে পাঁচ তলা বিল্ডিংয়ের নিচে টিনশেডের ওপর থেকে দড়িতে বেঁধে চলছে মাদকের প্রকাশ্য বেচাকেনা। হাতির ঝিলে মধুবাগের আশপাশের বস্তিগুলোরও একই দশা। বিভিন্ন চায়ের দোকানে পাওয়া যাচ্ছে মাদক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রিকশা গ্যারেজগুলো কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মাদকের কারবার। স্থানীয় বাসিন্দা ও মাতৃছায়া ক্যাডেট স্কুলের এক শিক্ষক বলছেন, ‘স্থানীয়রা কেউ কোনো প্রতিবাদ করছে না, উল্টো মনে হবে যেন এ গলিতে মাদক নয়, মুদির দোকান। মগবাজারের অলিগলিতে হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে পোঁটলা। এসব পোঁটলায় রয়েছে হেরোইন, গাঁজা, ইয়াবার মতো মারণঘাতী মাদক।
মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে বস্তিকেন্দ্রিক কিশোর গ্যাং ও উঠতি অপরাধীরা পাড়ামহল্লায় ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হচ্ছে। ফলে সাধারণ নাগরিকের চলাচল চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।’ কারওয়ান বাজার রেললাইনসংলগ্ন বস্তি এলাকাটি দীর্ঘদিন মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত। ট্রেনের শব্দ আর মানুষের ভিড় কাজে লাগিয়ে এখানে চলে হেরোইন ও ফেনসিডিলের বিকিকিনি। মুগদা ও মালিবাগের বস্তিগুলোতে ইদানীং নতুন আপদ হিসেবে যুক্ত হয়েছে আইস বা ক্রিস্টাল মেথ। উঠতি বয়সের তরুণরা এ মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে। পূর্ব মেরুল বাড্ডায় ফুলকলি গলির পাশের ছোট্ট গলিটি এখন পরিচিত ‘গুটির গলি’ নামে। এখানে রীতিমতো মাদকের কারখানা রয়েছে বলেও অনেকে অভিযোগ করেন। এ গলিতে ঢুকলে হাতের ডানে একটি পরিত্যক্ত মাঠে সারা দিনই চলে মাদকের কারবার। পাশাপাশি ছিনতাইকারী ও চোর চক্রের শক্ত অবস্থান এখানে। ছোটখাটো চুরির মালামাল কেনাবেচা থেকে শুরু করে বড় ধরনের অপরাধের পরিকল্পনা সবই হচ্ছে এসব আস্তানায়।
কড়াইল বস্তিতে দেখা গেছে মাদকের সিন্ডিকেট অনেক শক্তিশালী। বনানী লেকের পার দিয়ে বস্তিতে প্রবেশের মুখে প্রকাশ্যেই ইয়াবা ও গাঁজার কেনাবেচা ও সেবন দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এখানে মাদকের হাটবাজার বসে।
কড়াইল বস্তি থেকেই গুলশান, বনানী, বাড্ডা, ভাটারাসহ আশপাশ এলাকায় ইয়াবার সরবরাহ যায়। বস্তির বউবাজারে সন্ধ্যা নামতেই বসে মাদকের হাট। এ বস্তি কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ভয়ংকর সন্ত্রাসী বাহিনী।
বিশেষজ্ঞদের মতে বস্তিগুলোতে শিক্ষার অভাব, বেকারত্ব এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক তরুণ সহজেই মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। অপরাধী চক্রগুলো তাদের ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে একদিকে যেমন অপরাধ বাড়ছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এ বি এম নাজমুস সাকিব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের সমাজে মাদককাণ্ডে নানান বিচারহীনতার উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। ফলে মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। অপরাধীদের বিচার না হলে অপরাধ ছোঁয়াচে রোগের মতো সমাজে ছড়িয়ে পড়বে।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘মাদক ও অস্ত্রের পাশাপাশি এসব বস্তিতে অসামাজিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। আমরা নিয়মিত ব্যবস্থা নিচ্ছি। এসব জায়গায় আমরা অভিযান পরিচালনা করব।’