Image description

তিন বছর বিকল থাকার পর গত বছরের জুন মাসে সচল হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের এমআরআই (ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং) যন্ত্র। প্রায় ১০ কোটি টাকা দামের যন্ত্রটি মেরামতে খরচ হয় ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। তবে ৯ মাসের মাথায় আবারও বিকল হয়ে গেছে যন্ত্রটি। ৬ মার্চ থেকে যন্ত্রটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ। এ কারণে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগীদের।

চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এমআরআই যন্ত্রটি পুরোনো। এর আগেও তিন-চার দফা এটি মেরামত করতে হয়েছে। সবশেষ টানা তিন বছর বিকল থাকার পর মেরামত শেষে ২০২৫ সালের জুন মাসে এটি চালু হয়। সম্প্রতি যন্ত্রটির ‘গ্র্যাডিয়েন্ট অ্যামপ্লিফায়ার’ নষ্ট হয়ে গেছে। যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ায় যন্ত্রটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। মেরামতের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এত টাকা দিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর সাধ্য সবার নেই। তাই সরকারি হাসপাতালে থাকা যন্ত্রটি দ্রুত মেরামত করা দরকার।
সমীর দাশ গুপ্ত, রোগীর স্বজন

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ১৬ আগস্ট ৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকায় চমেক হাসপাতালে এমআরআই যন্ত্রটি বসানো হয়। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ছিল মেডিটেল প্রাইভেট লিমিটেড। তিন বছর ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হয় ২০২০ সালের আগস্টে। এরপর ২০২১ সালের মে মাসে বিকল হয়ে পড়ে যন্ত্রটি। তখন মেরামত করা হলেও ২০২২ সালের মে মাসে যন্ত্রটি প্রায় পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে। এরপর প্রায় তিন বছর সেটি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। মেরামতের পর ২০২৫ সালের জুনে এটি আবার চালু হয়।

৬ মার্চ এমআরআই যন্ত্রটি আবার বিকল হয়ে পড়ায় মেরামতের জন্য মেডিটেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চট্টগ্রাম শাখার প্রধান প্রকৌশলী শফিক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘যন্ত্রটির কিছু যন্ত্রাংশ আগে ঠিক করা হয়েছিল। সেগুলোর এক বছরের ওয়ারেন্টি রয়েছে। তবে যন্ত্রটির ১২টি গ্র্যাডিয়েন্ট ইউনিটের একটি নষ্ট হয়েছে। এগুলো ওয়ারেন্টির আওতায় নেই।’

ভোগান্তিতে রোগীরা

পার্বত্য জেলা, কক্সবাজার, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীরা চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে দীর্ঘদিন পড়ে থাকে। এ কারণে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার ব্যয় বাড়ে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বেসরকারি হাসপাতালে ব্যয়বহুল পরীক্ষা করানো কঠিন হয়ে পড়ে।

ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ৩ মার্চ থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন গীতা দাশ গুপ্ত। তাঁর সেবা–শুশ্রূষা করছেন ছেলে সমীর দাশ গুপ্ত। গত রোববার হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগে এমআরআই করতে গেলে জানতে পারেন এই সেবা বন্ধ। বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে প্রায় ১৮ হাজার টাকায় এমআরআই করাতে হয়েছে তাঁকে।

এই টাকা জোগাড়ে আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতা নিতে হয়েছে বলে জানান পেশায় গাড়িচালক সমীর দাশ গুপ্ত। তিনি বলেন, ‘এত টাকা দিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর সাধ্য সবার নেই। তাই সরকারি হাসপাতালে থাকা যন্ত্রটি দ্রুত মেরামত করা দরকার। যাঁদের সামর্থ্য নেই, তাঁদের জন্য স্বল্পমূল্যে পরীক্ষার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখা উচিত।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকার নির্ধারিত মূল্যে চমেক হাসপাতালে এমআরআই পরীক্ষার খরচ পড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। তবে বাইরে বেসরকারি হাসপাতালে সেটি ৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। সেই হিসাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় খরচ অর্ধেকের কম চমেক হাসপাতালে। চমেক হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০টি এমআরআই করা হয়।

চমেকের রেডিওলজি বিভাগের প্রধান কাজী মো. আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যন্ত্রটি পুরোনো। একটি এমআরআই সম্পন্ন করতে প্রায় ৪০ মিনিট সময় লাগে। প্রতিদিন ৮ থেকে ১০টির বেশি এমআরআই করা সম্ভব হয় না। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের লোকজন দেখে গেছে মেরামতের জন্য। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানানো হয়েছে।’

চমেক হাসপাতালে বর্তমানে ২ হাজার ২০০টি শয্যা রয়েছে। একসময় এখানকার এমআরআই যন্ত্র দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০টি পরীক্ষা করা হতো। রোগীর চাপের তুলনায় তা অপ্রতুল। তবে হাসপাতালের নতুন রেডিওলজি ভবনে নতুন দুটি এমআরআই মেশিন স্থাপনের কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

রাজশাহী থেকে আসছে যন্ত্রাংশ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে চিকিৎসা যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সেন্ট্রাল মেইনটেন্যান্স কন্ট্রাক্ট (সিএমসি) চালুর নির্দেশনা দেয়। এতে যন্ত্রের মূল্য অনুযায়ী বার্ষিক সাড়ে ৬ শতাংশ হারে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ নির্ধারণ করা হয়। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের মেরামত সহজ হয়। কিন্তু চমেক এখনো এমআরআই যন্ত্রের জন্য সিএমসি করেনি বলে জানিয়েছেন মেডিটেলের কর্মকর্তারা।

সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বলছে, এমআরআই মেশিনটি সিএমসির আওতায় থাকলে যন্ত্রাংশ মেরামতে খরচ হতো না। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। কয়েক দফা বৈঠক শেষে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, ৬ শতাংশ হারে রক্ষণাবেক্ষণ খরচের বিষয়ে একমত হতে পারেনি মেডিটেল। ফলে সিএমসি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি।

চমেক হাসপাতালে বর্তমানে ২ হাজার ২০০টি শয্যা রয়েছে। একসময় এখানকার এমআরআই যন্ত্র দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০টি পরীক্ষা করা হতো। রোগীর চাপের তুলনায় তা অপ্রতুল। তবে হাসপাতালের নতুন রেডিওলজি ভবনে নতুন দুটি এমআরআই মেশিন স্থাপনের কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি অকেজো এমআরআই মেশিন আছে। সেখানে এই যন্ত্রাংশটি ভালো। সেই যন্ত্রাংশটি এখানে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেহেতু সরকারি মেশিন থেকে আনা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে ব্যয় হবে না।’