Image description

তাদের কারও বয়স ৪০ পার হয়েছে, কারও এর চেয়েও বেশি। তবে দীর্ঘ বছরের দাবি আর আইনি লড়াইয়ের পর এই বয়সেই তারা বসছেন পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) হওয়ার প্রশিক্ষণে। আগামী সোমবার থেকে রাজশাহীর সারদায় পুলিশ একাডেমিতে ছয় মাসের মৌলিক প্রশিক্ষণ শুরু হচ্ছে ২০০৬ সালে এসআই পদে চূড়ান্ত নিয়োগ বাতিল হওয়া ১৮৪ জনের। তাদের মধ্যে ছয়জন নারী প্রশিক্ষণার্থী এসআই রয়েছেন।

২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন তৎকালীন জোট সরকারের আমলের শেষের দিকে ৫৩৬ জন ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই-নিরস্ত্র) ও ২২১ জন সার্জেন্ট নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়। তবে তাদের প্রশিক্ষণ শুরুর আগেই সরকার পরিবর্তন হলে তাদের নিয়োগ কার্যক্রম থেমে যায়। ২০০৭ সালে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে ‘দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের’ অভিযোগ তুলে সেসব নিয়োগ বাতিল করে দেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারও সেই নিয়োগ কার্যক্রম বাতিল রাখে। তবে বর্তমান সরকার গত মাসে বঞ্চিত এসব এসআই ও সার্জেন্টের নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের মধ্য থেকে ১২৩ জন পুলিশ সার্জেন্ট ও ২০৭ জন এসআইকে শর্তসাপেক্ষে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড ক্যারিয়ার প্ল্যানিং-২ শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) আফরিদা রুবাই গতকাল শনিবার কালবেলাকে বলেন, ২০০৬ সালে নিয়োগ বঞ্চিত ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টরদের (নিরস্ত্র) রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে ছয় নারীসহ ১৮৪ জনকে ছয় মাসের মৌলিক প্রশিক্ষণের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। ২০ এপ্রিল (সোমবার) থেকে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে তাদের প্রশিক্ষণ শুরু হবে।

তিনি জানান, নিয়োগ বঞ্চিত সার্জেন্টদেরও স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষ হয়েছে। উত্তীর্ণদের তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর আগামী ২৫ এপ্রিল থেকে তাদেরও ছয় মাসের মৌলিক প্রশিক্ষণ শুরু হবে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, মনোনীত ১৮৪ প্রার্থীকে ২০ এপ্রিল থেকে ছয় মাস মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সারদায় পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপালকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ওই নির্দেশনায় বলা হয়, ১৮৪ জনকে সারদায় পুলিশ একাডেমিতে ছয় মাস মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করার পর বিধি অনুযায়ী এক বছর ছয় মাসের জন্য শিক্ষানবিশ ঘোষণা করে এক বছরের বাস্তব প্রশিক্ষণের জন্য পদায়ন করতে হবে। পদায়ন করা জেলা/ইউনিট বিভিন্ন অফিসে এক বছরের বাস্তব প্রশিক্ষণকাল সফলভাবে সম্পন্ন করতে হবে। বাস্তব প্রশিক্ষণ শেষে পরবর্তী ছয় মাস চাকরিকাল সফলভাবে শেষে প্রযোজ্য অন্যান্য শর্তাবলি প্রতিপালন সাপেক্ষে শিক্ষানবিশ ঘোষণার তারিখ থেকে চাকরি স্থায়ীকরণ করতে হবে।

এতে আরও বলা হয়, প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত প্রার্থীদের কেউ নির্ধারিত তারিখে ছয় মাস মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য পুলিশ একাডেমিতে উপস্থিত না হলে তিনি চাকরি করতে ইচ্ছুক নন বলে বিবেচিত হবেন। এ ক্ষেত্রে পরে তার প্রশিক্ষণ গ্রহণ বা চাকরিতে প্রবেশের কোনো সুযোগ থাকবে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠিতে বলা হয়, শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ অন্যান্য বিষয়ে প্রার্থীর দেওয়া তথ্য সম্পর্কে অনুসন্ধান বা তদন্তে কিংবা পরে কোনো বিরূপ প্রতিবেদন পাওয়া গেলে অথবা প্রদত্ত কোনো তথ্যাদি প্রশিক্ষণকালীন কিংবা পরবর্তীকালে মিথ্যা প্রমাণিত হলে উক্ত প্রার্থীকে প্রশিক্ষণ অব্যাহতি/চাকরিচ্যুতি/বরখাস্তসহ প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানের বয়স প্রমার্জনের ক্ষেত্রে প্রমাণক হিসেবে দাখিল করা লাল মুক্তিবার্তা বা ভারতীয় তালিকা অথবা গেজেট ইত্যাদি দলিলাদি একবার জাল বা ভুয়া প্রমাণিত হলে তা পুনর্যাচাইয়েরও কোনো সুযোগ থাকবে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ২০০৭ সালে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি বাতিল না হলে আবেদনকারীরা স্বাভাবিক নিয়মে যে তারিখে সরকারি চাকরিতে যোগদান করতেন, সেই তারিখ থেকে তাদের ভূতাপেক্ষ জ্যেষ্ঠতা (আর্থিক সুবিধা ব্যতীত) নির্ধারণ করার নির্দেশনা রয়েছে। তবে তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুলিশের নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতি পরীক্ষায় পাসসহ অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।

পুলিশ সূত্র জানায়, এসআই ও সার্জেন্ট নিয়োগে সাধারণত আবেদনকারীর বয়স সর্বোচ্চ ২৫ বছর নির্ধারিত থাকে। সে অনুযায়ী মৌলিক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ১৮৪ জনের মধ্যে অনেকের বয়স ৪০ বছরের বেশি পার হয়ে গেছে। তারা ২০০৬ সালে চূড়ান্ত নিয়োগের সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর নিয়োগ বঞ্চিত হয়ে ২০ বছর পার করেছেন। সেক্ষেত্রে তারা প্রশিক্ষণ শেষে চাকরিতে যোগ দিলেও ১৩ থেকে ১৪ বছরের মতো সার্ভিসে থাকতে পারবেন।

২০০৭ সালে নিয়োগ বাতিল হওয়া এই এসআইদের জীবিকা নির্বাহে নানা পেশাতেও যুক্ত ছিলেন। গত বছরের নভেম্বরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, দীর্ঘ বছর ধরে চাকরি ফেরত না পেয়ে তারা নানা পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছেন। এমনকি কেউ কেউ সংসার চালাতে রাইড শেয়ারিংয়ের মতো খণ্ডকালীন পেশাও বেছে নিয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, মৌলিক প্রশিক্ষণের জন্য ডাক পাওয়া ১৮৪ জনের মধ্যে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ঢাকা জেলা থেকে আটজন, গাজীপুর থেকে চার, টাঙ্গাইলে চার, নরসিংদী থেকে পাঁচ, টাঙ্গাইলে চার ও শরীয়তপুর জেলার চারজন, মাদারীপুর থেকে পাঁচ, মুন্সীগঞ্জ জেলা থেকে চার, গোপালগঞ্জ জেলার দুই, রাজবাড়ী জেলার চার ও ফরিদপুর জেলা থেকে দুজনসহ এ রেঞ্জে মোট ৪২ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। ময়মনসিংহ রেঞ্জে সুপারিশপ্রাপ্ত ৩৩ জনের মধ্যে নেত্রকোনা জেলায় ১৩ জন, জামালপুরে চার ও ময়মনসিংহ জেলায় ১৬ জন রয়েছেন।

চট্টগ্রাম রেঞ্জে সুপারিশপ্রাপ্ত ২৪ জনের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় আটজন, ফেনীতে তিন, কুমিল্লায় ছয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় দুই, নোয়াখালী থেকে দুই, চাঁদপুর থেকে দুই ও কক্সবাজার জেলার একজন রয়েছেন।

রাজশাহী রেঞ্জে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৬ জনের মধ্যে সিরাজগঞ্জে চার, পাবনা জেলায় দুই, বগুড়ায় তিন, রাজশাহীতে দুই, নাটোরে তিন এবং জয়পুরহাটি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে একজন করে রয়েছেন।

খুলনা রেঞ্জের সুপারিশপ্রাপ্ত ২৭ জনের মধ্যে সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও যশোর জেলার চারজন করে, খুলনায় আট, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরায় একজন করে এবং নড়াইল ও বাগেরহাটে দুজন করে রয়েছেন। বরিশাল রেঞ্জের সুপারিশ পাওয়া ২৩ জনের মধ্যে পটুয়াখালী জেলার ছয়জন, বরিশাল জেলার ছয়, ভোলা জেলার পাঁচ, বরগুনা জেলায় তিন, ঝালকাঠিতে দুই ও পিরোজপুরে একজন রয়েছেন। এ ছাড়া সিলেট রেঞ্জে হবিগঞ্জে একজন ও সুনামগঞ্জে দুজন রয়েছেন।

এদিকে রংপুর রেঞ্জে মৌলিক প্রশিক্ষণের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত ১৬ জনের মধ্যে গাইবান্ধায় পাঁচজন, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী জেলায় একজন করে, রংপুরে পাঁচ ও কুড়িগ্রাম জেলায় দুজন রয়েছেন।

ওই সময়ে নিয়োগ বাতিল হওয়া এসআই-সার্জেন্টদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০৭ সালে কোনো ধরনের নোটিশ বা প্রজ্ঞাপন ছাড়া শুধু একটি সাদা কাগজে নোটের মাধ্যমে দলীয় ট্যাগে ঢালাওভাবে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া অবৈধভাবে বাতিল ঘোষণা করে ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাদের অবৈধভাবে নিয়োগ বঞ্চিত করার পর তারা আদালতে যান এবং নানাভাবে নিয়োগের দাবি তুলতে থাকেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তারা বঞ্চিতই থাকেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তারা ফের নিয়োগের দাবি তোলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিয়োগ বঞ্চিতরা তাদের নিয়োগ পুনর্বহালের জন্য ৩৩০ জনের একটি তালিকা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দপ্তরে জমা দিয়ে আবেদন করেন। তাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সুপারিশও ছিল। পরে বিষয়টি দেখার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উচ্চপর্যায়ের ছয় সদস্যের কমিটি করে ফখরুদ্দীনের আমলে সাদা কাগজের বাতিল আদেশটি বাতিল করে ২০০৬ সালের নিয়োগ পুনর্বহালের সুপারিশ করে। গত বছর আইন মন্ত্রণালয় হয়ে সেই সুপারিশের সারসংক্ষেপ তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে পাঠানো হয়। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাতে স্বাক্ষর করেননি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের নিয়োগের বিষয়টি সুরাহা করতে উদ্যোগী হয়।