ভারতের ওড়িশা রাজ্যে সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদী হামলার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। ধেনকানাল জেলার পরজং গ্রামে এক খ্রিস্টান যাজককে পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। বজরং দলের সদস্যরা তাঁকে মারধরের পর জোরপূর্বক গোবর খেতে বাধ্য করে এবং ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিতে বাধ্য করে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২১ জানুয়ারি ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এক ফেসবুক পোস্টে এই ঘটনাকে বিজেপি শাসিত ভারতের জঙ্গলরাজ এবং জাতীয় বিবেককে লজ্জিত করার মতো ঘটনা বলে অভিহিত করেছে।
নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়, গত ৪ জানুয়ারি যাজক বিপিন বিহারী নায়েক তাঁর পরিবার এবং আরও সাতটি পরিবারের সাথে একটি বাড়িতে প্রার্থনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন। সেই সময় প্রায় ৪০ জনের একটি উগ্রবাদী হিন্দু জনতা বাড়িতে অতর্কিতে হামলা চালায়।
যাজক বিপিন নায়েকের ওপর চালানো নির্যাতনের বিবরণ ছিল অত্যন্ত লোমহর্ষক। জঙ্গিরা তাঁকে লাঠি দিয়ে মারধর করে, মুখে সিঁদুর লেপে দেয় এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে পুরো গ্রাম ঘোরায়। নির্যাতনের এক পর্যায়ে তাঁকে গ্রামের একটি মন্দিরের পিলারের সাথে বেঁধে রাখা হয়।
যাজকের স্ত্রী বন্দনা নায়েক বলেন, ‘‘তারা ঘরে ঢুকে সবাইকে মারধর শুরু করে। আমি সন্তানদের নিয়ে কোনোমতে পালিয়ে পুলিশ স্টেশনে পৌঁছাই।’’ তিনি জানান, তার স্বামীকে হাত বেঁধে মারাত্মকভাবে মারধর করা হয়েছে। তাঁকে জোর করে গোবর খাওয়ানো হয় এবং রক্তাক্ত অবস্থায় চড়-থাপ্পড় মারতে মারতে 'জয় শ্রীরাম' বলতে বাধ্য করা হয়।
“আমার স্বামীকে গ্রামের একটি হনুমান মন্দিরের রডের সাথে হাত বেঁধে রাখা হয়েছিল। তাকে জোর করে গোবর খাওয়ানো হয় এবং তিনি মারাত্মকভাবে রক্তক্ষরণ করছিলেন। লোকজন তাকে চড় মারছিল এবং ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে বাধ্য করছিল”, বলেন বন্দনা।
শেষ পর্যন্ত পুলিশ হস্তক্ষেপে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তবে একজন সমাজকর্মী অভিযোগ করেছেন যে, যাজক নায়েককে চিকিৎসা সহায়তা ছাড়াই প্রায় এক ঘণ্টা থানায় বসিয়ে রাখা হয়েছিল।
অভিযোগ উঠেছে যে, যাজকের স্ত্রী বারবার সাহায্য চাওয়া সত্ত্বেও পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়নি। পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে উদ্ধার করলেও থানায় আনার পর দীর্ঘ এক ঘণ্টা কোনো চিকিৎসা ছাড়াই তাঁকে বসিয়ে রাখা হয়।
পরজং গ্রামটি একটি হিন্দু প্রধান এলাকা যেখানে মাত্র সাতটি খ্রিস্টান পরিবার বসবাস করে। হামলাকারীদের দাবি, যাজক সেখানে বলপূর্বক ধর্মান্তর করছিলেন। পুলিশ এই ঘটনায় অভিযোগ নথিভুক্ত করলেও, যাজকের বিরুদ্ধেও ধর্মান্তরকরণের পাল্টা এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।
এই ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) নারকীয় এই বর্বরতার প্রতিবাদ জানিয়ে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, ২০১৪ সালের পর থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এটি বর্তমান সরকারের বিভাজনমূলক রাজনীতিরই ফল। দলটির পক্ষ থেকে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং যাজকের পরিবারের জন্য সাংবিধানিক ন্যায়বিচার দাবি করা হয়েছে।
‘‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দৃঢ়ভাবে সংখ্যালঘুদের পাশে এবং এই ঘৃণা ছড়ানোর শাসনের বিরুদ্ধে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়িয়েছে।’’
কংগ্রেসে নিন্দা জানিয়ে আরও বলেছে, বিজেপির অধীনে উন্মত্ত জনতা আস্কারা পাচ্ছে সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিতরা নির্যাতিত হচ্ছে, সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলা হচ্ছে। এটিই বিজেপির শাসনের প্রকৃত স্বরূপ।
শীর্ষনিউজ