নতুন বিধিমালা কার্যকর হলেও সহসাই পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ফলে দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে শেয়ারবাজারে চলমান আইপিও খরা আরো প্রলম্বিত হতে যাচ্ছে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদনের পর নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির জন্য আরো প্রায় এক বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে বিনিয়োগকারীদের। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা এমন তথ্যই জানিয়েছেন।
বিধিমালা অনুযায়ী, আইপিও আবেদনের জন্য কোম্পানির প্রসপেক্টাসে যুক্ত নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ১২০ দিনের বেশি পুরোনো হতে পারবে না। আবার শুধু অর্ধবার্ষিক (হাফ ইয়ারলি) বা প্রান্তিক (কোয়ার্টার) সময়ের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন দিয়ে কোনো আইপিও আবেদনের সুযোগ নেই।
এদিকে আয়কর (পরিপত্র) ২০১৫-এর মাধ্যমে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আর্থিক হিসাব বছর সমাপ্তির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ ডিসেম্বর। অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রে হিসাব বছরের সমাপ্ত তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ জুন। অবশ্য বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের নিজস্ব আর্থিক হিসাব বছর অনুসরণ করার সুযোগ রয়েছে।
আর্থিক হিসাব বছর সমাপ্তের হিসাব অনুযায়ী, শুধু গত বছরের ৩১ ডিসেম্বরে হিসাব বছর সমাপ্ত হওয়া ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চলতি বছরের এপ্রিল মাসের মধ্যে আইপিওর মাধ্যমে তালিকাভুক্তির আবেদনের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে মার্চে হিসাব বছর সমাপ্ত হয় এ ধরনের বহুজাতিক কোম্পানির জন্য আবেদনের সুযোগ রয়েছে জুলাই মাস পর্যন্ত।
কিন্তু বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে ব্যাংক, বীমাসহ যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বাইরে রয়েছে আর্থিক পরিস্থিতির কারণে সেগুলোর আইপিওতে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তিতে আবেদনের জন্য মূল ব্যবসা থেকে কমপক্ষে সবশেষ আর্থিক হিসাব বছরে মুনাফা থাকার এবং আবেদনের সময় কোনো ধরনের সঞ্চিত লোকসান না থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও গ্রিনফিল্ড কোম্পানির জন্য এ শর্তের ক্ষেত্রে শিথিলতা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তিতে খুব একটা সাড়া মিলবে না।
আইসিইউ সংকটে আড়াই মাসে ৬২ শিশুর মৃত্যুআইসিইউ সংকটে আড়াই মাসে ৬২ শিশুর মৃত্যু
অন্যদিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা নেই এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শেয়ারবাজারে আসার ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহী নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বহুজাতিক যেসব কোম্পানিতে বাংলাদেশ সরকারের মালিকানা রয়েছে সেসব কোম্পানির সরকারের অংশ বাজারে ছাড়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। বহুজাতিক কোম্পানির বোর্ডের অনুমোদন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ নানা কারণে শেয়ার ছাড়ার বিষয়টি ঝুলে রয়েছে। এ অবস্থায় বহুজাতিক কোম্পানির তালিকাভুক্তির আবেদনের সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
ফলে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আবেদনে অনাগ্রহের কারণে আগামী ৩০ জুনে হিসাব বছর সমাপ্ত হওয়া কোম্পানিগুলোরই আইপিওতে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। জুনে হিসাব বছর সমাপ্ত হওয়া কোম্পানিগুলো সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে তালিকাভুক্তির আবেদন জমা দিতে পারবে। আবেদন জমা দেওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষ করে অনুমোদন দিতে অনেক সময় দেড় থেকে দুই বছর সময় নেয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
অবশ্য নতুন বিধিমালায় আইপিও অনুমোদনে স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আবেদনের ৩০ দিনের মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জ তালিকাভুক্তির ব্যাপারে তাদের আপত্তি বা অনাপত্তির বিষয়টি বিএসইসিকে অবহিত করবে। এরপর বিএসইসি পর্যালোচনা শেষে আইপিওর চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি দ্রুতগতিতেও আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয় তাহলেও কমপক্ষে দুই থেকে তিন মাস সময় লেগে যায়। ফলে আইপিওর মাধ্যমে চাঁদা সংগ্রহ থেকে শুরু করে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চলতি বছরে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি ও লেনদেন শুরুর সম্ভাবনা খুব কম বলে বাজার সংশ্লিষ্টদের ধারণা। আর এমনটি হলে ২০২৫ সালের মতো ২০২৬ সালেও শেয়ারবাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। এতে দীর্ঘ সময় ধরে আইপিওবিহীন থাকার এক অনন্য নজির ঘটতে যাচ্ছে দেশের ইতিহাসে।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালে পাঁচটি কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্পানিগুলো হলো—সিকদার ইনস্যুরেন্স, এনআরবি ব্যাংক, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, বেস্ট হোল্ডিং ও টেকনো ড্রাগ। এর মধ্যে সবশেষ কোম্পানি হিসেবে টেকনো ড্রাগ ওই বছরের জুলাই মাসে তালিকাভুক্ত হয়। এরপর থেকে আর কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি।
প্রসঙ্গত, শেয়ারবাজারে নতুন কোম্পানির আইপিও অনুমোদনে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব ইকুয়িটি সিকিউরিটিজ) রুলস, ২০২৫ গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর গেজেট আকারে প্রকাশিত হওয়ার দিন থেকে এটি কার্যকর হয়েছে।
কিন্তু বিধিমালা কার্যকর হলেও সহসাই নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে বিএসইসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে জানান।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও এমটিবি ক্যাপিটাল ইনভেস্টম্যান্টের প্রধান নির্বাহী সুমিত পোদ্দার আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে যেসব ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় সেগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ভালো নয়। ফলে এ ধরনের কোম্পানি আইপিওতে আবেদন করার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অন্যদিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নানা কারণে আমাদের দেশের শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহী নয়। অন্যদিকে কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, উচ্চ সুদের হারের কারণে উৎপাদনমুখী কোম্পানিগুলো খুব বেশি মুনাফা করতে পারছে না। এ অবস্থায় জুনে অর্থবছর সমাপ্ত হওয়া কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও আইপিওতে আবেদন করার মতো ভালো কোম্পানির সংখ্যা খুব বেশি হবে বলে মনে হচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন, অনেক ভালো কোম্পানি রয়েছে যাদের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ খুবই কম। কিন্তু শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম সীমা রয়েছে। অন্যদিকে প্লেসমেন্ট বাণিজ্য বন্ধে নগদ অর্থের মাধ্যমে পরিশোধিত মূলধন বৃদ্ধির দুই বছরের মধ্যে কোম্পানির আইপিও আবেদন অনুমোদন না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে আইপিও বিধিমালায়। ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে নানা প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করে এ বিশ্লেষক বলেন, ভালো কোম্পানি না আসলে শেয়ারবাজারের সংকট কাটবে না। সংকট কাটাতে দ্রুত সরকারের লাভজনক কোম্পানির শেয়ার ছাড়া উচিত।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অধ্যাপক এম খায়রুল হোসেন ও অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম বিএসইসির চেয়ারম্যান থাকাকালীন বাজারে অনেক দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছিল। এসব দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে কমিশনের বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক চাপেও কিছু কোম্পানির তালিকাভুক্তি ঘটে।