দুই দিনের এক ঐতিহাসিক ইসরাইল সফর শেষ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) তেল আবিবে পৌঁছালে তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা এবং উষ্ণ আলিঙ্গনের মাধ্যমে স্বাগত জানান ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সফরটি কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নয়, বরং দুই দেশের অংশীদারিত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছে।
মোদির এই সফরকে নেতানিয়াহু ‘দুই প্রাচীন জাতির সত্য বন্ধুত্ব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে এই বন্ধুত্বের মোড়কটি যতটা না দ্বিপাক্ষিক চুক্তির, তার চেয়েও বেশি আদর্শিক। বিশেষ করে নেতানিয়াহুর স্ত্রী সারা নেতানিয়াহুর পোশাকে হিন্দুত্বের প্রতীক ‘গেরুয়া’ রঙের উপস্থিতি এই বার্তাই দেয় যে, দুই নেতাই নিজেদের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের রক্ষক হিসেবে জাহির করতে চান।
নেতানিয়াহুর ইসরাইল নিজেকে বিশ্বের সমস্ত ইহুদির জন্য একটি ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে দাবি করে, আর মোদির ভারত হিন্দু জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে হিন্দুদের সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দুই দেশে আদতে কারা নিরাপদ?
ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান সহিংসতা এবং গাজায় মানবিক বিপর্যয় প্রমাণ করে যে, এই পবিত্র ভূমিতে ফিলিস্তিনিদের কোনো নিরাপত্তা নেই। এমনকি ইসরাইলের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ১৯ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিকও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার। তবে বাস্তবতা হলো, ইসরাইল সকল ইহুদির স্বর্গরাজ্য হওয়ার দাবি করলেও সব ইহুদি সেখানে সমান নিরাপদ বা সম্মানিত নন।
ইসরাইলি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন থেকেই মধ্যপ্রাচ্যীয় বংশোদ্ভূত ‘মিজরাহি’ ইহুদিরা পদ্ধতিগত বৈষম্যের শিকার। ডি-ক্লাসিফায়েড নথি অনুযায়ী, ইসরাইল সৃষ্টির পর আরব দেশগুলো থেকে আসা ইহুদি পরিবারের হাজার হাজার শিশুকে হাসপাতাল থেকে চুরি করে ধনী পশ্চিমা ইহুদি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। ইয়েমেনি ইহুদিদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ভয়াবহ—প্রতি আটজনে একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার রেকর্ড পাওয়া যায়। আজ সেই বৈষম্য ইথিওপীয় ইহুদিদের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। মাত্র ২ শতাংশ জনসংখ্যা হলেও তাদের অর্ধেকের বেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার কারণে তারা আজও সেখানে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘অপরাধী’ হিসেবে লাঞ্ছিত হচ্ছে।
একই চিত্র ভারতেও দৃশ্যমান। মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও দমন-পীড়ন আজ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। কিন্তু ‘হিন্দু সুরক্ষার’ দাবিদার এই রাষ্ট্রে সব হিন্দু কি নিরাপদ? ভারতের সমাজব্যবস্থায় বর্ণপ্রথা বা কাস্ট সিস্টেম আজও এক গভীর ক্ষত। প্রধানমন্ত্রী মোদির শাসনামলে দলিত ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ওপর অত্যাচার ও বঞ্চনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
২০১৬ সালে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের দলিত শিক্ষার্থী রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যার ঘটনাটি ভারতের বর্ণবাদী রাজনীতির এক নগ্ন উদাহরণ। বিজেপির ছাত্র সংগঠনের অভিযোগ এবং তৎকালীন মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে রোহিতের ফেলোশিপ স্থগিত ও হোস্টেল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তার সুইসাইড নোটে লেখা ‘আমার জন্মই ছিল এক মারাত্মক দুর্ঘটনা’ কথাটি আজও ভারতের লাখো দলিত শিক্ষার্থীর আর্তনাদ হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। ২০২৫ সালের ইউজিসি তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্ণবৈষম্যমূলক অভিযোগের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এমনকি ভারতের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ৭৭ শতাংশই দলিত সম্প্রদায় থেকে আসা, যা প্রমাণ করে যে আধুনিক ভারতেও বর্ণাশ্রম প্রথা সগৌরবে টিকে আছে।
নেতানিয়াহু ও মোদির এই ‘ব্রোম্যান্স’ বা রাজনৈতিক সখ্য মূলত একটি বিশেষ আদর্শিক বলয় তৈরির প্রচেষ্টা। তাদের প্রধান লক্ষ্য ফিলিস্তিনি বা ভারতীয় মুসলিম হলেও, এই উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতি আসলে নিজেদের ধর্মের সেই মানুষদেরও রেহাই দিচ্ছে না যারা তাদের ‘হেজিমোনিক’ বা আধিপত্যবাদী কাঠামোর বাইরে। যে রাষ্ট্র বর্ণ বা গায়ের রঙের ভিত্তিতে নিজের নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে, সেই রাষ্ট্র আর যাই হোক, সবার জন্য ‘নিরাপদ স্বর্গরাজ্য’ হতে পারে না। এই দুই দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিন্যাস ও বঞ্চনার ইতিহাস বলে দেয়—নিরাপত্তা এখানে কেবল বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত, সাধারণ নাগরিকদের জন্য নয়।