Image description
মধ্যপ্রাচ্য সংকট

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ শীর্ষ সামরিক কমান্ডারের নিহতের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্র্যাটেজি’ বা নেতৃত্বশূন্য করার কৌশলের জবাবে ইরান তার সব শক্তি দিয়ে পাল্টা আঘাত শুরু করেছে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আবহে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই যুদ্ধ কি কেবল কয়েক দিনের সীমিত সংঘাত, নাকি এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন আর যুদ্ধ এড়ানোর পুরোনো কৌশলে নেই। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের ‘সংশয়হীনতা’ তৈরি হয়েছে। ইরান বুঝতে পেরেছে, যুদ্ধ কোনো আসন্ন হুমকি নয়; বরং তারা এরই মধ্যে একটি চলমান যুদ্ধের আবর্তে নিমজ্জিত। ইরানের জেনারেলরা এখন বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই আধিপত্য চূর্ণ করার একমাত্র উপায় হলো যুদ্ধকে তাদের ‘কমফোর্ট জোন’ থেকে বের করে আনা। অর্থাৎ, দ্রুত ও নিয়ন্ত্রিত সামরিক অভিযানের পরিবর্তে একে এমন এক দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে রূপান্তর করা, যার ব্যয়ভার বহন করা ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন যদিও শক্তি প্রদর্শনে দ্বিধাহীন, তবুও তারা একটি অনির্দিষ্টকালের ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে কতটা আগ্রহী, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে খামেনির মৃত্যুর পর এই লড়াই ইরানের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ইরানি প্রবাদ ‘একবারই মৃত্যু, একবারই বিলাপ’—এর মর্মার্থ ধারণ করে দেশটি এখন একটি ‘সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধে’র ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে লড়াই থামানোর ইঙ্গিত না মিললে এই সংঘাত এক দীর্ঘ ও নারকীয় যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে।

 

যুদ্ধের নতুন সমীকরণ ও ইরানের রণকৌশল: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রয়াণ দেশটির ক্ষমতার কাঠামোতে বড় ধাক্কা দিলেও তেহরান কয়েক দশক ধরে এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল এক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি আইআরজিসি, আলেম সমাজ এবং আধা-সামরিক বাহিনীর এক বহুমাত্রিক জাল। সিএনএন ও আলজাজিরার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটগুলোকে ভৌগোলিকভাবে ছড়িয়ে রেখেছে এবং মাটির গভীরে বিশাল সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা নেতৃত্বশূন্যতার পরও অভিযান সচল রাখতে সক্ষম।

ইরানের বর্তমান কৌশলের মূল ভিত্তি হলো ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’। সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র শ্রেষ্ঠ হলেও, ইরান তার বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি পাল্টে দিতে চায়। খামেনির মৃত্যুর পর দেওয়া এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছিল, ‘তারা যদি এবার যুদ্ধ শুরু করে, তবে তা হবে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ।’ এ বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়। যদিও সৌদি আরব বা কাতার এ হামলায় সরাসরি অংশ নেয়নি, তবুও তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ইরান প্রমাণ করতে চাইছে যে, পুরো অঞ্চল এখন একটি আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

দীর্ঘ যুদ্ধের পথে অর্থনৈতিক ও সামরিক সীমাবদ্ধতা: যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পথে ইরানের সবচেয়ে বড় বাধা তার ভঙ্গুর অর্থনীতি। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে ইরানের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে, তা দেশটির মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রা বাজারকে পঙ্গু করে দিয়েছে। একটি দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ-তীব্রতার যুদ্ধ পরিচালনার জন্য যে বিশাল আর্থিক সংস্থান প্রয়োজন, তা জোগান দেওয়া তেহরানের জন্য কঠিন হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হলে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয় হলে ইরানে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

সামরিক দিক থেকেও ইরানের কিছু স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক স্টেলথ ফাইটার এবং বিমান শ্রেষ্ঠত্বের বিপরীতে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পুরোনো আমলের বিমানবাহিনী কতক্ষণ টিকবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে ইরানের সুবিধা হলো তার ‘সহনশীলতা’। পশ্চিমা দেশগুলো যেখানে সামান্য ক্ষয়ক্ষতিতেই জনমতের চাপে পিছু হটতে বাধ্য হয়, সেখানে ইরান দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিক সক্ষমতা রাখে। এই ‘অপ্রতিসম রেজল্যুশন’ বা সংকল্পের কারণেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অন্তহীন যুদ্ধের জালে আটকাতে চায়।

উপসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ ও বৈশ্বিক প্রভাব: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বিপর্যয় ডেকে আনবে। বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ অবরুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। এর ফলে এশীয় দেশগুলো, বিশেষ করে চীন ও ভারত তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর সংগঠন জিসিসির মধ্যেও এই যুদ্ধ বিভাজন তৈরি করতে পারে। কাতার ও ওমান ঐতিহাসিকভাবে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখতে চাইলেও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিরক্ষা ও দমনের নীতিতে বিশ্বাসী। একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এই দেশগুলোকে বাধ্য করবে যে কোনো এক পক্ষ বেছে নিতে। এর ফলে ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন থমকে যেতে পারে।

রাশিয়ার ভূমিকা ও ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠন: বিভিন্ন থিঙ্কট্যাঙ্ক রিপোর্ট অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিতে পারে রাশিয়া। মস্কো এই সুযোগে ওই অঞ্চলে তাদের অস্ত্র বিক্রি বাড়াতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ইউক্রেন থেকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিবদ্ধ করতে প্ররোচিত করতে পারে। চীনের জন্যও এই যুদ্ধ একটি সুযোগ হতে পারে নিজেকে ‘শান্তি রক্ষাকারী’ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার, যা গত কয়েক বছর ধরে বেইজিং অত্যন্ত নিপুণভাবে করে আসছে।

অনিশ্চয়তার হাতছানি: পরিশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বর্তমান সংঘাত সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়; বরং এটি অস্তিত্ব এবং সংকল্পের লড়াই। ইরান যদি তার ‘একবারই মৃত্যু’র দর্শনে অটল থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি আলোচনার পরিবর্তে চূড়ান্ত সামরিক সমাধানের পথে হাঁটে, তবে এই যুদ্ধ কেবল তেহরান বা তেল আবিবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হবে, যা মার্কিন বৈশ্বিক আধিপত্যের পতনকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

যুদ্ধের এই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের সামনে এখন দুটি পথ খোলা—হয় ইরানের সঙ্গে একটি নতুন পারমাণবিক সমঝোতায় আসা, অথবা এমন এক আঞ্চলিক যুদ্ধের নরকে ঝাঁপ দেওয়া যার শেষ কোথায় বা কখন, তা কারও জানা নেই। সূত্র: সিএনএন, আলজাজিরা, ইন্ডিয়া টুডে ও রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটস।