Image description

‘দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা’- এটি আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার প্রিয় স্লোগান। সেই ঢাকারই মেয়র হওয়ার সুযোগ এসেছে তার সামনে। ২০২৪-এর ৫ই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনীতির মঞ্চ থেকে এসে তিনি ক্রীড়া উপদেষ্টা হন। সরকার থেকে পদত্যাগের পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে রূপকথার মতো উত্থান হওয়া এই তরুণ রাজনীতিকের বিরুদ্ধে এখন পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ। বাতাসে উড়ছে হাজার কোটি টাকা পাচার ও দুর্নীতির ভয়ঙ্কর সব গল্প। কিন্তু তিনি সবাইকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)কে আহ্বান জানিয়েছেন তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য। গতকাল মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘যখন আমার আলোচনাটা ওঠে, তখন আমি দুদককে আহ্বান জানিয়েছিলাম যে, আপনারা এটা তদন্ত করেন। প্রমাণ করেন এমন কিছু আছে কিনা। এখনো একই কথা বলবো, আপনারা প্রমাণ দেন।’ এই চরম বিতর্কের মধ্যেই তার চোখ এখন ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে। নতুন লড়াই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মেয়র হওয়ার থেকেও কাজ করার আগ্রহটা হচ্ছে এই ঢাকাকে পরিবর্তন করা, একটা পরিবর্তন নিয়ে আসা এবং সেটা দেখাতে পারা।’ তার মতে, অপরিকল্পিত ঢাকার এই বিশাল পরিবর্তন আনা সত্যি খুবই কঠিন কাজ, তবে তিনি পিছপা হবেন না।

অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগগুলো যেন ছায়াসঙ্গী হয়ে উঠেছে আসিফ মাহমুদের। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ- রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ ইতিমধ্যে তার ব্যাংক হিসাবের যাবতীয় তথ্য তলব করেছে। তবে গল্পের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মোড়টি হলো তার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরে। মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে তদবির ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অবৈধ উপায়ে বিদেশে অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। আদালত ইতিমধ্যে মোয়াজ্জেমের দেশত্যাগে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। আসিফের দাবি, তিনি নিজেই তার সহকারীর দুর্নীতির তদন্ত করতে দুদককে জোরালোভাবে আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে এই সরকারের আমলেই তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে যে, তার বিষয়ে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ তারা পাননি।’

নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগকে পরিকল্পিত অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছেন আসিফ। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক ও কর্পোরেট শক্তির যোগসাজশে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে। আসিফ বলেন, ‘আসলে এটা গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই হচ্ছে। প্রথমে আওয়ামী লীগ এটার সঙ্গে ছিল, পরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে বিএনপি এটার সঙ্গে যুক্ত হলো।’ তার মতে, শক্তিশালী কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে নেতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘যখন দেখা যায় যারা একটু সচেতন তারা বুঝতেই পারেন যে, একই শিরোনামে, একই টেক্সটে যখন দশ/বারোটা নিউজ হয়, তখন বোঝাই যায় যে, এটা নির্দিষ্ট কোনো জায়গা থেকে এসেছে।’ দুর্নীতির অঙ্কের অসামঞ্জস্যতা তার কাছে রীতিমতো হাস্যকর মনে হয়েছে। আসিফ বলেন- ‘প্রথমে একশ’ কোটি, পরে এক হাজার কোটি, পরে এগারো হাজার কোটি, পরে এটা আবার এক লাখ বিশ হাজার কোটিতে-মানে এমন অবিশ্বাস্য এবং হাস্যকর অবস্থায় পরিণত করেছেন যে, মানুষ বুঝতে পারছে এর পেছনে অন্য ইনটেনশন আছে। মানুষ এগুলো মোটেও বিশ্বাস করে না।’ তিনি বারবার জনগণের কাছে স্বচ্ছ থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

ক্রীড়া অঙ্গনেও রয়েছে তার বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার বিষয়টি বেশ তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছে। তদন্ত কমিটির ডাকেও তিনি সাড়া দেননি। তবে তিনি এই সব অভিযোগ একেবারেই উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তারা সিটি করপোরেশনে বসতে পারেনি জোরজবরদস্তি করে, তারা ক্রিকেট বোর্ডটা দখল করতে পারেনি। তো এই ক্ষোভের একটা বহিঃপ্রকাশ তো এখন হবে।’ দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার ও আদালত নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশ্য নিয়েও তিনি সরব। আসিফ বলেন, ‘যখন আপনি সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয়ের অধ্যাদেশ বাতিল করে দেন, তখন মানুষ বুঝতে পারছে আপনার আবারো দুদক এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে কুক্ষিগত করার ইনটেনশন আছে।’ তিনি বলেন, ‘আপনারা আবার আদালত দখল করে দলীয় জজ বসিয়ে ওটাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান।’ এসব শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করাটাই তার শক্তি। দৃঢ়কণ্ঠে তিনি জানিয়েছেন, ‘আমরা অনেক শক্তিশালী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, করছি এবং অনেক শক্তিশালী শক্তিকে আমরা সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করেছি এই দেশের মাটিতে।’

ঢাকা নিয়ে আসিফের তিন পরিকল্পনা
দুর্নীতির এই দমবন্ধ করা গল্পের মাঝেই তিনি বুনছেন নতুন ঢাকার স্বপ্ন। নগরীর আধুনিকায়নে আসিফ তিনটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। প্রথমত, শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি জাস্ট চিন্তা করেন যে, ঢাকায় কোনো ময়লা নেই, মানে দিনের বেলা কোনো ময়লা দেখা যাচ্ছে না, তাহলে ঢাকার অনেক বড় সমস্যার সমাধান এভাবেই হয়ে যায়।’ দ্বিতীয়ত, শহরের মশা নিধন। ডেঙ্গুর প্রকোপে প্রাণহানি ঠেকাতে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে চান তিনি। তৃতীয়ত, পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ। প্যারিস বা ইস্তাম্বুলের মতো ঢাকার চারশ’ বছরের পুরনো ঐতিহ্যকে তিনি অক্ষুণ্ন রাখতে চান। আসিফ জানান, ‘এই হেরিটেজ, এই ঐতিহ্যটা আমি ফিরিয়ে আনতে চাই এবং এটা মানুষের মধ্যে আবার ছড়িয়ে দিতে চাই।’ তার লক্ষ্য, দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই নাগরিকদের জন্য একটি সুন্দর ও ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান করা।

রাজনৈতিক জীবনের এই উত্তাল ঢেউয়ের মাঝেই সমপ্রতি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন তিনি। ব্যক্তিজীবন ও রাজনীতির ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আসিফ অকপটে নিজের অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করেন। বলেন, ‘আসলে আলাদা করা খুব কঠিন হয়ে যায়, কারণ ঘরের সময় দেয়াটা খুব... ওই সময়টাই পাওয়া যায় না। জাস্ট রাতে ঘুমাতে যাওয়া ছাড়া।’ তার মতে, পরিবারকে প্রচুর ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের ফ্যামিলির জন্যও কঠিন যারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। অনেক স্যাক্রিফাইস করতে হয়।’ পরিবারকে সময় দেয়ার প্রশ্নে তার সোজাসাপ্টা জবাব, ‘আমি সময় পাই না।’