বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে তিনি একটি ব্যতিক্রমী নাম। বীরপ্রতীক, বিপিএম ও রাইফেল পদক একসঙ্গে এই তিনটি রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়া সেনাবাহিনীর একমাত্র অফিসার তিনি। কিন্তু পদক আর খেতাবের চেয়েও বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনের এক নিষ্ঠুর অধ্যায়; দুই দফায় গুম, আয়নাঘরের অন্ধকার কুঠুরিতে অমানবিক নিপীড়ন এবং সব কিছু হারিয়েও নাভাঙার গল্প। তিনি অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান। ফ্যাসিবাদী শাসনের সবচেয়ে আইকনিক ভুক্তভোগীদের একজন। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা এক ফিনিক্স পাখি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, আবিদ আজম।
এশিয়া পোস্ট: শুরুতে আপনার বেড়ে ওঠার গল্প জানতে চাই। একজন সাধারণ বাঙালি তরুণ থেকে সেনাবাহিনীর পদকজয়ী অফিসার হয়ে ওঠার পথটা কেমন ছিল?
হাসিনুর রহমান: বাঙালি চরিত্র নিয়ে আমার একটা নিজস্ব দর্শন আছে। আমরা ঔরসগতভাবে সাহসী জাতি নই পরিস্থিতিই আমাদের সাহসী করে তোলে। যারা সমুদ্রে মাছ ধরেন, সীমান্তে বাস করেন, প্রতিদিন জীবনকে বাজি রাখেন তাঁরাই সত্যিকারের সাহসী। জেলেপাড়ায় গেলে দেখবেন, বাবা হারিয়ে গেছেন সমুদ্রে তবু পরিবার একদিন কাঁদে, তারপর আবার উঠে দাঁড়ায়। জীবনের সঙ্গে এই গভীর পরিচয়ই মানুষকে শক্তিশালী করে। আমার বেড়ে ওঠা কুমিল্লায়, মডার্ন স্কুলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তাম। সেই বয়সেই দেশভাগের যন্ত্রণা, যুদ্ধের গন্ধ অনুভব করেছি। পরে বরিশালে রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল, তারপর ঢাকার নটরডেম কলেজ। ১৯৮২ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দিই, ১৯৮৪ সালে কমিশন পাই। প্রশিক্ষণ চলাকালেই খবর পেলাম পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনীর সঙ্গে লড়াই চলছে, তরুণ অফিসাররা মারা যাচ্ছেন। আমার প্লাটুন কমান্ডার হিলট্যাক্সে যাওয়ার কথা বললেন। আমি রাজি হলাম।
এশিয়া পোস্ট: পার্বত্য চট্টগ্রামের অভিজ্ঞতা আপনাকে কীভাবে রূপান্তরিত করেছে? সেখানে কী দেখেছিলেন?
হাসিনুর রহমান: হিলট্যাক্সে গিয়ে যা দেখলাম তা প্রশিক্ষণের সঙ্গে মেলে না। ভিয়েতনামের ছনের ঘরের মতো আমাদের আবাসন, চারপাশে গভীর অরণ্য, প্রতিদিন গুলির শব্দ। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফরহাদ, মেজর ওমর, ফারুক আমরা কয়েকজন ছিলাম খুব সক্রিয়। 'কবে অপারেশন' বলে কিছু ছিল না প্রতিদিনই অপারেশন। হেডকোয়ার্টারকে না জানিয়েও বেরোতাম। সেখানে বুঝলাম, শুধু ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে মানুষকে এক করা যায় না। মনুষ্যত্ব, মানবতা, সমমর্যাদা এগুলোই প্রকৃত বন্ধন। এক পতাকার নিচে সবার বসবাসের যে স্বপ্ন, সেটাই আমার জীবনদর্শন হয়ে উঠল। পরে জানলাম, ১৯৭২ সালের ২৯ এপ্রিল মিজোরাম সীমান্তে ভারত চাকমা অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট তৈরি করে দেয়। শান্তিবাহিনীকে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রশিক্ষণ দেয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে। আমাদের কাছে সব দলিল আছে। এই ষড়যন্ত্রের কারণেই আমাদের বহু তরুণ অফিসার প্রাণ হারিয়েছেন, অগণিত বাঙালি মারা গেছেন। শহীদ জিয়া বুদ্ধিমানের কাজ করেছিলেন ভূমিহীন বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করে। বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটা ছিল একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ।
এশিয়া পোস্ট: ২০০৮ সালে র্যাবে কর্মরত থাকাকালীন আপনাকে আওয়ামী লীগকে বিশেষ সুবিধা দিতে বলা হয়েছিল। সেই ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাই।
হাসিনুর রহমান: আট সালের শুরুতেই আমাকে পরিষ্কার বলা হলো আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসবে, আমি যেন পূর্ণ সহযোগিতা করি। কিন্তু আমার চরিত্রে এই জিনিস নেই। আমি কারণ ছাড়া পাহাড়ে ঘুরি, নদীতে সাঁতার কাটি, পাহাড়িদের বাড়িতে ভাত খাই এই আমি কী করে ভারতের র'এর সহযোগী হব? সেনাবাহিনীতে একটা কৌশল দেখেছি প্রথমে একটা ছোট অপকর্ম করিয়ে নাও, তারপর সেটা দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করো। মিরপুর ডিওএইচএসে কর্নার প্লট নেওয়ার প্রস্তাব এলো। বলা হলো শুধু একটা সই করো, ত্রিশ লাখ টাকা পাবে। আমার স্ত্রী বললেন না। আমি বললাম স্যার, মিথ্যা কথা লিখতে হবে। মুখে মিথ্যা বলা হয়তো হয়ে যায়, কিন্তু লিখে মিথ্যা বলা কঠিন। বললেন, জেনারেল হারুন নিয়েছেন, আমি নিয়েছি, তুমি নেবে না কেন? আমি নিলাম না। এই একটা সিদ্ধান্তের জন্যই আজ আপনার সামনে সরাসরি কথা বলতে পারছি। ওই সুবিধা নিলে আমার গলা বন্ধ হয়ে যেত চিরকালের জন্য। কথা না শোনার শাস্তি হিসেবে ২০০৮এর সেপ্টেম্বরে আমাকে চট্টগ্রাম র্যাব থেকে ময়মনসিংহে পোস্টিং দেওয়া হলো।
এশিয়া পোস্ট: ২০১১ সালে প্রথমবার গুম হওয়ার আগে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল?
হাসিনুর রহমান: ২০০৯ সালে হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর বিডিআর হত্যাকাণ্ড ঘটে। তখন থেকেই আমরা বলছিলাম এর পেছনে ভারত জড়িত, তাপস পাল জড়িত। এই কথা বলার কারণে আমাদের মতো অফিসারদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা শুরু হয়। কিন্তু বীরপ্রতীক, বিপিএম আর রাইফেল পদকধারী একজন অফিসারকে গায়েব করার জন্য অজুহাত দরকার ছিল। ২০১০ সালে যখন খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের করে দেওয়া হলো, আমি প্রকাশ্যে বললাম এটা মেনে নেওয়া যায় না। আদালতে সাক্ষী দিলাম। মেজর জাহিদকে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে যেভাবে ষোলটি গুলি করে হত্যা করা হলো তার বিরুদ্ধেও সোচ্চার হলাম। এই কারণগুলোই আমাকে টার্গেট করল।
এশিয়া পোস্ট: প্রথমবার গুমের ঘটনাটি কীভাবে ঘটল? কী ছিল সেই অভিযোগ?
হাসিনুর রহমান: রাতে অফিসে কাজ করছিলাম। ডিজিএফআইএর কর্নেল মইন এবং মেজর জিয়াউল আহসান দীর্ঘদিন ধরে আমার ওপর নজর রাখছিল। আমার বাসায় তখন নাইখ্যংছড়ির একটি মেয়ে থাকত একসময় কাজের মেয়ে হিসেবে এসেছিল, আমার মেয়েদের সঙ্গে পড়াশোনা করত। তার পরিবার বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজছিল, সে মাঝে মাঝে সিটিসেলে পরিবারের সঙ্গে কথা বলত। জিয়াউল আহসান ধরে নিল আমি ময়মনসিংহ থেকে নাইখ্যংছড়িতে কথা বলছি যে কলগুলো মক্কা, কুয়ালালামপুর, করাচিতে যাচ্ছে। ওই প্রান্তে কে কথা বলছে সেটাই যাচাই করল না তারা। উল্টো একটি বিশাল রিপোর্ট তৈরি হলো আমি নাকি পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে মিলে অভ্যুত্থান ঘটাব। সাত দিন পর বুঝল ভুল হয়েছে। কিন্তু ততদিনে আমাকে হাতকড়া লাগিয়ে, চোখ বেঁধে মেঝেতে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তিনটি রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলকে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ৪৩ দিন এভাবে আটক রাখা হলো। আমি যে দেশের জন্য এতকিছু করলাম, সেই দেশে আমার প্রতি এই ব্যবহার। লজ্জা লাগে না কি?
এশিয়া পোস্ট: আয়নাঘরের অভিজ্ঞতা জানাবেন।
হাসিনুর রহমান: সবচেয়ে খারাপ কক্ষটি আমার জন্য বরাদ্দ ছিল। আয়নাঘরে দুটো কমপ্লেক্স আছে পুরনো আর নতুন। পুরনোটা প্রশস্ত, গরম কম। আমাকে রাখা হলো নতুন কমপ্লেক্সে চার ইঞ্চি পাতলা দেয়ালের একটা ঘুপচি কুঠুরিতে। এসি নেই, ভ্যাপসা গরম। মানুষ থাকার উপযুক্ত নয় এটা।
পাশে দুটো বড় এগজস্ট ফ্যান সারাক্ষণ চলত এতটাই কাছে যে কানের কাছে অবিরাম একটা কর্কশ শব্দ। আজও আমার কান পরিষ্কার শুনতে পায় না। ছেঁড়া গেঞ্জি, অন্যের ব্যবহার করা গামছা, ছারপোকার উপদ্রব এই ছিল একজন রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সেনা অফিসারের প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতা।
কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের যেটা বললাম সেটা নয়। দেওয়ালে রক্তের চিহ্ন দেখলাম নখ কেটে, একটু একটু করে আঁকা। নামের পাশে ফোন নম্বর। কেউ হয়তো ভেবেছেন কোনো একদিন কেউ এই দেওয়াল পড়বে, তার প্রিয়জনকে জানাবে। এই নিঃসঙ্গ আর্তি দেখে বুকের ভেতরটা ভেঙে গেল। রাতে ঘুম নেই গরম, ছারপোকা, অন্য কক্ষ থেকে চিৎকার, কান্নার শব্দ। মানুষ কতটা অসহায় হলে এভাবে বাঁচে, সেটা না দেখলে বোঝা যায় না।
এশিয়া পোস্ট: পরিবারের উপর কী প্রভাব পড়েছিল? সেই সময়ের কথা বলুন।
হাসিনুর রহমান: এটাই আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট। আমার তিনটি মেয়ে। আমাকে গুম করার পর ইচ্ছাকৃতভাবে একের পর এক গুজব ছড়ানো হলো। প্রথমে বলা হলো আমাকে পাগল বানিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, আমি ঢাকার কোনো গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমার মেয়েরা রাস্তায় পাগল দেখলে কাছে গিয়ে দেখত বাবা কিনা। গাড়ি থামলে ছুটে যেত। কলিং বেল বাজলে দৌড়ে দরজায় যেত। তারপর বলা হলো ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারপর বলা হলো মেরে ফেলা হয়েছে। আমার মা আমার বোনের বাড়িতে চলে গেলেন মোহাম্মদপুরে। আমার স্ত্রী মানতে রাজি ছিলেন না তিনি ঘুরতে থাকলেন, খুঁজতে থাকলেন। এই পুরো নাটক পরিচালনা করছিল জিয়াউল আহসানের বোনের ছেলে 'আপন'। সে আমার বোনের কাছ থেকে টাকাও নিয়েছে বলেছে ছেড়ে দেওয়া হবে। এই মানসিক নির্যাতন শুধু আমার ওপর নয়, পুরো পরিবারের ওপর চালানো হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে, নিষ্ঠুরভাবে। এই কষ্টের কথা বলতে গেলে আজও গলা আটকে আসে। কোন সন্তান চাইবে বাবাকে এভাবে খুঁজতে?
এশিয়া পোস্ট: ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার গুম হওয়ার প্রেক্ষাপট কী ছিল?
হাসিনুর রহমান: প্রথম দফায় গুম থেকে ফেরার পর জেলখানায় ছিলাম চার বছর তিন মাস। বিচার হয়েছিল গোপালগঞ্জের অফিসার দিয়ে যাঁরা প্রমোশন পাবেন বলে তোষামোদ করতে রাজি ছিলেন। একটিও সাক্ষী আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়নি। তারপরও জোর করে জেলে পাঠানো হলো।
জেলে থাকাকালীন আমাকে মারার চেষ্টা হয়েছে। জেএমবি নেতা শায়খ আব্দুর রহমানের ছেলে নাবিলকে আমার সেলের পাশে রাখা হয়েছিল। নাবিল বলেছিল আমি আপনাকে হত্যা করব। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে রাখা হয়েছিল যাতে তারা আমাকে মেরে ফেলে। জেল থেকে বেরিয়ে আমার কণ্ঠ আরও সোচ্চার হলো। আয়নাঘর নিয়ে লিখলাম, বললাম। ডিজিএফআইকে 'কসাই' বললাম প্রকাশ্যে। হাসিনার আমলে ২০২২ সালে এই কথাগুলো বলার সাহস কতটুকু লাগে, ভেবে দেখুন। ২০১৮ সালের আগস্টে রাত দশটায় বাসা থেকে কিডন্যাপ করা হলো। আমার হাতে লাইসেন্সকৃত রিভলভার ছিল। ভিডিও ফুটেজ বের হলো, পত্রিকায় এলো, জিডি হলো। তারপরও সরকার বলল আমি স্বেচ্ছায় গুম। হোম মিনিস্টার বললেন, আমি স্বেচ্ছায় গুম। আমাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার আগের দিন রাতে পুলিশের দুই অফিসার বাড়িতে এসে আমার স্ত্রীকে ভয় দেখিয়ে গেছে।
এশিয়া পোস্ট: দ্বিতীয় দফায় কতদিন আটক ছিলেন? কী চাওয়া হয়েছিল আপনার কাছে?
হাসিনুর রহমান: এক বছর ছয় মাস চোদ্দ দিন। শেষ চোদ্দ দিন বারবার অনুরোধ করা হচ্ছিল 'আপনি চাইলে ছেড়ে দেব।' আমি রাজি হইনি। বললাম তোমরা এনেছ, তোমাদের ব্যাপার। ছাড়তে চাইলে ছাড়ো, কিন্তু আমি কোনো রিকোয়েস্ট করব না। আমার কাছে চাওয়া হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে মেনে নিতে। বলতে হবে এটা আমি বিশ্বাস করি। আমি সাফ বললাম না। এটা আমি বিশ্বাস করি না, সুতরাং বলব না। আমার আল্লাহ সাক্ষী, জেনারেল মতিনকে উদ্ধৃত করে বলেছি ২২ মার্চ ১৯৭১ সালে শেখ মুজিব নিজেই সেনা অফিসারকে বলেছিলেন ঢাকা ছেড়ে করাচিতে চলে যেতে। ২৫ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা কীভাবে তাঁর? যাকে মুখে মিথ্যা বলতে রাজি করানো যায়নি, তাকে আয়নাঘরেও নোয়ানো যায়নি।
এশিয়া পোস্ট: আয়নাঘরের অবস্থান আপনি কীভাবে শনাক্ত করলেন? এটা জানা কি বিপজ্জনক ছিল?
হাসিনুর রহমান: গাড়ি যখন চলছিল, বুঝলাম বেশি দূরে যাচ্ছি না ক্যান্টনমেন্টের মধ্যেই থাকব, বড়জোর গুলশান পর্যন্ত যেতে পারে। মসজিদের আজানের শব্দ শুনলাম ধরনটা চেনা লাগল। একদিন সুযোগ পেয়ে বাথরুমের কমোডের ওপর দাঁড়িয়ে উঁকি মারলাম। একটা পুরনো ভবন দেখলাম। মিলে গেল। ১৯৯০ সালে মিলিটারি পুলিশে কর্মরত থাকাকালীন আমার বাসা ছিল মাত্র একশো গজ দূরে। ম্যাচভিতে প্রায়ই যেতাম, পেছনের যে গেট দিয়ে রাতে বের হতাম সেটাই ছিল আয়নাঘরের গেট। চেনা জায়গা, ভুল করার সুযোগ নেই। তারপর ভেতরের একজনের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করলাম। ধীরে ধীরে নিশ্চিত হলাম। মুক্তির পরদিনই বললাম ব্রিগেডিয়ার আজমী ভেতরে আছেন। তাঁর ভাইকে বললাম, আলজাজিরাকে বললাম, তাসলিম খলিলকে বললাম। হাসিনার শাসনকালে ডিজিএফআইএর বিরুদ্ধে, আয়নাঘরের বিরুদ্ধে মুখ খোলা মানে নিজেকে আবার বিপদে ফেলা। তবু বললাম।
এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্ট ২০২৪এর পর আয়নাঘর মুক্তির ঘটনায় আপনার ভূমিকা কী ছিল? সেই রাতের কথা বলুন।
হাসিনুর রহমান: পাঁচ তারিখ বিকেলে যখন বুঝলাম পরিবর্তন আসছে, প্রথম মাথায় এলো আজমী স্যারকে মেরে ফেলবে। নিয়ম মেনেই মারবে, কোনো আলামত রাখবে না। সাড়ে তিনটার দিকে নভোথিয়েটারের পাশের মোড়ে ছিলাম। বিকেল পাঁচটায় প্রথম লাইভ করলাম আজমীকে ছাড়তে হবে, এখনই। তারপর নয়জনের একটি দল নিয়ে তিনটি মোটরসাইকেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসিরের বাসায় গেলাম। তাঁকে বোঝালাম। তিনিও লাইভে বললেন সাত থেকে আটটার মধ্যে ছাড়তে হবে। রাত আটটার দিকে আয়নাঘরের সামনে গিয়ে বসলাম। সেনা অফিসাররা একে একে এলেন। অনেকে ভয়ে আসেননি। যারা এলেন তাঁরা সাহস করেই এলেন। রাত একটা পর্যন্ত বাইরে ছিলাম। সেই রাতে বহু মানুষ জীবন ফিরে পেলেন। মুসলমান হিসেবে, মানুষ হিসেবে এটুকু করা আমার দায়িত্ব ছিল। এর বেশি কিছু চাইনি।
এশিয়া পোস্ট: গুমের তদন্ত কমিশন ভারতের সম্পৃক্ততার কথা বলেছে। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
হাসিনুর রহমান: একদম সঠিক। এই গুমের সংস্কৃতিটা ভারত থেকেই এসেছে, ভারতই আমাদের দিয়ে এটা প্রাকটিস করিয়েছে। ক্রসফায়ার হলে জানাজানি হয়ে যায়। কিন্তু গুম হলে কেউ জানে না পরিবার দিশেহারা, সমাজ চুপ, মিডিয়া ভয়ে নীরব। আর যাকে ছেড়ে দেওয়া হয় তার গায়ে জঙ্গি মামলা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়, সারাজীবনের জন্য পঙ্গু করা হয়। ভারত চেয়েছিল এই দেশে এমন একটা পরিবেশ তৈরি হোক যেখানে কেউ সত্য কথা বলার সাহস না পায়। আওয়ামী লীগ সেই কাজ দক্ষতার সঙ্গে করেছে। ডিজিএফআই ছিল তার হাতিয়ার।
এশিয়া পোস্ট: সেনাবাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থায় কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন?
হাসিনুর রহমান: সবচেয়ে জরুরি হলো সংবিধানের ৪৫ অনুচ্ছেদ বাতিল করা। এই অনুচ্ছেদ একজন সেনা সদস্যকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার অধিকার নেই। ব্রিটিশ ভারতেও এটা ছিল না, ব্রিটেনেও নেই। এই আইন থাকলে কোনো অফিসারের পক্ষে অন্যায় আদেশ অমান্য করা সম্ভব নয়। আমরা ব্রিগেডিয়ার হাসান নাসিরসহ বহুবার বলেছি। ডিজিএফআই ও এনএসআইকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এই সংস্থাগুলো দেশের, কোনো দলের নয়। তাদের কাজ একশো বছর সামনে দেখা দেশটা কোথায় যাচ্ছে, কোথায় নিয়ে যেতে হবে। পদোন্নতি হতে হবে যোগ্যতা আর দেশপ্রেমের ভিত্তিতে মন্ত্রীএমপির তদবিরে নয়। সেনাপ্রধান জানেন কে পদোন্নতির যোগ্য তিনি লিখে দেবেন, রাষ্ট্রপতি অনুমোদন করবেন। এই সরল নিয়ম মেনে চললেই বদলে যায় পুরো সংস্কৃতি। পুলিশ সংস্কারেও একই কথা রাজনীতিবিদ পুলিশকে দলীয় কাজে ব্যবহার করতে পারবেন না। আইনের বাইরে কোনো আদেশ মানতে পুলিশ বাধ্য নয়, এই নিশ্চয়তা আইনে থাকতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: ৭১ ও ২৪ এই দুটি ঐতিহাসিক মুহূর্তকে আপনি কীভাবে দেখেন? অনেকে এ দুটিকে মুখোমুখি দাঁড় করান।
হাসিনুর রহমান: মুখোমুখি নয়, এ দুটি আসলে একে অপরের পরিপূরক। ৪৭ হয়েছিল বলে ৫২ এলো। ৫২ এলো বলে ৭১ এলো। আর ৭১এর যে স্বপ্ন অধরা রয়ে গিয়েছিল, ২৪ সেই স্বপ্নকে নতুন করে জাগিয়েছে। ৭১ আমাদের মানচিত্র দিয়েছে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড। ২৪ দিয়েছে মূল্যবোধ, মানবিক মর্যাদা, নৈতিক অধিকার। ৭১এর আগে আমরা ছিলাম প্রজা। ২৪এর পর আমরা সত্যিকার অর্থে নাগরিক হওয়ার দাবি করতে পারছি।
দুটো মিলে তবেই পূর্ণ হয় একটি দেশের স্বাধীনতার অর্থ। যে বিপ্লব মানচিত্র দিয়েছে, আর যে বিপ্লব মানুষকে মানুষের মর্যাদা দিতে চাইছে এই দুটো শত্রু নয়, সহযাত্রী।
এশিয়া পোস্ট: ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী? এই প্রজন্মের কাছে কী বলতে চান?
হাসিনুর রহমান: স্বপ্নটা খুব জটিল নয়। কৃষক মাঠে যাবেন, জেলে সমুদ্রে যাবেন কিন্তু তাঁদের মর্যাদা থাকবে। প্রবাসী শ্রমিক যিনি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মূল উৎস, তিনি লালগালিচা সংবর্ধনা পাবেন। গার্মেন্টস শ্রমিক, যার হাতের পরিশ্রমে দেশের রপ্তানি আয়, তাঁর মানসম্মান নিশ্চিত হবে। রাজনীতিবিদ জনগণের কাছে যাবেন এসি ডাইনিং টেবিলে নয়, মাঠের আলে বসে। রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করবেন তোমার কী দরকার? জেলেকে জিজ্ঞেস করবেন কী করলে তোমার সুবিধা? এটুকুই তো রাজনীতির মূল কাজ। আর সবচেয়ে বড় কথা শিশু যখন দুই বছর বয়স থেকে শিখবে মিথ্যা বলা যাবে না, ঘুষ হারাম সেদিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এই দেশ বদলে যাবে। জুলাই বিপ্লবে যারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েছেন আবু সাইদ, ওয়াসিমসহ সেই সাহসী তরুণদের বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দেওয়া উচিত। তারা এই দেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার প্রকৃত নায়ক। দেশ ঠিক করা আসলে কোনো কঠিন কাজ নয়। শুধু দরকার সৎ নেতৃত্ব, দেশপ্রেমের ন্যূনতম অঙ্গীকার, আর জনগণের প্রতি সত্যিকারের দায়বদ্ধতা। আমরা হতাশ নই আমরা স্বপ্ন দেখি।