প্রায় সাত একর জমির ওপর বরিশাল নগরীর রূপাতলীতে বরিশাল সিটি করপোরেশনের ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। এটির কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে প্লান্ট প্রাঙ্গণে ঢোকার পথেই গত বুধবার দেখা যায় দুপুরে চারজন প্রহরী সার্বক্ষণিক পাহারায় রয়েছেন। প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ভেতরে ঢুকে মূল ফটক পেরোতেই দেখা গেল ছাগলের খামারে আছে ১৫টি ছাগল।
তার পাশেই ভেড়ার খামারে উন্নত প্রজাতির ১০টি ভেড়া চলাচল করছে। পেছনে গিয়ে দেখা গেছে, একটি গরু ও তা লালন-পালনের সব সরঞ্জাম। আর এসব পশু পালনে ব্যস্ত বরিশাল সিটি করপোরেশনের আটজন কর্মচারী। আর এসব ভেড়া, ছাগল ও গরুর মালিক বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী।
সিটি করপোরেশনের প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের সব কাজ বাদ দিয়ে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পশু পালনে শশব্যস্ত সময় পার করছেন।
বরিশাল সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর রূপাতলীতে সাত একর জমির ওপর ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের কাজ শুরু করে। ২০১৬ সালে অধিদপ্তর সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করতে চাইলেও কাজ অসম্পূর্ণ বলে তা গ্রহণ করা হয়নি। ২০২০ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সিটি করপোরেশন এটি বুঝে নেয়।
কিন্তু কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় তা আর সচল করা হয়নি। ২০২৫ সালে আরো তিন কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয় এটির সংস্কারের জন্য। কাজ পায় গ্রিন ডট লিমিটেড। চলতি মাসে সংস্কারকাজ শেষ করে এটি উদ্বোধনের কথা রয়েছে। গত ছয় মাস আগে এটির ভেতরে গরু, ভেড়া ও ছাগলের খামার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন এই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
খামারের ছাগল, ভেড়া ও গরু কেনার ব্যয়ভার বহন করেছে গ্রিন ডট লিমিটেড কম্পানি। যদিও বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী। তিনি বলেন, আমার ১০টি ছাগল ও ১০টি ভেড়া ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের ভেতরে রয়েছে। এগুলো আমি নিজের টাকায় কিনেছি। এখানে আমার জন্য বাংলো হওয়ার কথা রয়েছে। তাই সেখানে এরই মধ্যে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ শুরু করা হয়েছে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চাইলে তাঁর বাংলোতে ছাগল, ভেড়া ও গরু পালন করতে পারেন। তাই আমিও করছি।’ গরুর খামারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলো তিনি বলেন, ‘খামারের কাজ চলছে। এখন গরু নেই। শিগগিরই সেখানে গরুও আনা হবে।’ খামার দুটি তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরিশাল সিটি করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা জানান, এখানে তিনটি খামার করতে আট লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ছয় লাখ টাকায় কেনা গরু, ছাগল ও ভেড়া রয়েছে। ২০ শতক জমিতে ঘাস চাষ করা হয়েছে লাখ টাকা ব্যয় করে। বৃক্ষরোপণের সঙ্গে ঘাস চাষের ব্যয় সিটি করপোরেশন থেকে দেখানো হলেও খামার ও পশুর ক্রয় অর্থ ঠিকাদারের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ইউসুফ আলী বলেন, স্বাভাবিকভাবে প্লান্টে পরিচ্ছন্নতাকর্মী দেওয়া হয় না। যখন পরিষ্কার করার প্রয়োজন হয় তখন দুইজন কর্মী গিয়ে পরিষ্কার করে আবার চলে আসেন। কিন্তু ছয় মাস আগে রূপাতলী ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে দুজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সেখানে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার ছাগল ও ভেড়া দেখাশোনা করেন এবং তার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
সিটি করপোরেশনের প্রহরী মেহেদী হাসান বলেন, ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যার তাঁর ১২টি ছাগল পালনের দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন। সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত এগুলো মাঠে চড়ানোর দায়িত্ব আমার। এরপর আমি খামারের ভেতর পশুগুলো রেখে বিশ্রামে যাই। রাতে দায়িত্ব পালন করেন ইব্রাহিম।’ জানা গেল, এই ইব্রাহিম সিটি করপোরেশনের প্রহরী। ইব্রাহীম বলেন, ‘রাতের বেলা ছাগলগুলোকে খাবার খাওয়ানোর দায়িত্ব আমার।’ প্রহরীর দায়িত্ব পালন বাদ দিয়ে তিনি এ কাজ কেন করেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্যারেরা যা বলবেন সেটাই আমাদের করতে হয়। না হলে চাকরি থাকবে না।’ অন্য পরিছন্নতাকর্মী কাওছার দুম্বা দেখাশোনার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। দুম্বা ও ছাগল ময়লা ত্যাগ করলে তা তিনি পরিষ্কার করেন। একই সঙ্গে এই প্রাণীগুলোর খাবার দেওয়ার দায়িত্বও তাঁর। বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা শাখার আরেক কর্মী আশিকুর রহমান ঘাস চাষ করেন। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের ভেতরে ছাগল ও ভেড়া পালন করছেন বিষয়টি সত্যি। আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছি এবং এর সত্যতাও পেয়েছি। তবে এর তহবিল কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে সে বিষয়টি আমার জানা নেই। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্রিন ডট লিমিটেডের ঠিকাদার রুবেল মেজবাহকে বারবার মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।