ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস গাজা উপত্যকার শাসনভার ফিলিস্তিনি টেকনোক্রেটিক কমিটির কাছে হস্তান্তর করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। তবে মিশর সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং উভয় পাশে পুরোপুরি খুলে দেয়ার জোর দাবি জানিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে এক সাক্ষাৎকারে হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেন, ‘গাজা উপত্যকার সব খাতে শাসন ব্যবস্থার পূর্ণ হস্তান্তর নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রোটোকল প্রস্তুত করা হয়েছে, নথিপত্র সম্পন্ন হয়েছে এবং হস্তান্তর প্রক্রিয়া তদারকির জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে সম্প্রতি ১৫ সদস্যের ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ (এনসিএজি) গঠন করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের গঠিত এই কমিটির দায়িত্ব হবে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা করা। যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’-এর তত্ত্বাবধানে কাজ করবে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের শাসক গোষ্ঠী ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) সাবেক উপমন্ত্রী আলি শা’আতের নেতৃত্বে গঠিত এনসিএজি রাফাহ সীমান্ত খুলে দেয়ার পর গাজায় প্রবেশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। হামাসের মুখপাত্র কাসেম বলেন, “রাফাহ সীমান্ত অবশ্যই উভয় দিক থেকে খুলতে হবে—গাজায় প্রবেশ ও প্রস্থানে পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের ইসরাইলি বাধা দেয়া যাবে না।”
২০২৪ সালের মে মাসে ইসরাইলি বাহিনী রাফাহ ক্রসিংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর থেকে এটি বন্ধ রয়েছে। ২০২৫ সালের শুরুতে সীমিতভাবে খোলা হলেও তা স্থায়ীভাবে কিছুদিন পরই বন্ধ করে দখলদার ইসরাইল। এনসিএজি প্রধান আলি শা’আত গত সপ্তাহে ঘোষণা দেন, আগামী সপ্তাহেই রাফাহ সীমান্ত উভয় দিক থেকে খুলে দেয়া হবে।
হামাস এই ঘোষণাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করলেও সতর্ক করে জানিয়েছে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা যেন চুক্তি অনুযায়ী হয়, ইসরাইলের শর্ত অনুযায়ী নয়। হামাসের দাবি, যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপের সব শর্ত তারা পূরণ করেছে। দ্বিতীয় ধাপেও অগ্রসর হতে প্রস্তুত।
হামাস দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিরস্ত্রীকরণকে ‘রেড লাইন’ বলে আসলেও সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছে, একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে অস্ত্র হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, গাজায় অর্থের বিনিময়ে হামাসের অস্ত্র ক্রয় করে সেগুলো ধ্বংস করা হবে। শিগগিরই অর্থের বিনিময়ে অস্ত্র ক্রয় কর্মসূচি চালু করা হবে বলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পরিকল্পনা তুলে ধরেছে দেশটি।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ জানান, গাজার শাসন ব্যবস্থায় হামাসের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো ভূমিকা থাকতে পারবে না। আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী আইএসএফ গাজায় শান্তি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। এই বাহিনীর গাজায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ওপর ভিত্তি করে ইসরাইলি সেনাবাহিনী গাজা থেকে প্রত্যাহার করা হবে।
এদিকে অধিকৃত পশ্চিমতীরে আগ্রাসন চালাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। দখলদার সেনাদের অভিযানে একদিন আটক করা হয়েছে ১৩০ ফিলিস্তিনিকে। বেথলেহেমে গুলিতে প্রাণ গেছে এক যুবকের। ইসরাইলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা অঞ্চলটির অন্তত তিনটি গ্রামে আগুন দিয়েছে। এসব সহিংসতার কারণে পশ্চিম তীরে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ঘটছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ।
বুধবার অধিকৃত পশ্চিমতীরজুড়ে একযোগে চিরুনি অভিযান চালায় ইসরাইলি সেনারা। নাবলুস, তুবাস ও কালকিলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়। এর মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। ঠান্ডার মধ্যে বাসিন্দাদের ঘর থেকে বের করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ ও ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠেছে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে।
একই দিন বেথলেহেমের একটি সামরিক চেকপয়েন্টের কাছে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে এক যুবক নিহত হয়। পরিবারের অভিযোগ, যুবকটিকে গুলির পর তার মরদেহও নিয়ে গেছে সেনারা। যদিও ইসরাইলি বাহিনীর দাবি, ওই যুবক ছুরিকাঘাতের চেষ্টা করেছিলেন।
পশ্চিম তীরের মাসাফের ইয়াত্তার তিনটি গ্রামে দখলদার সশস্ত্র ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা একযোগে অগ্নিসংযোগ করেছে। ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়িতে আগুন লাগলেও সেখানে ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্সকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর অধিকৃত পশ্চিম তীরে রাষ্ট্রসমর্থিত বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, এই সহিংসতার কারণে ওই এলাকায় জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ঘটছে। এদিকে গেল সপ্তাহে পূর্ব জেরুজালেমে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-এর কম্পাউন্ড গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ ইউরোপের ১১টি দেশ।
শীর্ষনিউজ