Image description

চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’ খ্যাত সিআরবি (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং) এলাকায় আবারও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রবিবার (১৯ এপ্রিল) বিকালে প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শনে আসছেন রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একই স্থানে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে ব্যাপক জনরোষ ও আন্দোলনের মুখে তা স্থগিত করা হয়েছিল। তবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মাথায় আবারও এই প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন মহলে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। 

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে সিআরবিতে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও ১০০ আসনের মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ২০২০ সালের ১৮ মার্চ ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে এ লক্ষ্যে চুক্তি করে রেলওয়ে। চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যমান রেলওয়ে হাসপাতালকে আধুনিকায়ন করে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা, পাশাপাশি ১০০ আসনের মেডিক্যাল কলেজ ও ৫০ আসনের নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। 

তৎকালীন সময়ে এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের সামাজিক, পরিবেশবাদী ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো একাট্টা হয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ফলে সরকার পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছিল। 

ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান অপিনিয়নের (ইকো) গবেষণায় দেখা গেছে, সিআরবিতে ২২৩ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে— যার মধ্যে ১৮৩টি ঔষধি, গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ ৩৪ প্রজাতির, লতাজাতীয় উদ্ভিদ ৩৪ প্রজাতির। এছাড়া এখানে বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ৯টি ও ৮৮টি বৃক্ষ রয়েছে। শতবর্ষী গর্জন ও শিরীষ গাছের সমারোহ থাকায় একে নগরের ‘ফুসফুস’ বলা হয়।

২০০৮ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) সিআরবিকে ‘কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ড্যাপের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এই অঞ্চলের কোনও অংশ ব্যবহার করা যাবে না এবং কোনও বহুতল ভবন নির্মাণ করা যাবে না। শুধু পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পাখির অভয়ারণ্য, জাদুঘর, প্রজাপতি উদ্যান প্রতিষ্ঠা করা যাবে। 

সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্প স্থায়ীভাবে বাতিলের দাবি জানিয়ে গত শনিবার সন্ধ্যায় যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আবুল মোমেন, অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ ছাড়াও চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য মোজাম্মেল হক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বোর্ড সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদ জেরিনা হোসেন, প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সিআরবি রক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান, সুশাসনের জন্য নাগরিক চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবীর চৌধুরী, প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার, কবি ও সাংবাদিক রাশেদ রউফ ও ওমর কায়সার, চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও বেলা নেটওয়ার্ক সদস্য আলীউর রহমান, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির চট্টগ্রাম সমন্বয়ক মনিরা পারভীন, পরিবেশ সংগঠন গ্রিন ফিঙ্গার্সের প্রতিষ্ঠাতা আবু সুফিয়ান ও রিতু পারভী। তারা এই উদ্যোগ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে এই প্রকল্প স্থায়ীভাবে বাতিল করার দাবি জানান তারা। 

মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সিডিএর মাস্টার প্ল্যান অমান্য করে এখানে কোনও স্থাপনা নির্মাণ করা হলে তারা আইনি পদক্ষেপ নেবে। সংগঠনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান জানান, পরিবেশবিরোধী যেকোনও উদ্যোগ তারা রাজপথ ও আদালত— উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিহত করবেন। 

চট্টগ্রামের প্রাণপ্রকৃতি রক্ষার দাবিতে সরব পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছে। শনিবার বাপা’র চট্টগ্রাম সভাপতি প্রফেসর মু. সিকান্দর খানের সভাপতিত্বে এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেন, সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ। বিগত সরকারের সময় দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের আন্দোলনের মুখে এই ‘অপপ্রয়াস’ স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল তৎকালীন সরকার। কিন্তু বর্তমান সরকারের রেলমন্ত্রী কর্তৃক পুনরায় প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। 

সভায় স্থপতি জেরিনা হোসেন ও প্রকৌশলী সুভাষ চন্দ্র বড়ুয়া কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “নগরীর ফুসফুস খ্যাত সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণের যেকোনও চেষ্টা হবে ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যার শামিল।” তারা আরও উল্লেখ করেন, সিডিএ’র মাস্টার প্ল্যানের সঙ্গে এখানে হাসপাতালসহ যেকোনও স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। 

একই সুরে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাসদ (মার্কসবাদী)। সংগঠনটির চট্টগ্রাম জেলা সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শফি উদ্দিন কবির আবিদ বলেন, “বিগত সরকারের সময় জনগণের তীব্র আন্দোলনের মুখে এই প্রকল্প বাতিল হয়েছিল। এখন নতুন সরকার একই প্রকল্প পুনরায় বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, যা সরাসরি জনমতকে উপেক্ষা করার শামিল।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার আশপাশে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই আত্মঘাতী উদ্যোগ বন্ধ না হলে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “রেলমন্ত্রী মহোদয় রবিবার বিকাল ৪টায় সিআরবি এলাকায় হাসপাতালের জমি পরিদর্শনে আসবেন বলে আমরা জেনেছি। তবে হাসপাতাল নির্মাণ সংক্রান্ত কোনও আনুষ্ঠানিক চিঠি আমি এখনও পাইনি। তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব হচ্ছে না।”