বাবা নেই। মা ও তিন বোনের সংসার। বড় বোন বেসরকারি একটি মাদ্রাসার এমপিওভুক্ত শিক্ষক। তিনিই একমাত্র উপার্জন-ক্ষম। কিন্তু বাড়ি থেকে তার চাকরিস্থল প্রায় ২৩০ কিলোমিটার দূরে। সংসারের কথা ভেবে ছাড়তে পারছেন না চাকরি। আবার বদলি না থাকায় যেতেও পারছেন না বাড়ির কাছে। নানাবিধ সমস্যা নিয়ে চাকরি করে যাচ্ছেন তিনি। ইংরেজির এই শিক্ষিকা বলেন, আমি বিয়ে করতে পারছি না, পরিবারের জন্য। বয়সও হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আমি চাকরি ছাড়তেও পারছি না। আমার বাবা বা ভাই থাকলে আমি এতো দূরে পড়ে থাকতাম না।
তার মতো অনেক শিক্ষকই আছেন যারা নানাবিধ সমস্যার মুখে। বিশেষ করে নারী শিক্ষকরা। তারা চাকরি ছাড়তেও পারছেন না। আবার এলাকার দিকেও যেতে পারছেন না। দূরে চাকরির কারণে সংসার ভেস্তে গেছে রাহেলা বেগমের। তিনি চাকরি করেন নড়াইল জেলায়। বলেন, আমার স্বামীর কর্মস্থল থেকে আমার কর্মস্থলের দূরত্ব ছিল প্রায় ১৭০ কিলোমিটার। মাসে একবারও আমাদের দেখা হতো না। আমাদের একটা ছেলে আছে। প্রথমে বাবার কাছে থাকতো। সেখানে বাচ্চার দাদা-দাদিও আছে। কিন্তু আমি একা থাকার কারণে নানা কটু কথা শুনতে হয়। মুখ বুজেই চাকরি করছি। কারণ আমি একটা নিজের পরিচয় চাই। আর পরিবারে সব সময় বলে আসছি- বদলি চালু হবে। চালু হলেই এলাকায় চলে যাবো। কিন্তু বছরের পর বছর গেলেও বদলি আর চালু হয়নি। করোনার পরপর আমার স্বামী, ছেলেকে আমার কাছে রেখে যায়। এরপর সে আমার কাছে ডিভোর্স কিংবা দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি চায়। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ঝামেলার মধ্যে ছিলাম। চাকরিও ছাড়তে চেয়েছিলাম। হয়তো চাকরিটা ছাড়াই উচিত ছিল। এরপর ২০২৩ সালে আমাদের ডিভোর্স হয়ে যায়। এই কথা বলার পর তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, শুধুমাত্র বদলিপ্রথা না থাকার কারণে আমার সংসার ভেঙেছে।
এ সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও শিক্ষকরা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছেন। বাবার শেষ সময়ে পাশে থাকতে পারেননি সাইফুল ইসলাম। তিনি সহকারী শিক্ষক মীরগঞ্জ দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় গোলাপগঞ্জ, সিলেট। তিনি বলেন, নিজ জেলা জয়পুরহাট আমার জেলা থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে। দ্বিতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে যোগদান করি। বদলি না থাকায় আমার পিতার মৃত্যুর সময় পাশে থাকতে পারিনি। ২০২১ সালের ১৬ই জুন আমার পিতা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান। পিতার মৃত্যুর দাফনের সময় আমাকে দুইটা বিমানযোগে যেতে হয়েছিল। প্রথমে সিলেট থেকে ঢাকা এবং ঢাকা থেকে সৈয়দপুর। এরপরে একটি প্রাইভেট গাড়িতে বাড়িতে পৌঁছি। এরপরে দাফন কার্য সম্পন্ন করা হয়। যদি বদলি থাকতো তাহলে পিতার মৃত্যুর সময় পাশে থাকতে পারতাম। এই ব্যথাটা এখনো আমাকে কাঁদায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সন্তান-স্ত্রী থাকেন নাজির হোসেনের। তিনি চাকরি করেন খাগড়াছড়িতে। তিনি বলেন, আমার ছেলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে আর মেয়ের বয়স চার। এমনি অবস্থা যে, আমার বাচ্চাদের আমি কাছে পাই-ই না। আবার ঠিকমতো দেখভালও করতে পারি না। আমাদের বেতন-ভাতাতো খুবই কম। মাত্র সাড়ে ১২ হাজার টাকা। এমনি এক অবস্থা যে, বাবা-মায়ের সেবা করা কিংবা আত্মীয়- স্বজনদের মৃত্যুর সংবাদেও এলাকায় যাওয়া সম্ভব হয় না।
আমরা এই লড়াইটা প্রায় আট বছর ধরে করে আসছি। আমরা একাধিকবার মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলনসহ নানা আন্দোলন করেছি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। আমরা ক্লান্ত।
জানা যায়, আওয়ামী লীগ আমলে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমনি থাকাকালীন এই আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষকরা দীর্ঘদিন এই আন্দোলন করেন। সব সময়ই শিক্ষামন্ত্রী আশ্বাস দিলেও কার্যত কিছুই করেননি। এরপর মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর শূন্যপদের বিপরীতে বদলির কথা বলেন। কিন্তু এটা ইতিবাচক ফল না আনায় সেটাও ভেস্তে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার আমলে নীতিমালা জারি করা হয়। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলির জন্য সংশোধিত নীতিমালা-২০২৬, যা স্বয়ংক্রিয় সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে কার্যকর হবে। নীতিমালার উদ্দেশ্য হলো- দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষকদের বদলির কার্যক্রম সহজ, দ্রুত এবং ন্যায্যভাবে সম্পন্ন করা।
নীতিমালায় বলা হয়, বদলির জন্য প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শূন্যপদের বিবরণ অনলাইনে প্রকাশ করা হবে এবং শিক্ষকেরা আবেদন করবেন। আবেদনকারীরা নিজ জেলায় বা বিভাগের যে কোনো জেলায়, এমনকি স্বামী/স্ত্রীর কর্মস্থলে বদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন। প্রথম যোগদানের দুই বছর পূর্ণ হলে শিক্ষক বদলির যোগ্য হবেন। নতুন কর্মস্থলে ন্যূনতম দুই বছর কাজ শেষে পরবর্তী বদলির সুযোগ পাবেন। কর্মজীবনে সর্বোচ্চ তিনবার বদলির সুযোগ থাকবে।
একটি পদের জন্য একাধিক আবেদন থাকলে নারী, দূরত্ব, স্বামী/স্ত্রীর কর্মস্থল ও জ্যেষ্ঠতা বিবেচনা করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে। বদলির পুরো প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। বদলিকৃত শিক্ষকের এমপিও, আর্থিক সুবিধা ও জ্যেষ্ঠতা বজায় থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী মন্ত্রণালয় নীতিমালা পরিবর্তন বা ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারবে।
এই বদলির নীতিমালা মাউশি করলেও নতুন জটিলতা দেখা দিয়েছে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে এই বদলি পদ্ধতি চালু করা হবে। এ নিয়েও শিক্ষকরা নতুন করে শঙ্কায় পড়েছেন। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহ-প্রধানের নিয়োগ পরীক্ষা ও সুপারিশ করা হবে। এছাড়া শিক্ষকদের বদলিও একই মাধ্যমে করা হবে।
বুধবার মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষকদের তথ্য আপলোড করছে না মাউশি। আর মাউশি বলছে, এই তথ্য সংগ্রহ করতে হবে পর্যায়ক্রমে। এছাড়াও এতে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও কর্মচারীদেরও যুক্ত করতে হবে। দুই পক্ষের যুক্তিতে ফের দীর্ঘসূত্রিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।