নীলফামারীর জলঢাকায় একটি মন্দিরের আঙিনা থেকে প্রভাত চন্দ্র রায় (৫৫) নামে এক ব্যক্তির গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত মঙ্গলবার সকালে উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের দোলাপাড়া এলাকার সিংগীমারি শ্মশান কালী মন্দিরের উঠানে লাশটি পড়ে থাকতে দেখা যায়।
এলাকার একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মৃত্যুর কারণ এখনও উদঘাটন করা যায়নি। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে।
তবে ঘটনার পর ১ মিনিটের একটি ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে ফেসবুকে। একাধিক আইডি থেকে ভিডিওটি পোস্ট করে ‘মন্দিরে মানুষ বলি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে’ বলে দাবি করা হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, মন্দিরের মাঠে মৃত ব্যক্তির শরীর সাদা কাপড়ে ঢেকে দেওয়ায় হয়েছে। তাকে ঘিরে আছেন উৎসুক মানুষ।
এসব পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘‘নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার রথের বাজারে একটি কালি মন্দিরের সামনে মানুষ বলি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এটা চরম অন্যায়, এরকম অন্যায় চলতে থাকলে মানুষের প্রতি মানুষের মুহাব্বত কমে যাবে। আমি মানুষ হিসাবে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। প্রশাসনের উচিত- সঠিক তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।’’
এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।
এদিকে একই ভিডিও ভারত থেকে পরিচালিত একটি এক্স (সাবেক টুইটার) একাউন্ট থেকে পোস্ট করে দাবি করা হয়েছে, ইসলামপন্থীরা ওই ব্যক্তিকে মেরে মন্দিরের সামনে ফেলে রেখেছে।
এমন পোস্ট দেখুন এখানে।
দ্য ডিসেন্ট নিহতের পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ, সাংবাদিক ও হিন্দু ও মুসলিম প্রতিবেশিসহ ঘটনাসংশ্লিষ্ট অন্তত ১০ জনের সাথে কথা বলেছে। তাদের সবাই জানিয়েছেন, ওই মন্দিরে মানুষকে ‘বলি’ দেওয়ার কোন তথ্য তাদের জানা নেই। কেউ কেউ বলেছেন, এমন দাবি সম্পূর্ণ ভুয়া।
তবে পুলিশ প্রভাত চন্দ্র রায়ের মৃত্যুর কারণ উদঘাটনে তদন্ত করছে।
নিহত প্রভাত চন্দ্র রায়ের মেঝো ছেলে দুলাল চন্দ্র রায় দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘কেমনে কী হইলো সেটা উপরওয়ালা জানে। আমি বাড়িতেই ছিলাম, ঘুমাইছিলাম রাত ১১টার দিকে। বাবা বাড়িতেই ছিল, কখন বের হয়ে গেছে বলতে পারি না। আর বাবা যে ওই জায়গায় মার্ডার হইছে নাকি নিজে আত্মহত্যা করছে সেটাও জানি না। আমাদের আশপাশের লোকজন খবর পাইয়া দৌড়ে আসছে। আমরাও দৌড়াদৌড়ি দেখে কী হইছে দেখতে গেছি। গিয়ে দেখি যে আমার বাবা ঐ জায়গায় পড়ে আছে।’’
মন্দিরে ‘বলি’ দেওয়ার অভিযোগ নাকচ করে দেন ছেলে দুলাল চন্দ্র। বলেন, ‘‘মন্দিরে বলির কোনো কিছু হয়নি। এর আগে তো কোনোদিন দেখিনি, শুনিওনি যে মানুষ বলি হয় মন্দিরে। আমাদের ধর্মে পাঠা বলি দেয়।’’
স্থানীয় মেম্বার ঝড়িয়া চন্দ্র রায়ও বলির অভিযোগটি মিথ্যা বলে জানান। তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘প্রভাত চন্দ্র রায়কে বলি দেওয়া হয়েছে বলে যে, তথ্য ছড়িয়েছে এটি মিথ্যা। মানুষকে আবার কেমনে বলি দেয়!’’
‘‘খবর শুনে আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। এটা হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা আমরা বলতে পারছি না’’, বলেন ঝড়িয়া চন্দ্র।
সিংগীমারি শ্মশান কালী মন্দির কমিটির সভাপতি কানইক্কা চরণ রায় দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘মন্দিরে এমন কিছু ঘটেনি। শুনেছি ফেসবুকে কারা জানি কি লিখেছে। এসব ভুয়া কথাবার্তা।’’
নিহত প্রভাত চন্দ্র রায়ের প্রতিবেশি ঝরিয়া রায় বলেন, ‘‘সকালে খবর শুনে মন্দিরে গিয়ে দেখলাম প্রভাত চন্দ্রের লাশ। পরে পুলিশ এসে নিয়ে গেলো। এখানে বলি দেওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে তা মিথ্যা। এমনকিছু হলে তো আমরা জানতাম।’’
জলঢাকা থানার ওসি নাজমুল আলম বলেন, ‘‘আমরা খবর পেয়ে মৃত ব্যক্তির লাশ এনে ময়না তদন্ত করেছি। তদন্ত চলছে। প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বলা যাবে।’’