আঠারো মাস বয়সী ছোট্ট অজিহা এখনো বোঝেনি তার মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া চিরতরে সরে গেছে। সে হয়তো এখনো দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে তার বাবা নাঈম মিয়ার জন্য। কিন্তু সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া (মাঝপাড়া) গ্রামের ২৫ বছর বয়সী নাঈম এখন ভূমধ্যসাগরের অতল গহ্বরে এক নিথর দেহ। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে ১৭ লাখ টাকা খরচ করে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, দালালের অমানুসিক নির্যাতন আর অনাহারে সেই স্বপ্ন এখন সাগরের নোনা জলে ভেসে গেছে।
দোলন মিয়া ও আঁখি বেগমের আদরের ছোট ছেলে নাঈম ছিলেন একজন ফুটবলার। জগন্নাথপুর পৌরসভাধীন কবিরপুর বাজারে একটি দোকানে কাজ করে চাকরি করতেন। কিন্তু বড় হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর ঘর ছাড়েন তিনি।
জগন্নাথপুর উপজেলার ইছগাঁও গ্রামের দালাল আজিজের খপ্পরে পড়ে ধাপে ধাপে ১৭ লাখ টাকা খুইয়েও শেষ রক্ষা হয়নি তার। লিবিয়া পৌঁছানোর পর থেকেই শুরু হয় বিভীষিকা। সেখানে একটি অন্ধকার ঘরে নাঈমসহ আরো অনেককে আটকে রেখে চালানো হতো পৈশাচিক নির্যাতন।
মৃত্যুর মাত্র এক দিন আগে ২০ মার্চ স্ত্রী আয়েশা বেগমকে পাঠানো এক হৃদয়বিদারক ভয়েস মেসেজে নাঈম তার বন্দিশালার নরকযন্ত্রণার কথা জানিয়েছিলেন। ধরা গলায় তিনি বলেছিলেন, আমরা মারা যাবো... আমাদের কোনো খাবার নেই। পচা আর দুর্গন্ধযুক্ত পানি খেতে দেয়। সকালে অর্ধেক রুটি আর রাতে অর্ধেক রুটি দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। সেই পচা পানি আর সামান্য রুটি খেয়ে কতক্ষণ লড়া যায় মৃত্যুর সাথে? ২১ মার্চ রাতে যখন তাদের নৌকায় তোলা হয়, ততক্ষণে নাঈমের শরীর ও মন নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।
একই নৌকায় থাকা গ্রিস পৌঁছানো তোফায়েল নিশ্চিত করেছেন, দীর্ঘ এক মাসের অনাহার আর দালালের বেধড়ক পিটুনি সইতে না পেরে নৌকায় ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই নাঈমের মৃত্যু হয়। পাষণ্ড দালালরা বিন্দুমাত্র মায়া না করে নাঈমের নিথর দেহটি মাঝপথেই উত্তাল সাগরে ফেলে দেয়। নাঈমের লাশটি দেশের মাটিতে ফেরার সুযোগটুকুও পেল না।
আজ নাঈমের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। মা আঁখি বেগম বাকরুদ্ধ, বাবা-মা ও স্ত্রীর আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে গ্রামের বাতাস।
পিতা দোলন মিয়ার মিয়ার অভিযোগ, দালালের মরণনেশা আজ একটি সাজানো পরিবার ধ্বংস করে দিয়েছে। ১৭ লাখ টাকা খুইয়ে আজ এক অবুঝ শিশু হয়েছে এতিম।