একটু ভালো থাকার আশায় মানুষ তাকিয়ে থাকে সরকারের দিকে। সেই আশা ভঙ্গ হলে তারা ক্ষোভ দেখায় সরকারের ওপর। সেই ক্ষোভ ক্ষেত্রবিশেষে চরম বিক্ষোভের রূপ নেয়। পতন ঘটায় মহাক্ষমতাবান সরকারের। তারপর, মানুষ আবার একটু ভালো থাকার আশায় নির্বাচিত করে নিজেদের সরকার।
সাম্প্রতিক সময়ে ৫ দেশে সফল গণ-বিপ্লবের পর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গড়ার তথ্য এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।
শ্রীলঙ্কা
স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের কথা আসলে বাংলাদেশে অনেক পাঠকের মনে এখনো শ্রীলঙ্কার কথা ভেসে উঠে। বৈশ্বিক করোনা মহামারির পরপরই ধরা পড়ে এই দ্বীপদেশটির চরম নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় ২০২২ সালের মাঝামাঝি দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশের মানুষ সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রাস্তায় নেমেছিল। ব্যাপক বিক্ষোভের পর অবশেষে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ থেকে পালিয়ে যান।
দেশটিতে গণ-বিক্ষোভের সময় যখন জানা গেল যে গোতাবায়া পালিয়েছেন তখন জনতার বিজয়-উল্লাস রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাদের বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাসে ভেসে যায় রাজপ্রাসাদের সাজানো-গুছানো কক্ষগুলো।
রাষ্ট্রপতির বিছানায় শুয়ে উচ্ছ্বসিত জনতার ছবি তোলার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছিল সারাবিশ্বে
এর ২ বছর পর শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে জনতার বিপুল ভোটে বামপন্থি নেতা অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েক বিজয়ী হন। এ ছাড়াও, তার বামপন্থি জোট ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি) আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।
এরপর পর্যটনসমৃদ্ধ শ্রীলঙ্কায় সরকারবিরোধী ক্ষোভ আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনাম হতে দেখা যায়নি।
তিউনিসিয়া
বিশ্ব-রাজনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাসে বহুল আলোচিত ‘আরব বসন্তের’ জন্ম তিউনিসিয়ায়। দুর্নীতি, দুঃশাসন ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি ২৩ বছরের স্বৈরশাসক জয়নাল আবেদিন বিন আলি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।

সেই বছর ২৩ অক্টোবর উত্তর আফ্রিকার এই দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা হয়।
বিপ্লব-পরবর্তী তিউনিসিয়ার সংবিধান রচনার জন্য আইনপ্রণেতা নির্বাচন করতে যে ভোটের আয়োজন করা হয়েছিল, তা নিয়ে বিতর্ক না হলেও নির্বাচন-পরবর্তী তিউনিসিয়াকে আবারও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ডুবে যেতে দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মতে—গণতান্ত্রিক তিউনিসিয়ায় আইনপরিষদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুসারে গণতান্ত্রিক সংস্কার না হওয়ায় দেশবাসী অসন্তুষ্ট।
তাদের ভাষ্য: তিউনিসিয়ায় ‘জুঁই’ বিপ্লবের রঙ অনেকটাই বর্ণহীন হয়ে গেছে।
মিশর
তিউনিসিয়ার গণ-অভ্যুত্থান বা ‘আরব বসন্তের’ প্রবল হাওয়ায় পাল্টে গিয়েছিল মিশরের রাজনীতিও। তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে দেশটিতে প্রায় ৩ দশক ক্ষমতায় থাকা রাষ্ট্রপতি হোসনি মোবারকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
১৯৮১ সালে মিশরের আলোচিত রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার পর দেশটির বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি হোসনি মোবারক একপাক্ষিক গণভোটের আয়োজন করে ক্ষমতায় বসেন। এরপর তিনি টানা ৩০ বছর দেশটির রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১১-১২ সালে মোবারক-মুক্ত মিশরে বাধাহীন গণতান্ত্রিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত আইনসভা নির্বাচনে ৭০ শতাংশের বেশি আসন পায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বহুল-আলোচিত মুসলিম ব্রাদারহুড ও নূর পার্টি।
এরপর দেশটিতে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সংস্কার না আসায় ২০১৩ সালে সেখানে সেনা-অভ্যুত্থান হয়।
২০১২ সালে মিশরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ও মুসলিম ব্রাদারহুড নেতা মোহাম্মদ মুরসিকে বন্দি করে ক্ষমতা নেন দেশটির সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি।

অর্থাৎ, শত শত বিক্ষোভকারীর প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা মিশরবাসী এক বছরও ভোগ করতে পারেনি।
ইউক্রেন
আজকের ইউক্রেনের কথা বললে পরাশক্তি রাশিয়ার হামলায় যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের চিত্র সবার সামনে ভেসে ওঠে। চলতি শতাব্দীর শুরুতে এই দেশটিই ইউরোপের রাজনীতিতে নতুন পালক গুঁজে দেয়। এর প্রভাব বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও দেখা যায়।
২০০৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০০৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ইউক্রেনে যে গণবিক্ষোভের দৃশ্য বিশ্ববাসী দেখেছিলেন তা ‘কমলা বিপ্লব’ নামে পরিচিত।

এই বিপ্লবের শুরুটা হয়েছিল নির্বাচনে জালিয়াতির প্রতিবাদ হিসেবে। ২০০৪ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইউক্রেন প্রায় গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়েছিল। নির্বাচনে রাশিয়া-সমর্থিত প্রার্থী ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন-সমর্থিত প্রার্থী ভিক্তর ইউশশেঙ্কোর মধ্যে লড়াইয়ে কারচুপির অভিযোগ ওঠেছিল।
শুধু তাই নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন-সমর্থিত প্রার্থীকে বিষ দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি বেঁচে যান। রাশিয়া-সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন-সমর্থিত প্রার্থী ভিক্তর ইউশশেঙ্কোর সমর্থকরা এর প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। তারা ইউশশেঙ্কোর নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত কমলা রঙের কাপড় নিয়ে বিক্ষোভ করেন।

এমন পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আবার ভোটের ব্যবস্থা করা হয়। সেই ভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-সমর্থিত প্রার্থী ভিক্তর ইউশশেঙ্কোকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে এই অদম্য গণ-আন্দোলন ইউক্রেনের ইতিহাসে ‘কমলা বিপ্লব’ খ্যাতি পায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ইউক্রেনের কমলা বিপ্লব একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতি বদলে দিয়েছে।’
ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স টোয়েন্টি ফোরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়—ইউক্রেন যুদ্ধের ‘জন্ম’ সেই কমলা বিপ্লবে, তখন ভ্লাদিমির পুতিনের পছন্দের প্রার্থীকে গণবিক্ষোভের মুখে পিছু হটতে হয়েছিল।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইউক্রেনে ‘কমলা বিপ্লবের’ মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও রাশিয়ার মধ্যে যে রেষারেষি তৈরি হয়েছিল তার খেসারত কিয়েভকে এখনো দিয়ে যেতে হচ্ছে।
জর্জিয়া
গোলাপের মতো এর কাঁটাও কাব্য-সাহিত্যে গুরুত্ব পেয়েছে। ঠিক তেমনি এক ‘গোলাপ ও কাঁটা’র গল্প কৃষ্ণ সাগরের পুবপারের ককেশীয় দেশ জর্জিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন উপমা সৃষ্টি করেছে।
২০০৩ সালের নভেম্বরে এই ইউরোশীয় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশটিতে ঘটে যাওয়া এক রক্তপাতহীন গণবিপ্লব বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে খ্যাতি পেয়েছে ‘গোলাপ বিপ্লব’ হিসেবে।

আইন পরিষদের এক বিতর্কিত নির্বাচনের প্রতিবাদে ও দেশটির রাষ্ট্রপতি এডওয়ার্ড শেভার্দনাদজির পদত্যাগের দাবিতে আম-জনতার অহিংস আন্দোলন আজো আলোচনার বিষয়।
দেশটির সেই সময়ের বিরোধী ইউনাইটেড ন্যাশনাল মুভমেন্ট পার্টির নেতা মিখেইল সাকাশভিলির নেতৃত্বে বিক্ষোভকারীরা গোলাপ হাতে তাদের আইন পরিষদে গিয়েছিলেন নির্বাচনে গরমিলের প্রতিবাদ হিসেবে।
জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের ‘জর্জিয়া: গোলাপ বিপ্লবের কাঁটা’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়—২০০৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে মিখেইল সাকাশভিলি ৯৬ শতাংশ ভোট পেয়ে ইতিহাস গড়লেন। সেই ব্যক্তির একক শাসন নিজ দেশের অনেকের কাছে ‘গোলাপের কাঁটা’ হয়ে দেখা দিয়েছিল।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়—১৯৯১ সালে গণভোটের মাধ্যমে সোভিয়েত শাসন থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর জর্জিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি জভিয়াদ গামসাখুরদিয়া বলেছিলেন, ‘আমরা আমাদের শত্রুর দিকে গোলাপ ছুড়ে দেব’। সেই আপ্তবাণীকে ধারণ করেই জর্জিয়াবাসী নিজ দেশের ভোট জালিয়াতির প্রতিবাদ করেছিলেন গোলাপ হাতে।
এরপর সেই ‘গোলাপ বিপ্লবের’ দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কণ্টকহীনভাবে ফেরেনি।