মো. মোস্তফা কামাল। চাঁদপুরের আব্দুর রশিদ-জাহানারা বেগম দম্পতির জ্যেষ্ঠ পুত্র। দেশে কৃষিকাজ করে ভাগ্যের উন্নতি না হওয়ায় স্ত্রী ও তিন শিশুসন্তানকে রেখে পাড়ি জমান আইভরিকোস্টে। তবে ভাগ্যের উন্নতি তো দূরের কথা- বিদেশ গিয়ে নিজের জীবন বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশ থেকে টাকা না পাঠালে খাবারটুকুও জোটে না। উপরন্তু চলে নির্মম নির্যাতন। বর্তমানে অসুস্থ হয়ে দেশটির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। পাসপোর্ট কেড়ে নেয়ায় দেশেও ফিরতে পারছেন না তিনি। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে গত তিন মাস ধরে রিক্রুটিং এজেন্সি, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও থানা পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ভুক্তভোগী মোস্তফার পরিবারের সদস্যরা। শুধু মোস্তফা কামাল নয়, তার মতো আইভরি কোস্টে গিয়ে শত শত বাংলাদেশি যুবকের অবস্থা একই। বাঁচার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন তারা।
ইতিমধ্যে দালালদের নির্যাতনে আবুল কাশেম নামে নরসিংদীর এক যুবক মারা গেছেন। তার মরদেহ দেশে আনতে দেয়া হয়নি।
ভুক্তভোগী মোস্তফা কামালের ছোটভাই মাইনউদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, গত বছর আনিসুর নামে আমার দূরসম্পর্কের এক মামা আমার ভাইকে বলেন- ‘আমি ঢাকার এক্সিলেন্ট ড্রিম ওভারসিজ নামে একটা ভিসা রিক্রুটমেন্ট অফিসে কাজ করি। আমি ওখানকার ম্যানেজার। আমাদের অফিস নয়াপল্টনের আলিস টাওয়ারে। আমরা প্রতিনিয়ত বিদেশে লোক পাঠায়। সামনেই আইভরি কোস্টে কিছু লোক পাঠাবো। তোমাকেও (মোস্তফা কামাল) পাঠিয়ে দিই। তোমার কিচ্ছু করা লাগবে না। শুধু আমাকে ৮ লাখ টাকা দিবা। বাকিটা আমি করবো। আর ওখানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাকরি পেয়ে যাবা।
একদিনও বসে থাকতে হবে না। মাসে এক লাখ টাকার ওপরে বেতন। তুমি যাওয়ার পর তোমার ভাইসহ পরিবারের অন্য সদস্যদেরও নিয়ে যেতে পারবা। অল্পদিনের মধ্যেই গ্রিনকার্ড পেয়ে যাবা। এমন কথা শোনার পর আমরা আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার-কর্য ও ঋণ করে টাকা দেই। এরপর তারা আমার ভাইকে ট্রেনিং করায়। এরপর ভাইয়ের বিদেশ যাওয়ার প্রসেসিং ফি বাবদ তার পাসপোর্টের সঙ্গে প্রথমে মামা আনিসুরকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা নগদ দিই। এরপর বিভিন্ন ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে আরও সাড়ে ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করি। বৈধ ভিসা নিয়েই আমার ভাই গত ৬ই জানুয়ারি বিকালে শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইথিওপিয়া পৌঁছায়। এরপর থেকেই শুরু হয় চরম নাটকীয়তা। হঠাৎ করে বদলে যায় দৃশ্যপট। ওই এয়ারপোর্টে থাকাকালেই আনিসুর মামা বলেন, তোমার ভাইকে ইমিগ্রেশনে আটকে দিয়েছে। অনেক সমস্যা হচ্ছে। ভাইকে ছাড়াতে হলে দ্রুত ১শ’ ডলার পাঠাতে হবে। অল্প সময়ের মধ্যে আবার এক আত্মীয়র কাছ থেকে ধার করে আনিসুরকে ১শ’ ডলার মূল্যের বাংলা টাকা তার অফিসে গিয়ে পরিশোধ করি।
তিনি বলেন, আইভরি কোস্টে নামার পরে আমার ভাইকে তাদের লোকজন সেখানকার আবিদ জান বেনডের ৩২ এলকোল এলাকায় জঙ্গলের পাশের একটি পরিত্যক্ত ভবনে নিয়ে রাখে। চাকরি তো দূরের কথা খেতে পর্যন্ত দেয়নি তাকে। না খেতে পেয়ে আমার ভাই অসুস্থ হয়ে পড়ে। অসুস্থ হওয়ার পর তাকে হাসপাতালে পর্যন্ত নেয়া হয়নি। কোনো চিকিৎসা করানো হয়নি। বাধ্য হয়ে আমরা আবার টাকা পাঠাই, তারপর সে খাবার কিনে খায়। এখন সে আবারো অসুস্থ হয়ে গেছে। তাকে চিকিৎসা না দিয়ে রুমের মধ্যেই ফেলে রাখা হয় দীর্ঘদিন ধরে। পরে আমি এখান থেকে ওই দেশে থাকা অন্যান্য বাঙালিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। এখনো সে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। মাইনউদ্দিন বলেন, শুধু আমার ভাই একা নয়, আমার ভাইয়ের সঙ্গে যাওয়া এমন অন্তত ৩০ জনের অবস্থা একই। সবাইকেই মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে সে দেশে নিয়ে গিয়ে আইভরি কোস্টসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নিয়ে গিয়ে পাসপোর্ট-কাগজ-পত্র কেড়ে নিয়েছে। বৈধ কাগজের অভাবে তারা সকলেই মানবেতর জীবন-যাপন করছে। দিনে একবার খাবার জোটে কি না সন্দেহ।
এদিকে আইভরি কোস্টে যাওয়ার পর দালালদের নির্যাতনে আবুল কালাম নামে নরসিংদীর এক প্রবাসী মারা গেছেন। তার লাশ পর্যন্ত দেশে আনতে দেয়নি এক্সিলেন্ট ড্রিম ওভারসিজের মালিক বদিউল ও ম্যানেজার আনিসুর। এমনকি মৃত্যুর পর আবুল কালামের লাশ বেশ কয়েকদিন রুমের মধ্যেই উলঙ্গ অবস্থায় রেখে দেয়া হয়। খুলনার আরেক প্রবাসীও অসুস্থ হয়ে মৃত্যু শয্যায়। এ সব জানার পর আমার ভাইয়ের বিষয়ে যখন রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি এক্সিলেন্ট ড্রিম ওভারসিজের আনিসুর ও বদিউলের কাছে জানতে চাই, তখন তারা ওই আবুল কালামের উলঙ্গ লাশের ছবি দেখিয়ে আমাদেরকে হুমকি দেয়- ‘বেশি কথা বললে তোর ভাইয়ের অবস্থাও এমন হবে। থানা পুলিশ সব আমাদের পকেটে। তোরা কিচ্ছু করতে পারবি না আমাদের। এরপর থেকে তোর ভাই যদি ওই দেশে মরে যায়, তাহলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ১৩ লাখ টাকা পাইয়ে দিবো। তোর ভাই মারা যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর’। অশ্রুসিক্ত হয়ে মাইনউদ্দিন বলেন, আমি আমার ভাইকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য গত ৩ মাস ধরে তাদের পেছন পেছন ঘুরছি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। পল্টন থানায় গিয়েছি। সব শেষ গত ৩১শে মার্চ এ বিষয়ে পল্টন থানায় লিখিত আবেদনও করেছি। কিন্তু অদৃশ্য কারণে এখনো কোনো সমাধান পাইনি।
এদিকে এক্সিলেন্ট ড্রিম ওভারসিজ রিক্রুটমেন্ট কোম্পানির মাধ্যমে আইভরি কোস্টে যাওয়া এমন অন্তত ১০ জনের সঙ্গে হোটাসঅ্যাপের ভিডিও কলে কথা হয় মানবজমিন’র এই প্রতিবেদকের। সে দেশে থাকা শাহীন নামে এক প্রবাসী অসুস্থ মোস্তফা কামালকেও ভিডিও কলে দেখান। সেখানে দেখা যায়, মোস্তফা কামাল মাথা সোজা করে দাঁড়াতে পারছেন না। তিনি এতোটাই দুর্বল যে কারোর সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে পারছেন না। স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শাহীন বলেন, দেশবাসীর কাছে অনুরোধ করি, আমাদেরকে যেকোনোভাবে দেশে নিয়ে যান। ভাই, আমাদেরকে বাঁচান।
আমাদের সকলের অবস্থা খুব খারাপ। রাকিব নামে আরেক প্রবাসী বলেন, আমরা বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে অন্তত শতাধিক লোক বৈধভাবে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ করে এই দেশে এসেছি। শিমুল নামে আরেক বাঙালি এখানে আসার পর আমাদের দায়িত্ব নেয়। তিনি দীর্ঘদিন এই দেশে থাকে। তিনিই মূলত বাংলাদেশে থাকা এজেন্সিগুলোর হয়ে কাজ করে এই দেশে। এরা সকলেই একটা সিন্ডিকেট। তারাই আমাদেরকে বৈধভাবে এনে এখানে কাগজ-পত্র কেড়ে নিয়ে অবৈধ করে রেখেছে। আর এই অবৈধ কাজের জন্যই আইভরি কোস্টের পুলিশ শিমুলকে আটক করেছে। তবে এই দেশে এসে ফেঁসে গেছে আমাদের মতো শত শত বাংলাদেশি। এমন একটা অবস্থা, না পারছি আমরা কাজ করতে, না পারছি দেশে ফিরতে। উপরন্তু কারোর কাছে এই বিষয়ে মুখ না খোলার জন্য এজেন্সি থেকে চাপ দিচ্ছে, হুমকি দিচ্ছে। খালি গায়ে মাটির ওপর বসে থাকা বেশ কয়েকজনকে দেখিয়ে তিনি বলেন, আমরা সকলেই এর থেকে মুক্তি চাই। তিনি বলেন, শুধু আমরা নয় আমাদের সঙ্গে আমাদের পরিবারও এখন নিঃস্ব হয়ে গেছে। ধার-কর্য করে আমাদের বিদেশ পাঠিয়ে ঋণের চাপে না দিশাহারা পরিবারের সকলে।
তবে বিষয়টি নিয়ে এক্সিলেন্ট ড্রিম ওভারসিজ রিক্রুটমেন্ট কোম্পানির ম্যানেজার আনিসুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, মোস্তফা কামাল ও মাইনউদ্দিন আমার দূরসম্পর্কের ভাগনে। আমার মাধ্যম দিয়ে ঠিক না আমার অফিসের মাধ্যম দিয়ে মোস্তফা আইভরি কোস্টে গেছে। আর এইজন্য ৮ লাখ নয়, তারা আমার একাউন্টে মোট ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করে। সেখানে গিয়ে সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে এটা সত্য।
তবে তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, আসলে ওই দেশে থাকা আমাদের এজেন্টরা আমাদের সঙ্গে বেঈমানি করেছে। যা করার তারাই করেছে। তারাই আমাদের মতো বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে মানুষকে আইভরি কোস্টসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, আসলে ভাই এগুলো ছাপলে ভালো হবে না। সমস্যা হবে। তিনি বলেন, আমি যেটুকু জানি কোনো পরিত্যক্ত বাসা নয়, তাদেরকে একটি ভাড়া বাসায় রাখা হয়েছে। তাদেরকে লোহার কোম্পানিতে চাকরিও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই দেশে গিয়ে পরিবর্তিত আবহাওয়ায় অনেকেই কিছুদিন কাজ করার পর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। নরসিংদীর আবুল কালামকে নির্যাতন করে হত্যার বিষয়ে তিনি বলেন, আবুল কালাম হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছেন। ফ্রান্স অ্যাম্বাসির মাধ্যমে ওই দেশেই তাকে দাফন করা হয়েছে। ভাই মরলে ১৩ লাখ টাকা পাইয়ে দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আমি এ সব কথা কখনোই বলিনি।
বিষয়টি নিয়ে এক্সিলেন্ট ড্রিম ওভারসিজ রিক্রুটমেন্ট কোম্পানির মালিক বদিউল আলম খানের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন না ধারায় ও অফিসে না থাকায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
বিষয়টি তদন্তের দায়িত্বে থাকা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র পল্টন থানার এসআই আরিফুল ইসলাম বলেন, আমি বাদী ও অভিযুক্তদের সঙ্গে কথা বলেছি। যতটুকু জানতে পেরেছি- অভিযুক্ত এক্সিলেন্ট ড্রিম ওভারসিজ রিক্রুটমেন্ট কোম্পানির মালিক বদিউল আলম খান বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন। এরপরও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত করে যে রিপোর্টই পাবো- তা উর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিষয়টি নিয়ে ডিএমপি’র পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান বলেন, তদন্ত শেষে আদালতের মাধমে এই বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।