মাহফুজুর রহমান। একজন তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারী। তবে দুর্নীতির বেলায় তাঁর নামের পাশে আছে চ্যাম্পিয়ন খেতাব। কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে আছে দুদকের মামলা।
শুরুর দিকে কালের কণ্ঠের হাতে আসে, দুদকের সমন্বিত কার্যালয় চট্টগ্রাম-১ কর্তৃক দায়ের করা একটি মামলা। যাতে সরকারের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর বিরুদ্ধে আনা হয় নিজের স্ত্রীর নামে কোটি টাকারও বেশি আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ।
মাহফুজুরের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ : চট্টগ্রাম জেলার নানুপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সহকারী মাহফুজুর রহমান। ১৬তম গ্রেডের এই কর্মচারী সরকারি চাকরির বেতন কাঠামো ৯ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২২ হাজার টাকা। ২০২১ সালের দিকে হঠাৎ তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে নিজের স্ত্রীর নামে আয়বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জন, দপ্তরে ভুয়া দলিল সৃজন, দাগ পরিবর্তন ও নানা অনিয়মের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগ।
ওই সময় চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে দেওয়া ওই তদন্ত প্রতিবেদনে ভুয়া দলিল সৃজন, দাগ পরিবর্তন ও সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত কর্মকর্তার দৃষ্টিগোচর হয়নি বলে উল্লেখ করেন। তবে প্রতিবেদনের একটি অংশে অভিযুক্ত মাহফুজুর রহমান চট্টগ্রামের চান্দগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ১২৪৬/১৬ ও ১৭৭৪/১৬ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তাঁর স্ত্রী দিলুয়ারা মাহফুজের নামে কোটি টাকারও বেশি অর্থের জমি ক্রয়ের সত্যতার কথা উল্লেখ করা হয়।
শাস্তির আওতায় মাহফুজুর : অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের পর সরকারের নিবন্ধন অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিদর্শক শহীদুল আলম ঝিনুক চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রারকে অভিযুক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এবার শাস্তির বদলে পুরস্কার : দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও কিভাবে একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী এখনো বহাল আছেন কাজে—এমন অনুসন্ধানে নামে কালের কণ্ঠ। এবার বের হয়ে আসে নেপথ্যে থাকা মাহফুজুরের শক্তির উৎস।
অনুসন্ধানে পাওয়া মাহফুজুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি আত্মপক্ষ সমর্থনের চিঠিতে মেলে এক গোপন তথ্য। মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত চলাকালে তদন্ত কর্মকর্তা বরাবরে দেওয়া ওই চিঠিতে মাহফুজুর একটি অংশে নিজেকে আওয়ামী পরিবারের সন্তান এবং নিজের বাবাকে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের সৈনিক দাবি করে বলেন, ‘আমি আওয়ামী পরিবারের সন্তান।’
ঘটনার এখানেই শেষ নয়, ২০২৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শুধু আওয়ামী পরিবারের সন্তান হিসেবে বিভাগীয় মামলার চূড়ান্ত তদন্তে মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ প্রত্যাহার করে তাঁর সাময়িক শাস্তি মওকুফ করা হয়। এরপর চূড়ান্তভাবে ফিরিয়ে দেওয়া হয় চাকরি।
এবার মাহফুজ মস্ত বড় বিএনপি : অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ সচিবের কাছে মাহফুজুর রহমান দেন একটি দীর্ঘ চিঠি। যাতে তিনি নিজেকে এবার বিএনপি পরিবারের সন্তান প্রমাণে চালান প্রাণান্ত চেষ্টা। আর তাঁর এই চিঠিতে সুপারিশ করেন বিএনপির একাধিক নেতা। যার বদলে সরকারের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মাহফুজুরের অবস্থান আরো পাকাপোক্ত হয়। জানা গেছে, সম্প্রতি তাঁকে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলা থেকে চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদায়ন করা হয়।
চলমান আছে দুদকের মামলা : ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর নিজের স্ত্রীর নামে কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে পাওয়া অভিযোগের প্রেক্ষিতে মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১-এর উপসহকারী পরিচালক মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী। আর এই মামলায় মাহফুজুর রহমানের স্ত্রী দিলুয়ারা মাহফুজকে করা হয় প্রধান আসামি। তাঁদের উভয়ের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায়।
দুদকের দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়, মাহফুজ দম্পতির এক কোটি সাত লাখ দুই হাজার ৭৪৬ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া তাঁরা উভয়ে দুদকে দেওয়া নিজেদের সম্পদ বিবরণীতে তিন লাখ ৭৯ হাজার ২১ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। যার দরুন দুদক আইনের ২৬(২), ২৭(১) এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় মহফুজ এবং তাঁর স্ত্রী দিলুয়ারা মাহফুজের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
সটকে পড়েন মাহফুজ : এদিকে গত ৬ এপ্রিল সদ্য পদায়ন হওয়া চট্টগ্রাম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অফিস সহকারী মাহফুজুর রহমানের বক্তব্য পেতে কালের কণ্ঠ টিম তাঁর দপ্তরে গেলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর হঠাৎ তিনি সটকে পড়েন। পরে তাঁর বক্তব্য পেতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাইরে গিয়ে কথা বলার অনুরোধ করেন। এ সময় তিনি ফোনে মন্তব্য করেন, ‘ভাইকে কি আর ফেলে দিতে পারবেন?’
জেলা রেজিস্ট্রার যা বললেন : মাহফুজুর রহমানের পদোন্নতিজনিত বদলি বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার খন্দকার জামিলুর রহমানের শরণাপন্ন হলে তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, ২০২২ সালে সাময়িক বহিষ্কারের পর ২০২৩ সালে বিভাগীয় মামলার তদন্তে মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁর চাকরির সাময়িক বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
সম্প্রতি জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে মাহফুজুর রহমানকে চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদোন্নতিজনিত বদলির বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার বলেন, ‘চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর। এখানে একজন সিনিয়র সহকারী দরকার। যার কারণে তাঁকে সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়ন করা হয়েছে।’
দুদকের মামলা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খন্দকার জামিলুর রহমান বলেন, ‘দুদকের পক্ষ এ ধরনের কোনো তথ্য চট্টগ্রাম রেজিস্টার কার্যালয়ে সরবরাহ করা হয়নি। তবে দুদুক তাঁর বেতন ও সুযোগ সুবিধা বিষয়ে তথ্য জানতে চেয়েছিল।’
সুজনের মতামত : সরকারি চাকরিতে থেকে অনিয়ম-দুর্নীতি করার পর দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা, অভ্যন্তরীণ তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও একজন সরকারি চাকরিজীবীকে স্বপদে বহাল রেখে আবার পদোন্নতি দেওয়ার মতো ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনায় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতি করার ক্ষেত্রে উৎসাহিত হন। এ সময় বিজ্ঞ এই আইনজীবী বলেন, ‘শুধু তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী নন, সরকারি যেকোনো কর্মচারী বা কর্মকর্তা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হলে কিংবা আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করলে এটি রাষ্ট্রের সংবিধানেও আছে, আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করলেই এটা দুর্নীতি।’
আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘একজন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারী যখন চিহ্নিত হবেন কিংবা মামলার আসামি হবেন, তখন তাঁর প্রমোশন দেওয়া কিংবা প্রমোশনমূলক কোনো বদলি বা পদায়নের সুযোগ নেই।’