ইরানের বিক্ষোভ আপাতত অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তাদের দাবি কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে বিক্ষোভ থামিয়ে দেয়া হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে হুমকি এখনো সংবেদনশীল অবস্থায় রয়ে গেছে। মানবাধিকার
সংগঠন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে গত রোববারের পর বড় কোনো বিক্ষোভ দেখা যায়নি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম শুক্রবার আরও গ্রেপ্তারের খবর দিলেও রাজপথে আন্দোলনের তৎপরতা কমে এসেছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানে বিক্ষোভ দমনে হত্যাকাণ্ড চলতে থাকলে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেন। তবে বুধবার ট্রাম্প জানান, দমন-পীড়নে প্রাণহানি কমে আসছে- এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কা কিছুটা কমেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ইরানে যেন ট্রাম্প হামলা না চালান এ বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে সৌদি আরব ও কাতারসহ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো। উপসাগরীয় এক কর্মকর্তা জানান, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছেন যে হামলা হলে এর প্রভাব গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং তেহরানকে সতর্ক করা হয়েছে। তারা যেন দমন-পীড়ন চালিয়ে নাগরিকদের হত্যা না করেন। ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট জানান, প্রায় ৮০০ মৃত্যুদণ্ডাদেশ স্থগিত রাখা হয়েছে বলে ট্রাম্পকে অবহিত করেছে একাধিক সূত্র।
কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা: ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় ইরান থেকে তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও তেহরানের কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, গত রোববারের পর থেকে রাজধানী তুলনামূলক শান্ত। তারা জানান, শহরের আকাশে ড্রোন উড়তে দেখা যাচ্ছে, তবে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার কোনো বিক্ষোভ চোখে পড়েনি।
নরওয়ে-ভিত্তিক ইরানি-কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেংগাও জানিয়েছে, রোববারের পর থেকে কোথাও বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশ হয়নি। সংগঠনটির ভাষ্য, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত কঠোর। তারা আরও জানায়, যেসব শহরে আগে বিক্ষোভ হয়েছিল এবং এমনকি যেসব এলাকায় বড় আন্দোলন হয়নি, সেখানেও ব্যাপক সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে। কাস্পিয়ান সাগরসংলগ্ন উত্তরাঞ্চলের একটি শহরের বাসিন্দারাও রাস্তাঘাট শান্ত থাকার কথা জানিয়েছেন।
বিচ্ছিন্ন সহিংসতার খবর: তবে কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্ন অস্থিরতার খবর মিলেছে। হেংগাও জানিয়েছে, পশ্চিম ইরানের কারাজ শহরে বিক্ষোভ চলাকালে সরকারি বাহিনীর গুলিতে এক নারী নার্স নিহত হয়েছেন। যদিও রয়টার্স এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার মধ্য ইস্ফাহান প্রদেশের ফালাভারজান কাউন্টিতে বিক্ষোভকারীরা একটি শিক্ষা অফিসে অগ্নিসংযোগ করেছে। উত্তর-পশ্চিম ইরানের কুর্দি অধ্যুষিত এক শহরের এক প্রবীণ বাসিন্দা জানান, সেখানে এখনো বিক্ষোভ চলছে, যদিও তা আগের মতো তীব্র নয়। তিনি বলেন, এর আগে আমি এমন সহিংস দৃশ্য কখনো দেখিনি। রাষ্ট্রায়ত্ত টিভি ইরানের পুলিশপ্রধানের বরাতে জানিয়েছে, দেশ জুড়ে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে।
হতাহতের ভয়াবহ চিত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৭৭ জনে। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৭৮ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৬৩ জন সরকারি পক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। রয়টার্স এই সংখ্যাও স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। ইরানি এক কর্মকর্তা এর আগে জানিয়েছিলেন, অস্থিরতায় প্রায় ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এই হতাহতের সংখ্যা ইরানের আগের সব আন্দোলনের তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সরকারের অবস্থান: ইরানি কর্তৃপক্ষ এই অস্থিরতাকে ইতিহাসের সবচেয়ে সহিংস বিক্ষোভ বলে বর্ণনা করছে। তাদের দাবি, বিদেশি শত্রুরা আন্দোলনে উস্কানি দিয়েছে এবং যাদের তারা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তারা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়েছে। তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, পশ্চিমাঞ্চলীয় কেরমানশাহ প্রদেশে সামপ্রতিক দাঙ্গায় বহু নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কেরমান শহরে একটি গ্যাস স্টেশন ও বাসিজ বাহিনীর একটি ঘাঁটিতে ভাঙচুরের অভিযোগে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উত্তর ইরানের সেমনান ও মধ্যাঞ্চলের সেমিরোম শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজার দৃশ্য সমপ্রচার করা হয়। সব মিলিয়ে, ইরানে আপাতত বিক্ষোভ কমে এলেও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি যে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি, তা স্পষ্ট