Image description

দেশের শিক্ষার মান নিয়ে বিগত এক দশক ধরেই নানা মহলে চলছে সমালোচনা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনেও বারবার শিক্ষাক্ষেত্রের এ সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে।

 

ইউনেস্কো প্রকাশিত বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যানের তথ্যেও এ চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে বাংলাদেশের অবস্থান সবার পেছনে। এখানে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের ২০২৪; নেপালের ২০২৫; শ্রীলংকা ও ভুটানের ২০২৩ এবং মালদ্বীপের ২০২২ সালের তথ্য ধরে বিশ্লেষণটি করা হয়েছে। কেননা নেপাল বাদে বাকি দেশগুলোর সর্বশেষ প্রতিবেদন ওই নির্দিষ্ট বছরগুলোতেই প্রকাশ হয়।

 

দেশে শিক্ষার মান দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ, যার অন্যতম প্রধান কারণ দক্ষ শিক্ষকের অভাব। এ সংকটের পেছনে মূলত দুটি কারণ বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। প্রথমত, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক বিবেচনা, স্বজনপ্রীতি কিংবা বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে যখন বিদ্যালয়ে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হতো, তখন এ ধরনের অনিয়ম বেশি দেখা গেছে। এমনকি ভুয়া সনদ ব্যবহার করেও শিক্ষক নিয়োগ পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

 

দ্বিতীয়ত, বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে। অনেক সময় সরকার প্রশিক্ষণের জন্য বিদ্যালয়গুলোর কাছে শিক্ষকদের তালিকা চাইলেও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না পাঠিয়ে স্বজনপ্রীতির ভিত্তিতে নাম পাঠিয়েছে। ফলে দেখা গেছে, গণিতের প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন বাংলা বা ধর্মীয় শিক্ষার শিক্ষক। ফলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কার্যকর না হয়ে অনেক ক্ষেত্রেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। প্রশিক্ষণ গ্রহণের পরও শিক্ষকরা তা পাঠদানে প্রয়োগ করতে পারছেন না।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘শিক্ষকদের দক্ষতার এ ঘাটতি সরাসরি শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফলে প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন বার্ষিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত মানের দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।’

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেন। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা, যাতে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী হয়। পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষক তৈরির জন্য সব স্তরে প্রি-সার্ভিস প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালুর ওপরও এ শিক্ষাবিদ জোর দেন, যা এরই মধ্যে উন্নত অনেক দেশে কার্যকরভাবে চালু রয়েছে।

বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যানের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হার বিবেচনায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভুটান। দেশটিতে মাধ্যমিক স্তরে ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হার ৯৭ দশমিক ৯ শতাংশ। তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে আছে যথাক্রমে নেপাল ও ভারত। দেশ দুটিতে এ হার যথাক্রমে ৯৭ দশমিক ৪ ও ৯২ দশমিক ৩০ শতাংশ। এছাড়া শ্রীলংকা ও পাকিস্তানে এ হার যথাক্রমে ৮০ দশমিক ৪ ও ৬৮ দশমিক ৯ শতাংশ।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে দুটো চ্যালেঞ্জ স্পষ্টভাবে সামনে আসে। প্রথমত, প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষকের অভাব, বিশেষত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব এবং দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতার ঘাটতি। আমাদের শিক্ষকদের হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে, কিন্তু শ্রেণীকক্ষে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক “শিখন-শিক্ষণ” পদ্ধতিতে তাদের বড় অংশেরই দক্ষতার ঘাটতি আছে। এটি কেবল প্রশিক্ষণের দুর্বলতা নয়, বরং আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং গ্রাম ও শহরের মধ্যবর্তী বৈষম্যের ফল।’

তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের শ্রেণী অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে না পারা বা এসএসসি পরীক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে অকৃতকার্য হওয়ার বড় কারণ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। বিশেষ করে গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজি ও বাংলার মতো মৌলিক বিষয়ে আমাদের মারাত্মক শিক্ষক সংকট রয়েছে। বাংলার শিক্ষক যদি বিজ্ঞান পড়ান, তবে শিক্ষার মানোন্নয়ন অসম্ভব। সরকার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার যে পরিকল্পনা করছে, তা ইতিবাচক। তবে যারা বর্তমানে শিক্ষকতা করছেন, তাদের জন্য নিয়মিত এবং বিষয়ভিত্তিক উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত এখন অনেক ক্ষেত্রে ৬০-৭০ জন, যা পাঠদানের জন্য অত্যন্ত কঠিন। এ অনুপাত সঠিক স্তরে নামিয়ে আনতে হবে।’

বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪-এও। এ পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে মাধ্যমিক স্তরে শ্রেণীকক্ষে ইংরেজি পড়ান ৫৯ হাজার ৭৯১ শিক্ষক। তাদের মধ্যে ২৪ দশমিক ৩৪ শতাংশই উচ্চ মাধ্যমিকের পর আর ইংরেজি পড়েননি, ৪৮ দশমিক ২৩ শতাংশ বাধ্যতামূলক ১০০ নম্বরের ইংরেজিসহ এবং ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ বাধ্যতামূলক ৩০০ নম্বরের ইংরেজিসহ বিএ ডিগ্রিধারী। আর ইংরেজিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর যোগ্যতাসম্পন্ন মাত্র ১৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ক্ষেত্রে আরো ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে গণিতে। মাধ্যমিক স্তরে শ্রেণীকক্ষে গণিত পড়ান ৬১ হাজার ৭০৭ শিক্ষক। তাদের মধ্যে ৫৬ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ শিক্ষকই উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পর আর গণিত পড়েননি। ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ শিক্ষক অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে গণিতসহ বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ১৭ দশমিক ২৮ শতাংশ শিক্ষক গণিত, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানসহ বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। আর গণিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে এমন শিক্ষকের হার মাত্র ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে দুটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়। উভয় কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ। মাধ্যমিক স্তরে ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হার নিয়ে ইউনেস্কোর পরিসংখ্যানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখানে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সেগুলো হলো প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা। সে হিসাবে এটি ৫৫ শতাংশ। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা আরো ভয়াবহ চিত্র দেখেছি। বহু শিক্ষক আছেন যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট আছে ঠিকই কিন্তু ওই যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের দক্ষতা নেই। একইভাবে এমনও অনেক শিক্ষক আছেন যাদের বিএডসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ আছে কিন্তু প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জন করেননি তারা। শ্রেণীকক্ষে পাঠদানে এসব প্রশিক্ষণের কোনো প্রভাব নেই। সুতরাং যদি প্রায়োগিক দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের কথা বিবেচনা করা হয় তাহলে আমাদের ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হার আরো কম।’

এ সমস্যা রাতারাতি সমাধানযোগ্য নয় বলেও উল্লেখ করেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনজুর আহমদ। তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের অদক্ষতার বিষয়গুলো আমাদের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হলেও এখন পর্যন্ত সে অনুযায়ী কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

শিক্ষার মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘প্রকৃত অর্থেই যদি আমরা সমাধান চাই তবে দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা নিতে হবে। যারা সার্টিফিকেট অর্জন করছেন তাদের প্রকৃত দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বর্তমানে বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত বিএড ডিগ্রির মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে, যা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে দায়সারা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার পরিবর্তে বিষয়ভিত্তিক কার্যকর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি এবং শ্রেণীকক্ষে তার বাস্তব প্রয়োগ বাধ্যতামূলক করতে হবে। কারণ শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি শিক্ষক—তাই দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত না করে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।’