টানা ৪০ দিন যুদ্ধ চলার পর উত্তেজনা কমেছে মধ্যপ্রাচ্যে। দরপতন হয়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। কিন্তু এই যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে দেশে দেশে। জ্বালানি নিয়ে চরম অস্থিরতা চলছে। দেশে সরকারের তরফে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলা হলেও আতঙ্ক থেকে মানুষ ছুটছেন পাম্প থেকে পাম্পে। সরবরাহ কম থাকায় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। জ্বালানি নিতে দিন-রাত একাকার হয়ে যাচ্ছে যানবাহন চালক ও মালিকদের। কেউ ৮ ঘণ্টা, কেউ আবার জ্বালানি ভরতে গাড়ি নিয়ে পাম্পের সামনে অপেক্ষা করছেন ২৪ থেকে ২৮ ঘণ্টা। এই দীর্ঘ অপেক্ষার পর কোনো পাম্পে দিচ্ছে ৫ শ’ টাকার, কোনো পাম্পে আবার ৩ শ’ টাকার। অনেক পাম্পেই আবার ঝোলানো রয়েছে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড। তাই কাঙ্ক্ষিত তেল পেতে অনেকেই ঘুরছেন একাধিক পাম্পের লাইনে। আবার বখরা দিয়ে অধিক তেল দেয়ার অভিযোগও রয়েছে কোনো পাম্প কর্মীদের বিরুদ্ধে। রাজধানীর ব্যস্ততম বিভিন্ন রাস্তার পাশে তেল নিতে অপেক্ষমাণ এমন একাধিক যানবাহনের সারিতে যানজটসহ ভোগান্তিতেও পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
রাজধানীর আসাদগেটের সংসদ ভবনের কোলঘেঁষা মেসার্স পি ডাব্লিউ ডি স্পোর্টস ক্লাবের নামে চলা পদ্মা অয়েল কোম্পানির ডিলার মেসার্স তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে গিয়ে দেখা যায়, তেল নেই বলে পাম্পটির সামনে দড়ি টানিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আর ওই দড়ির সামনেই প্রচুর লোকের জটলা। এর কিছু দূরে রাস্তায় রয়েছে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের দীর্ঘ সারি। তেল নেয়ার জন্য অপেক্ষা করা এই যানবাহনের সারি আসাদ গেট থেকে শুরু করে গণভবনের পাশ দিয়ে জিয়া উদ্যানের সামনের রাস্তা দিয়ে চলে গেছে বিজয় সরণি পর্যন্ত। পাম্প বন্ধ জানার পরও শত শত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালক সকলেই অপেক্ষায় রয়েছেন জ্বালানি তেল নেয়ার জন্য। এদের মধ্যে মো. আলমগীরও একজন। তিনি বলেন, আমি গতকাল দুপুরে এই পাম্পে তেল নেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। গতকাল এই লাইন ছিল মনিপুরি পাড়া পর্যন্ত। সেখান থেকে আস্তে আস্তে আমি এ পর্যন্ত এসেছি। দিন পার হয়ে কখন রাত হয়ে গেছে টেরই পাইনি। এর মধ্যেই শুনি রাত ২টার দিকে তেল ফুরিয়ে গেছে। পাম্প বন্ধ। কিন্তু কী করার। যদি চলে যাই তাহলে আবারো এসে পেছনের লাইনে দাঁড়াতে হবে। তাই আর বাসায় যাইনি। এগুতে এগুতে এখন আমি পাম্পের কাছাকাছি চলে এসেছি।
তবুও হাল ছাড়িনি। পাম্প কর্তৃপক্ষ বলেছে- তারা তেল আনতে গিয়েছে। তেল আসার পর বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে আবারো তেল দেয়া শুরু হবে। তাই দাঁড়িয়ে আছি। তেল নিয়েই একবারে বাসায় ফিরবো। আলমগীরের পাশেই মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মো. মিরাজ নামে আরেক চালক বলেন, সব পাম্পে তো তেল দিচ্ছে না। এই পাম্পে একটু বেশি দিচ্ছে। তাই সকলে এখানেই ভিড় করছে। তিনি বলেন, আমি সকালে এসে এখানে লাইনে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু তেল নেই। পাম্পের লোক বলে- তারা নাকি এক গাড়ি করে তেল নিয়ে আসছেন, বিক্রি করছেন, ফুরিয়ে যাচ্ছে আবার এক গাড়ি তেল নিয়ে আসছেন। নগদ টাকা ছাড়া তেল তো ডিপো থেকে দিচ্ছেই না আবার এক গাড়ির বেশিও দিচ্ছে না। তাই এত চাপ। এদিকে ওই লাইনেরই শেষ মাথা বিজয় সরণির এরোপ্লেন মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মো. রাসেল নামে এক চালক জানান, পাম্প বন্ধ তাতে কি। সন্ধ্যায় তেল আসলে লাইন দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। তবে আগে থেকে লাইনে না থাকলে এই লাইন কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা মুশকিল।
মিরপুর রোডের মেসার্স তালুকদার ফিলিং স্টেশনের ঠিক উল্টো পাশেই যমুনা অয়েল কোম্পানির ডিলার সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনেও দেখা গেছে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। পাম্পটিতে তেল নিতে মোটরসাইকেল চালকেরা পাম্পের পেছন থেকে শুরু করে মোহাম্মদপুর ইকবাল রোড হয়ে আসাদ এভিনিউ হয়ে ঘুরে আবারো পাম্পের সামনে এসে ঠেকেছে। আর প্রাইভেটকারের লাইন আসাদ গেট থেকে শুরু করে মিরপুর রোড হয়ে মোহাম্মদপুরের স্যার সৈয়দ রোড হয়ে ইকবাল রোডের মাথা দিয়ে আসাদ এভিনিউ হয়ে আবারো মিরপুর রোড দিয়ে পাম্পে প্রবেশ করছে। ওই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মো. বেলাল নামে এক গাড়িচালক বলেন, আমি সকাল ৮টায় এসে দাঁড়িয়েছি। এখন বিকাল সাড়ে তিনটা। এখনো তেল নিতে পারিনি। কখন পাবো তাও জানি না।
তবে তেল না নিয়ে আর এখান থেকে যাচ্ছি না। বেলালের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা হৃদয় নামে এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, ৬ ঘণ্টা হয়ে গেছে দাঁড়িয়ে আছি। তেল নিতে এখনো আধাঘণ্টা লাগবে। কিন্তু এতো সময় দাঁড়িয়ে থেকেও ট্যাঙ্কি ফুল হবে না। তেল দিচ্ছে মাত্র ৫শ’ টাকার। কী আর করার এই নিয়েই হাসিমুখে থাকতে হচ্ছে। তিনি বলেন, এই সমস্যা কবে ঠিক হবে জানি না। তবে বন্ধ না রেখে সকল পাম্প যদি একসঙ্গে পর্যাপ্ত তেল দিতো তাহলে এই সমস্যা আর থাকতো না। আমরা এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাই।
অপরদিকে রাজধানীর খ্যাতিমান তেলপাম্প ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে গিয়েও দেখা গেছে দীর্ঘ যানবাহনের লাইন। বিজয় সরণির মাথায় অবস্থিত এই ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে ঢোকা প্রাইভেটকারের লাইন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে হয়ে জাহাঙ্গীর গেট হয়ে আড়াই কিলোমিটার দূরে মহাখালী রেলগেটের কাছে গিয়ে ঠেকেছে। আর মোটরসাইকেলের লাইন গিয়ে শেষ হয়েছে বিএফ শাহীন স্কুলের উল্টোপাশের সিভিল এভিয়েশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে পর্যন্ত। লাইনের সামনের দিকে তেলের জন্য মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষায় থাকা আশরাফুল ইসলাম নামে এক চালক বলেন, আমি গত (মঙ্গলবার) ৭ ঘণ্টা এসে দাঁড়িয়েছিলাম তেলের জন্য। কিন্তু শরীর অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় ফিরে গিয়েছিলাম। আজকে আবার সকাল ১১টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। ৬ ঘণ্টা হয়ে গেছে। এখনো ২ ঘণ্টা লাগবে পাম্পের ভেতরে ঢুকতে। তাই অপেক্ষায় আছি। তিনি বলেন, গাড়ি স্টার্ট দিলেই তেল ফুরায়।
বেসরকারি একটি কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগে চাকরি করি। প্রতিদিনই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আমাকে চলাচল করতে হয়। সময় বাঁচাতে এই মোটরসাইকেল ব্যবহার করি। কিন্তু গাড়িতে তেল নেই। তেল নিতে দুইদিন ঘুরছি পাম্পে। তবে কেউই ট্যাঙ্কি ফুল করে তেল দিচ্ছে না। এখানে ১ হাজার টাকার তেল দিচ্ছে। তাই অপেক্ষায় আছি। এই তেলটুকু নিলে অন্তত কয়েকটা দিন আর চিন্তা করা লাগবে না। রাজধানীর বাংলামোটরের অদূরে কাজী নজরুল ইসলাম রোডের পরীবাগের মেঘনা মডেল ফিলিং স্টেশনেও প্রতিদিন দিনভর অপেক্ষা করতে দেখা যায় যানবাহন চালকদের। পাম্পটিতে তেল নেয়া যানবাহনের সারি এতোটাই দীর্ঘ যে সাকুরার সামনে হয়ে নওয়াব হাবিবুল্লাহ রোড হয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বহির্বিভাগের সামনে হয়ে আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে দিয়ে মোতালেব প্লাজার পেছন দিয়ে আবারো পরীবাগে গিয়ে ঠেকেছে। সকাল থেকে শুরু করে শাহবাগগামী মেইন রোডের পাশ দিয়ে চলা এই লাইন দেখে যে কেউ ভাবছে বড় কোনো যানজট। সকাল বেলা পিজি হাসপাতালে আসা রোগীদের ভিড়ে ও তেল নিতে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘ লাইনে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে পুরো এলাকায়।
অন্যদিকে বেগম রোকেয়া সরণির পাশে রাজধানীর আগারগাঁও তালতলা এলাকার হাসান ফিলিং স্টেশনেও যানবাহনের দীর্ঘ সারি। তবে ওই পাম্প থেকে তেল নেয়া আশিকুর রহমান নামে এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, পাম্পটিতে ৩শ’ টাকার বেশি তেল দেয় না। কিন্তু আমি ওই পাম্পের কর্মচারীকে মাত্র ৫০ টাকা বকশিস দিয়ে ৬শ’ টাকার তেল নিয়েছি। আমার মতো অনেকেই এমন করছে। তবে পাম্পের সামনের এই দীর্ঘ লাইন নিয়ে বেশ কয়েকটি পাম্প কর্তৃপক্ষ বলেছেন, যারা তেল নিতে আসছেন এদের বেশির ভাগেরই ট্যাঙ্কিতে পর্যাপ্ত তেল রয়েছে। কারোর ৫শ’, কারোর আবার ৭’শ টাকার তেলেই ট্যাঙ্কি ফুল হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই আবার ট্যাঙ্কি থেকে পাইপে করে বোতলে ভরে মজুত করছে। কেউ কেউ আবার একাধিক পাম্পে গিয়ে তেল নিচ্ছে। তবে মোটরসাইকেল চালকেরা বলছেন, আগে সব পাম্পে পর্যাপ্ত তেল দিতো। কিন্তু এখন বেশির ভাগ পাম্পেই তেল দিচ্ছে না। যারাও দিচ্ছে তারা দিনের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল দিচ্ছে। যা পর্যাপ্ত নয়। অনেক পাম্পই আবার তেল ডিপো থেকে নিয়ে এসেছে অন্যত্র মজুত করছে। একাধিক পাাম্পে ঘুরেও পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই যে কয়টা পাম্প খোলা থাকছে, সেখানে লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। যদি তেলের দাম হঠাৎ করে সরকার ২ টাকাও লিটারে কমিয়ে দেয় তাহলে যারা স্টক করছে তারা সকলেই তাড়াহুড়ো করে তেল ছেড়ে দিবে। আর পাম্পে পর্যাপ্ত তেল পাওয়া গেলে লাইনও এমন দীর্ঘ হবে না। আমরা এই সংকট থেকে মুক্তি চাই।