Image description

দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। ইতিমধ্যে বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা শেষ হলেও এর মধ্যেই প্রশ্নফাঁসের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে একাধিক অসাধু চক্র প্রশ্নফাঁস নিয়ে তৎপর রয়েছে এবং বিশেষ করে ফেসবুক ও টেলিগ্রামের বিভিন্ন গ্রুপে এসব প্রশ্ন ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যদিও আজ শনিবার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানিয়েছে, প্রতারক চক্র প্রশ্ন ফাঁসের জন্য অনৈতিক লেনদেন করলেও মূল প্রশ্নের সঙ্গে তাদের প্রশ্নের মিল পাওয়া যায়নি।

ফেসবুক ও টেলিগ্রামের বিভিন্ন প্রাইভেট গ্রুপে এসএসসির প্রশ্ন বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষার্থীদের টার্গেট করছে এই চক্রটি। প্রথমে সাধারণ গ্রুপে যুক্ত করে সেখান থেকে বাছাইকৃতদের নিয়ে যাওয়া হয় টেলিগ্রামের একটি 'সিক্রেট গ্রুপে'। শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য ২০ এপ্রিল রাত ১১টায় গ্রুপটিতে ফ্রিতে প্রশ্ন দেওয়া হয়, যা পরবর্তী দিনের বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষার প্রশ্নের সাথে হুবহু মিলে যায়। বেসরকারি টেলিভিশন সময় টিভি এমনই এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

গণমাধ্যমটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক এসএসসি পরীক্ষার্থী প্রশ্নফাঁসের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, 'একটি টেলিগ্রামের একটি গ্রুপে পরীক্ষার আগের দিন সকালে মেসেজ দিয়ে বলে, আজ রাত ১১ টার দিকে এখানে আসল প্রশ্ন দেওয়া হবে। পরীক্ষার রাতে আবার ঢুকলাম। ঢুকে দেখি প্রশ্ন দেয়নি। এ সময় তারা জানায়, আজ প্রশ্ন দিতে পারছে না। পর দিন আমার মত পরীক্ষা দিয়ে বাসায় আসলাম। আসার পর যখন আবার গ্রুপটিতে ঢুকে দেখি, এ কি অবস্থা! ওই চ্যানেলে আরেকটা চ্যানেলের লিংক দেয়া আছে। লিংকে ঢুকে দেখি একটা ৩০০০ সাবস্ক্রাইবারের একটা চ্যানেলে লেখা সকল বোর্ড ২০২৬। ওখানে ঢুকে একটু পরের দিকে গিয়ে দেখি আগের রাত তথা ২০ এপ্রিল রাত ১১টা ২৪ মিনিটে দিনাজপুর বোর্ডের প্রশ্ন দেয়া। মিলিয়ে দেখি- আমাদের প্রশ্নের সাথে হুবহু কমন, একটুও এদিক ওদিক নেই।'

সময় টিভির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গ্রুপগুলোয় ঢাকা, বরিশাল, সিলেট, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহসহ প্রায় সকল বোর্ডের প্রশ্ন পাওয়া যাচ্ছে। বাংলা প্রথম পত্রের প্রশ্ন ফ্রিতে দিয়ে আস্থা অর্জন করলেও পরবর্তী পরীক্ষাগুলোর জন্য বড় অংকের টাকা দাবি করছে চক্রটি। চক্রটি বোর্ড ভেদে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নের জন্য ১০ থেকে ১৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করছে এবং অনেক শিক্ষার্থী তা কিনেও নিচ্ছেন। 

ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী আরও জানান, 'এই বিষয়টা আমার ফ্রেন্ডদেরকে শেয়ার করলাম যে কি অবস্থা! ওরা বলল ভাই প্রটেস্ট তো করতে হবে। এখন দেখি পেমেন্টের সিস্টেমটা কি? সবাই মিলে যদি সবাই ৪০০/৫০০ টাকা করেও দেই আমরা মোটামুটি সবাই ১০-১১ হাজার টাকা তুলতে পারব। আমরা ফ্রেন্ড মিলে সবাই কম বেশি দিয়ে একটা টাকার এমাউন্ট দাঁড় করাইলাম। করার পর ওখানে মেসেজ দিলাম যে আমরা হচ্ছে কোশ্চেন নিতে চাচ্ছি। কীভাবে কী করব? এরপর তারা অনেকক্ষণ পর সিরিয়াল নাম্বার দেয়। পরে সিরিয়াল নাম্বার দেয়ার পর একটা ক্যাশ আউট নাম্বার দেয়, যেখানে ক্যাশ আউট করতে হবে। আমি ওখানে ক্যাশ আউট করি। ক্যাশ আউট করার পর তারা একটু সময় এবং আমার ইনফরমেশন নেয়। ওখানে ১০৮০০ ক্যাশ আউট করি।'

শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এখনই যদি এই অসাধু চক্রকে রুখে দিয়ে প্রশ্নফাঁস পুরোপুরি বন্ধ করা না যায়, তবে এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। অসাধু উপায়ে প্রশ্ন সংগ্রহ করে পরীক্ষা দেওয়ার প্রবণতা মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

ফাঁস চক্র প্রতারণায় জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার: এদিকে এদিকে এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্তে অনলাইন প্রতারণার সাথে জড়িত চার প্রতারক গ্রেফতার করেছে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। গ্রেফতারকৃতরা হলো- মো. সিফাত আহমেদ সজিব (২২), মো. সালমান (২২) এবং মো. মেছবাউল আলম মাহিন (১৯) ও মোঃ মহিদুজ্জামান মুন্না (১৯)।

সংবাদ সম্মেলনের জানানো হায়, গত সোমবার (২০ এপ্রিল) সিটি-ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস বিভাগ (সিউটিসি) কর্তৃক সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিংয়ের সময় ‘এসএসসি-২০২৬ প্রশ্নপত্র ফাঁস গ্রুপ’ নামক একটি ফেসবুক পেইজ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সিটিটিসির একটি চৌকস দল একই দিন রাত ৮.২০ টায় ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানার জিরাবো তাঁজপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে মোঃ সিফাত আহমেদ সজিবকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারকৃতের স্বীকারোক্তি ও প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণের পর বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বগুড়ার ধুনট থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোঃ সালমানকে তার নিজ বসত বাড়ি হতে গ্রেফতার করা হয়। একই দিন দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ থানাধীন নবাবগঞ্জ বাজার হতে দেওগাঁ রিয়াজউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালেয় গামী পাকারাস্তার মধ্যবর্তী দাদনপুর মালিপাড়াগামী কাচারাস্তার সংযোগ স্থলে কাচাঁরাস্তার উপর হতে মোঃ মেছবাউল আলম মাহিনকেও গ্রেফতার করা হয়।

পরবর্তীতে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ থানাধীন নওগা ইউনিয়নরে শাহ শরীফ জিন্দানী (রহঃ) এর মাজার সংলগ্ন পরামানিক বাড়ীর আসামীর শ্বশুর সালাম পরামানিক এর বসতঘর হতে মোঃ মহিদুজ্জামান মুন্নাকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃতদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ কারণে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলো জব্দ করা হয়েছে।

প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, গ্রেফতারকৃতরা অবৈধভাবে আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে একটি স্বচ্ছ, সুন্দর ও সুষ্ঠু পরীক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যাহত করার চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি তারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে নৈরাজ্য, হতাশা, উদ্বেগ ও নৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চালায়।

উক্ত ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে ডিএমপি রমনা মডেল থানায় একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, প্রতারক চক্র প্রশ্ন ফাঁসের জন্য অনৈতিক লেনদেন করলেও মূল প্রশ্নের সঙ্গে ওই প্রশ্নের মিল পাওয়া যায়নি।