Image description

মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনার প্রভাব ধীরে ধীরে বাংলাদেশের শিল্প ও জ্বালানি খাতে চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় দেশে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি ব্যবহারে রেশনিং শুরু করেছে, বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়েছে এবং বিকল্প উৎস থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংগ্রহের উদ্যোগ জোরদার করেছে।

জ্বালানি খাত বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না— শিল্প ও উৎপাদন খাতেও তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

শিল্প উদ্যোক্তাদেরও একই ধরনের আশঙ্কা। তারা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে শিল্প উৎপাদন ধীর হয়ে যাবে এবং রফতানি খাতও চাপের মুখে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সরাসরি তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না। তবে জ্বালানি সংকট তৈরি হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’’

তার মতে, সরকার যদি বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানি করে এবং তার প্রভাব শিল্প খাতে পড়ে, তাহলে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এ অবস্থায় জ্বালানি আমদানির ওপর বিদ্যমান শুল্ক, কর ও ভ্যাট সাময়িকভাবে কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার নাগরিকদের জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ কমানো, ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার এবং কার-পুলিং ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বাসাবাড়িতে গ্যাসের অপচয় কমানো এবং সরকারি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল ও তরল জ্বালানি এই প্রণালির মধ্য দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে কোনও ধরনের সামরিক সংঘাত বা অবরোধ তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশেও, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কার্যক্রম এবং পরিবহন খাতের বড় অংশই আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।

বিকল্প সমুদ্রপথে বাড়তি সময় ও ব্যয়ের চাপ আরএমজি রফতানিতে

মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর অঞ্চলের অস্থিরতার প্রভাবে গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সমুদ্রপথে তৈরি পোশাক (আরএমজি) রফতানিতে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমমুখী বাজারে পাঠানো বেশিরভাগ চালান এখন আফ্রিকা ঘুরে কেপ অব গুড হোপ রুট ব্যবহার করে পাঠাতে হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমই’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘২০২৩ সালের শেষ দিক এবং ২০২৪ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশের প্রায় সব পশ্চিমমুখী সমুদ্রপথের আরএমজি চালান এই বিকল্প রুটে পরিবহন করা হচ্ছে। ফলে পণ্য পরিবহনে আগের তুলনায় গড়ে ১০ থেকে ১৫ দিন বেশি সময় লাগছে। একইসঙ্গে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়ও।’’

তিনি বলেন, ‘‘এই অতিরিক্ত সময় কোনও নতুন বিলম্ব নয়। গত প্রায় দুই বছর ধরেই এই সময় বৃদ্ধি কার্যত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে যে ১০ থেকে ১৫ দিনের বাড়তি সময়ের কথা বলা হচ্ছে, তা মূলত ২০২৩-২০২৪ সাল থেকেই বিদ্যমান।’’

রফতানিকারকদের মতে, এই দীর্ঘ রুট ব্যবহারের কারণে সাপ্লাই চেইনে আগে থেকেই অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন করে কোনও জটিলতা বা অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে এই বিদ্যমান চাপের সঙ্গে যুক্ত হবে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, তৈরি পোশাক খাত আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পরিবহন সময় বেড়ে গেলে উৎপাদন পরিকল্পনা, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং ক্রেতাদের সঙ্গে সমন্বয়ে বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

এ ছাড়া দীর্ঘ সমুদ্রপথ ব্যবহার করার কারণে জাহাজ ভাড়া, বিমা খরচ এবং সামগ্রিক লজিস্টিক ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে—যা শেষ পর্যন্ত রফতানিকারকদের ব্যয় কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। তবে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন কোনও অস্থিরতা তৈরি হলে তা ধীরে ধীরে বিদ্যমান বিলম্ব ও ব্যয়ের চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে রফতানিনির্ভর এই খাতের জন্য সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিশীল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, পরিস্থিতির প্রভাব মোকাবিলায় ইতোমধ্যে পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি তেলের বরাদ্দ প্রায় ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সিলেটের শাহজালাল সার কারখানা ছাড়া বেশিরভাগ সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, এই পদক্ষেপগুলো মূলত জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয় নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া হয়েছে, যাতে সরবরাহ পরিস্থিতি আরও খারাপ হলেও জরুরি খাতে জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখা যায়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের সীমিত সরবরাহ বজায় থাকলে শিল্প উৎপাদনের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

এরই মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পেট্রোবাংলার সূত্র জানিয়েছে, মার্চ মাসে বাংলাদেশে মোট সাতটি এলএনজি কার্গো আসার কথা ছিল। এর মধ্যে কাতার থেকে ছয়টি এবং এঙ্গোলা থেকে একটি কার্গো আসার কথা। তবে কাতার দুটি কার্গো সরবরাহ করতে পারবে না বলে জানিয়েছে।

এই ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে, যেখানে দাম স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গানভোর এশিয়া ও ভাইটাল এশিয়ার কাছ থেকে দুটি এলএনজি কার্গো কিনেছে। আগামী ১৫ ও ১৮ মার্চের মধ্যে এসব কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, একটি কার্গোর দাম পড়েছে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ ডলারের বেশি এবং অন্যটির দাম প্রায় ২৪ ডলার। অথচ কয়েক দিন আগেও স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম ছিল ১০ ডলারের নিচে। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে এলএনজির দাম প্রায় আড়াই গুণ বেড়ে গেছে।

জানা গেছে, কাতারের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার পর বিশ্ব এলএনজি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে বাধ্য হয়েই বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহের সবচেয়ে বড় উৎস কাতার। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এলএনজি কার্গো আসে দেশটি থেকে। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে কাতার এনার্জি কয়েকটি চুক্তিতে ‘ফোর্স মেজোর’ ধারা কার্যকর করেছে। এই ধারার আওতায় বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনও প্রতিষ্ঠান আইনি দায় ছাড়াই সাময়িকভাবে পণ্য সরবরাহ বন্ধ রাখতে পারে। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, ২ মার্চ কাতার এনার্জি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।

চলতি বছরে বাংলাদেশ মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০টি কার্গো সরবরাহ করার কথা কাতারের। ফলে দেশটির সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা শুরু করেছে সরকার। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়া থেকেও এলএনজি সংগ্রহের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনও জানিয়েছে, যেসব দেশের সঙ্গে সরকারিভাবে জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি রয়েছে, তাদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত কার্গো আনার চেষ্টা চলছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ৯ দিনের। অকটেনের মজুত রয়েছে প্রায় ১৫ দিনের এবং ফার্নেস অয়েলের মজুত রয়েছে প্রায় ৬০ দিনের। কয়েক সপ্তাহ আগেও ফার্নেস অয়েলের মজুত ছিল প্রায় ৯৩ দিনের।

সরবরাহ পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় অস্বাভাবিক থাকলে এই মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।