প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করা জনজীবনে বৃষ্টির আগমন সাধারণত স্বস্তির বার্তা আনে। এখন সেই বৃষ্টি যেন উল্টো আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। তাপদাহের পর শুরু হওয়া ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে দেশজুড়ে বাড়ছে বজ্রপাতের তীব্রতা। তাতেই ঝরে যাচ্ছে প্রাণ। গতকাল শনিবার এক দিনেই দেশের ছয় জেলায় বজ্রাঘাতে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১২ জন। নিহতদের মধ্যে ৯ জনই কৃষক। যারা জীবিকার তাগিদে খোলা মাঠে ছিলেন, আর সেখানেই প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বজ্রপাত।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে সুনামগঞ্জে। জেলার চারটি উপজেলায় বজ্রপাতে পাঁচজন মারা গেছেন। দুপুরের দিকে হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রাঘাতে তাদের মৃত্যু হয়। হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এই সময়টা সবচেয়ে ব্যস্ত মৌসুম। আকাশে মেঘ জমলেও ফসল তোলার তাগিদে অনেকেই মাঠ ছাড়তে পারেন না। সেই ঝুঁকিই হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী। এ ছাড়া ময়মনসিংহ ও রংপুরে দুজন এবং নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জে একজন করে বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন।
বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে তালগাছ লাগানো, বজ্রনিরোধক ও লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপনসহ কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়। একে দুর্যোগও ঘোষণা করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বজ্রপাতে হতাহত কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুল প্রকল্প, বড় গাছ কাটা বন্ধ না হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সচেতনতা তৈরির চেষ্টা না থাকায় মৃত্যু রোধ হচ্ছে না।
একদিনে এত মৃত্যু
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে কাজ করার সময় বজ্রপাতে পাঁচজনের প্রাণ গেছে। এতে আহত হয়েছেন আরও চারজন। গতকাল শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় জামালগঞ্জের পাগনার হাওর, ধর্মপাশার টগার হাওর, দিরাইয়ের কালিয়াগোটা হাওর এবং তাহিরপুর উপজেলায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মতিউর রহমান।
নিহতরা হলেন– জামালগঞ্জ উপজেলা সদর ইউনিয়নের চাঁনপুর গ্রামের নুরুজ্জামান, ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরহাটি ইউনিয়নের বড়ইহাটি গ্রামের হাবিবুর রহমান, একই উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের সরস্বতীপুর গ্রামের জয়নাল হকের ছেলে রহমত উল্লাহ (২৩), দিরাই উপজেলার কৃষক লিটন মিয়া এবং তাহিরপুর উপজেলা সদর ইউনিয়নের গাজীপুর গ্রামের আবু বকরের ছেলে আবুল কালাম ওরফে কালা মিয়া (২৮)।
গতকাল দুপুর ২টার দিকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর ও গফরগাঁও উপজেলায় বাড়ি ফেরার পথে বজ্রপাতে দুজনের মৃত্যু হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। নিহতরা হলেন– গৌরীপুর উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের কোনাপাড়া গ্রামর ওলি মিয়ার ছেলে রহমত আলী উজ্জ্বল (৩০) এবং গফরগাঁও উপজেলার উস্থি ইউনিয়নের ধাইরগাঁও গ্রামের প্রয়াত সেকান্দর আলী খানের ছেলে মমতাজ আলী খান (৫৮)।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বড় হযরতপুর এলাকার সখিপুরে বজ্রপাতে দুই মৎস্যজীবীর মৃত্যু হয়েছে। এ সময় আহত হয়েছেন আরও অন্তত আটজন। নিহতরা হলেন– উপজেলার রামেশ্বরপাড়া গ্রামের মাঝিপাড়া এলাকার মিলন মিয়া (৩৫) ও সখিপুর গ্রামের আবু তালেব (৬৫)।
নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার সুখারী ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামের সামনের মেষির হাওরে বজ্রপাতে এক কৃষক মারা গেছেন। নিহত আলতু মিয়া (৬৫) একই গ্রামের মৃত লাল মিয়ার ছেলে।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বড় হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে এক শ্রমিক মারা গেছেন। নিহত হেলাল মিয়া (৩৮) উপজেলার কলাবাতা গ্রামের বাসিন্দা।
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় বড় ভাকৈর (পূর্ব) ইউনিয়নের বিবিয়ানা নদীর তীরবর্তী মমিনা হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। নিহত সুনাম উদ্দিন (৬০) উপজেলার রামপুর গ্রামের মৃত সুন্দর আলীর ছেলে।
১৫ বছরে ৪ হাজারের বেশি মৃত্যু
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১১ থেকে এ বছরের গতকাল শনিবার পর্যন্ত ১৫ বছরে বজ্রপাতে ৪ হাজার ৩৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বজ্রপাতে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সময় মে, জুন ও আগস্ট মাস। তখন আকাশে বজ্রমেঘের ঘনত্ব বেশি থাকে।
গত বছর প্রকাশিত বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ‘ব্রিজিং সায়েন্স উইথ কমিউনিটিজ: ডেভেলপিং আ কমিউনিটিবেজড লাইটনিং আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছর হাওরাঞ্চলের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের জানমাল বজ্রপাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ জরিপে অংশ নেওয়া হাওরবাসীর ৩২ শতাংশ জানিয়েছেন, সতর্কবার্তা পেলেও তারা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেন না।
গবেষণা অনুযায়ী, বজ্রপাতের সর্বোচ্চ ২৯ দশমিক ৬২ শতাংশ ঘটনা ঘটে মে মাসে। জুনে ঘটে ২৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং আগস্টে ২১ দশমিক ৪২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন কৃষক ও জেলে সম্প্রদায়, বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের মানুষ। বিদ্যুৎ ঝলকানির সময় প্রায় ২৭ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা তৈরি হয়, যা সূর্যের তাপের চেয়েও প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। এ সময় প্রায় ৩০ কোটি ভোল্ট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, যেখানে আমাদের ঘরবাড়িতে মাত্র ২২০ ভোল্ট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়।
গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, যারা বজ্রপাতের আগাম বার্তা পান, তাদের মধ্যে সাড়ে ৭ শতাংশ মানুষ বার্তা অগ্রাহ্য করেন। সাড়ে ৫ শতাংশ মানুষ সতর্কতার পরও হাওরে কাজ চালিয়ে যান। ১১ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দেরিতে বার্তা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, সতর্কবার্তার পর তারা ১০ থেকে ৩০ মিনিট সময় পান নিরাপদে আশ্রয়ে যেতে। প্রতিবছর হাওরাঞ্চলের ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ বজ্রাঘাতে হতাহত হন। ১৭ দশমিক ১ শতাংশ ক্ষেত্রে মাঠের ফসল নষ্ট হয় বা গবাদি পশু মারা যায়।
কেন বাড়ছে বজ্রপাত?
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, পরিবেশগত পরিবর্তন বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। নদী শুকিয়ে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট, বায়ুদূষণ এবং গাছপালা ধ্বংসের কারণে দেশের তাপমাত্রা ১ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে। এর ফলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ু এবং উত্তরে হিমালয় থেকে আসা শুষ্ক বায়ুর সংঘর্ষে তৈরি হচ্ছে বজ্রমেঘ। এই সংঘর্ষ যত তীব্র হচ্ছে, বজ্রপাতের ঘটনাও তত বাড়ছে। আরেকটি বড় কারণ– গাছপালা কমে যাওয়া। আগে মাঠের পাশে তাল, বাবলা, রেইনট্রি গাছ থাকত, যা বজ্রপাতের আঘাত নিজের দিকে টেনে নিত। এখন খোলা মাঠে মানুষ ও গবাদিপশুই সবচেয়ে উঁচু বস্তু হয়ে দাঁড়াচ্ছে–ফলে বজ্রপাত সরাসরি তাদের ওপর আঘাত করছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মালিক বলেন, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিয়ে আসছে। ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা আগের পূর্বাভাসের পাশাপাশি নদীবন্দরগুলোর জন্য নিয়মিত সতর্কবার্তা প্রদান করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ২ থেকে ৪ ঘণ্টা আগে ‘নাউকাস্টিং’ প্রযুক্তির মাধ্যমে বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা প্রদান শুরু হয়েছে, যেখানে স্যাটেলাইট তথ্য ও গ্লোবাল লাইটনিং ডিটেকশন সিস্টেম ব্যবহৃত হচ্ছে। তবু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। কারণ, সতর্কবার্তা থাকলেও তা সব সময় মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছায় না বা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না।
প্রকল্প থাকলেও ফল নেই
২০১৬ সালে বজ্রপাতকে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশে বিগত সরকারের সময়ে বজ্রপাত নিরোধে সারাদেশে ৪০ লাখ তালগাছ লাগানোর প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। তা ব্যর্থ হয়েছে। এরপর স্বল্প পরিসরে লাইটনিং অ্যারেস্টার লাগানো হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবে তেমন কার্যকর হয়নি। তালগাছ লাগানোর প্রকল্পের বড় অংশই রাস্তার পাশে সীমাবদ্ধ ছিল, মাঠ বা হাওরাঞ্চলে নয়–যেখানে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে অনেক স্থানে বসানো লাইটনিং অ্যারেস্টারও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকেজো হয়ে পড়েছে।
স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টোর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের (এসএসটিএএফ) সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা বলেন, শুধু সচেতনতার অভাবে অনেক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো কার্যকরী সচেতনতামূলক কার্যক্রম চোখে পড়ছে না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে বজ্রপাতের পূর্বাভাস সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মোবাইল অপারেটর ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এ তথ্য প্রচার করা হবে। পাশাপাশি সারাদেশে লাইটনিং অ্যারেস্টার বসানোর প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে, যা রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে কার্যকর রাখা হবে। মন্ত্রণালয় ও উন্নয়ন সহযোগীরাও এ উদ্যোগে যুক্ত আছেন