Image description

ভাটায় শুকিয়ে গেছে খাল, জোয়ারেও আসে না পর্যাপ্ত পানি। চিকন নালায় জমে থাকা কাদা-মিশ্রিত পানি হাত দিয়ে তুলে কলসিতে ভরছে শিশু লামিয়া ও মর্জিনা। সেই নোনা, অপরিচ্ছন্ন পানিই তাদের পরিবারের রান্না, খাওয়া ও ধোয়ামোছার একমাত্র ভরসা। চারদিকে তেঁতুলিয়া নদীর অবারিত জলরাশি—তবু বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার, এ যেন নির্মম বৈপরীত্য।

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের ১৭টি ছোট-বড় বিচ্ছিন্ন চর—বাসুদেবপাশা, চরমিয়াজান, চররায়সাহেব, চরনিমদী, চরওয়াডেল, চরআলগী, চরডিয়ারা, কচুয়া, অমরখালীসহ চরাঞ্চলে বসবাসকারী হাজারো মানুষের নিত্যদিনের চিত্র এটি। ফিটকিরি দিয়ে পানি শোধন, টিউবওয়েলে পানি ঢেলে পানি তোলা, নোনা পানিতে রান্না—এসবই তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, চৈত্রের আগ থেকেই শুরু হয় তীব্র পানির সংকট। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, নদী-খাল ভরাট, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, অতি খরা, নদীভাঙন, অপরিকল্পিত স্লুইসগেট নির্মাণ, ড্রেজিংয়ের নামে অনিয়ম, তরমুজ চাষে মাত্রাতিরিক্ত রাসয়নিকের ব্যবহার এবং প্রশাসনের উদাসীনতায় পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে। দুই শতাধিক নদী-খাল থাকা সত্ত্বেও নিরাপদ পানির কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। বহু বছর আগে ওয়াটার অ্যান্ড সেনিটেশন নিয়ে এসব চরভূমে কাজ করা উন্নয়ন সংস্থাগুলো নিয়েছে হাত গুটিয়ে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উত্তর রায়সাহেব চরের আশ্রয়ণ প্রকল্প ও বেড়িবাঁধ এলাকায় বসবাসকারী বহু পরিবার অগভীর কুয়ার পানি ব্যবহার করছে। স্থানীয় বাসিন্দা রীনা বেগম জানান, তারা খালের পানি ফিটকিরি দিয়ে শোধন করে পান করছেন। চর নিমদীর নুরজাহানও একইভাবে পানি সংগ্রহ করেন। চরমিয়াজান স্কুলের টিউবওয়েল থেকে পানি তুলতে গিয়ে প্রতিদিন লড়াই করতে হয় মোমেলা বেগম, ফজিলা ও নূরভানুদের—কারণ টিউবওয়েলের হেড নষ্ট, হাতল চাপতে হয় বারবার।

উত্তর রায়সাহেব চরের আশ্রয়ণ প্রকল্পে ১২০ পরিবারের মধ্যে মাত্র ৫০টি পরিবার নিয়মিত বসবাস করলেও পাঁচটি টিউবওয়েলের মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র একটি। সেটি থেকেও পানি তুলতে হলে আগে মগভর্তি পানি ঢেলে জোরে হাতল চাপতে হয়।

ডিয়ারা কচুয়া চরের মমতাজ, নুরুন নাহার ও লাকি আক্তারদের দেখা গেছে, অগভীর ডোবা থেকে নোনা পানি সংগ্রহ করতে। বহু বছর আগে স্থাপিত টিউবওয়েল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন তারা বাধ্য হয়ে ওই পানি ব্যবহার করছেন। একই চিত্র চরআলগী, চরওয়াডেল ও অমরখালীতেও।

চরআলগী চরে কোনো টিউবওয়েল নেই। ফলে জিদনী ও তার ভাই রবিউল কিংবা শিশু সোহাগ ও নাজিমের মতো অনেককে নৌকায় করে তেঁতুলিয়া নদী পাড়ি দিয়ে অন্য চর থেকে পানি আনতে হয়। ঝুঁকি নিয়েই পানির জন্য পানিতে ভাসতে হয় তাদের।

বর্ষাকালেও দুর্ভোগ কমে না। পূর্ণিমা-অমাবস্যার জোয়ার কিংবা নিম্নচাপের সময় চরাঞ্চল প্লাবিত হলে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় নৌকা বা কলার ভেলায় করে পানি আনতে হয়।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, চর ওয়াডেল, চরডিয়ারা কচুয়া, অমরখালীসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্ধশতাধিক টিউবওয়েল দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে বিলীন হয়েছে আরও কয়েকটি। সিডরের পর স্থাপিত অনেক টিউবওয়েল নিম্নমানের হওয়ায় দ্রুত নষ্ট হয়ে গেছে।

বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। উন্নয়ন সংস্থা স্পিড ট্রাস্ট, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং স্লোব বাংলাদেশের ওয়াটার ও স্যানিটেশন কার্যক্রম বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, সরকারি বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, নতুন টিউবওয়েল স্থাপন ও অকেজোগুলো দ্রুত সংস্কার না করলে এ সংকট আরও তীব্র হবে। বর্তমানে চরাঞ্চলে সচল টিউবওয়েলের সংখ্যা মাত্র ১৫ থেকে ২০টি অথচ বসবাস করছে লক্ষাধিক মানুষ।

চন্দ্রদ্বীপের রায়সাহেব চর এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য আ. ছালাম শরীফ বলেন, চরের টিউবওয়েলের অধিকাংশই অকেজো। ভরাট হওয়ায় খরার মৌসুমে জোয়ারেও খালে পানি আসে না। যতটুকু আসে, তাতে ভাসে তরমুজ চাষিদের ব্যবহৃত কীটনাশকের কৌটা, ফয়েলসহ মৃত নানা সব জীবজন্তু।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপজেলা কার্যালয়ে স্থাপিত কালো বোর্ডে প্রতিটি নলকূপ/পানির উৎসের সহায়ক চাঁদার পরিমাণ উল্লেখ করা থাকলেও সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো টিউবওয়েলের নাগাল পায় না চরবাসী। তারা অতিরিক্ত টিউবওয়েল বরাদ্দের দাবি তুললেও তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেনি কোনো সংস্থা।

স্যানিটেশন অ্যান্ড হাইজিং নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করা স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা স্লোব বাংলাদেশ ওয়ার্টসন প্রকল্পের সাবেক ব্যবস্থাপক সোনালী সকাল সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডের বাউফল প্রতিনিধি মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘চরে নিত্য আয়ের মানুষের পক্ষে খরচ মিটিয়ে বেসরকারিভাবে টিউবওয়েল বসানো প্রায় অসম্ভব। দুর্গম হওয়ায় স্যানিটেশন নিয়ে চর এলাকায় কোনো উন্নয়ন সংস্থা কাজ করতে চায় না। চরবাসী জোয়ারের পানি, কুয়ার পানি, বৃষ্টির পানির ওপর ভরসা আর আল্লাহর কৃপায় বাঁচে। এ সময় বিশুদ্ধ পানির অভাবে তাদের ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়।’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করতে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. মাকসুদুর রহমানের কার্যালয়ে একাধিকবার গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। অনেকদিন থেকে বন্ধ রয়েছে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন। একপর্যায়ে কার্যালয়ের মেকানিক মো. রুবেলের মোবাইল ফোনে কল করে প্রকৌশলী মাকসুদুর রহমানের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়। তিনি চরাঞ্চলের মানুষের বিশুদ্ধ পানির সংকট, পরিত্রাণের উপায়, জনসংখ্যার হারে টিউবওয়েলের চাহিদা কিংবা অকেজো টিউবওয়েলগুলো সংস্কারের বিষয়ে তেমন কিছু না জানিয়ে উপজেলার চরাঞ্চলে আগের বছর মোট ২৬টি টিউবওয়েল দেওয়া হয়েছে এবং সমস্যা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন বলে তড়িঘড়ি করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহম্মেদ বলেন, তিনি নিজেও চর এলাকায় গিয়ে পানির কষ্ট দেখেছেন। দ্রুত অকেজো টিউবওয়েল সংস্কার ও নতুন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।