সরকারপ্রধান যখন নিজেকেই তার একমাত্র সীমা মনে করতে শুরু করেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তখন সেটি আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব থাকে না—তা হয়ে ওঠে ত্রাসের রাজত্ব। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য—‘নিজেকে ছাড়া আর কিছুই আমার পথে দাঁড়াতে পারে না’—এই হুমকিরই প্রকাশ্য ঘোষণা। প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ট্রাম্প কি একা? নাকি তার আগেও এমন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, যারা নিজেদের ক্ষমতাকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেছিলেন? এবং ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে কী করেছিল দেখে নেয়া যাক।
২০২৬ সালের শুরুতে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর পর নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, নিজেকে ছাড়া তাকে থামানোর মতো আর কোনো শক্তি নেই। এই বক্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন তিনি কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সামরিক শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক আইন মানার প্রশ্নে বলেছেন—কোন আইন কতটা প্রযোজ্য, তা তিনিই ঠিক করবেন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন মন্তব্য নয়।
২০১৯ সালে ট্রাম্প বলেছিলেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ–২ তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে যা খুশি করার অধিকার দেয়। ২০২০ সালে তিনি ইরানের সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দেন, যা সরাসরি যুদ্ধাপরাধ। এবং চলতি বছর ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে কংগ্রেসের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগকে তিনি ‘ভুয়া’ ও ‘অসাংবিধানিক’ বলে উড়িয়ে দেন।
এই ধারাবাহিকতায় ট্রাম্প নিজেকে কেবল নির্বাহী প্রধান নয়, বরং ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস হিসেবে তুলে ধরছেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে সবচেয়ে সরাসরি তুলনীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হলেন রিচার্ড নিক্সন। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর ১৯৭৭ সালে ডেভিড ফ্রস্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিক্সন বলেন—‘প্রেসিডেন্ট যা করেন- এর মানে হচ্ছে তা অন্যয় কাজ ছিল না। প্রেসিডেন্টের কাজই আইনের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে’ (When the president does it, that means it is not illegal)।
এসময় গোপন নজরদারি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন ও ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িয়ে পড়েন নিক্সন। পরিণতি হিসেবে অভিশংসনের মুখে পড়েন এবং পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম ও একমাত্র প্রেসিডেন্ট হিসেবে লজ্জাজনক প্রস্থানের নজির তৈরি করেন তিনি। নিক্সনের পতন দেখিয়ে দেয়—বেপরোয়া ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত নিজের পায়েই কুড়াল মারে।
৯/১১–এর হামলার পর জর্জ ডব্লিউ বুশ সরাসরি উদ্ধত ভাষা ব্যবহার না করলেও তার প্রশাসন কার্যত সীমাহীন ক্ষমতার চর্চা করে। যুদ্ধকালীন কমান্ডার ইন চিফ-এর ক্ষমতার দোহাই দিয়ে চালু হয়—টর্চার মেমো, গুয়ানতানামো বে এবং আদালতের অনুমতি ছাড়া গণনজরদারি।
তাৎক্ষণিকভাবে বুশ আইনি পরিণতির মুখে না পড়লেও দীর্ঘমেয়াদি ফল ভয়াবহ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান বিশ্বে দুর্বল হয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচিত হয়, পরবর্তী প্রশাসনগুলোকে বছরের পর বছর এই দ্বায়ভার সামলাতে হয়। এটি দেখায়, বেপরোয়া ক্ষমতার মূল্য সবসময় সঙ্গে সঙ্গে দিতে হয় না, কিন্তু দিতে হয় নিশ্চিতভাবেই।
১৮৬১ সালে গৃহযুদ্ধের সময় লিংকন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সংবিধান স্থগিত করেছিলেন। বাইরে থেকে দেখলে এটি ক্ষমতার অপব্যবহার মনে হতে পারে। কিন্তু লিংকন নিজেকে ক্ষমতার উৎস নয়, বরং রাষ্ট্র রক্ষার দায়িত্বশীল রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেন।
ইতিহাস লিংকনকে স্বৈরাচার নয়, রাষ্ট্ররক্ষক হিসেবে মূল্যায়ন করেছে, তার সিদ্ধান্তগুলো পরবর্তীতে সাংবিধানিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে বৈধতার কাঠামোয় এসেছে। এখানে শিক্ষা স্পষ্ট—ক্ষমতার ব্যবহার আর ক্ষমতার মালিকানা দাবি এক জিনিস নয়।
থিওডোর রুজভেল্টের স্টুয়ার্ডশিপ থিউরি অনুযায়ী, সংবিধানে নিষিদ্ধ নয়—এমন কাজ জনগণের স্বার্থে করতে পারেন প্রেসিডেন্ট। তিনি নির্বাহী ক্ষমতা বিস্তৃত করেছিলেন, কিন্তু কখনো বলেননি যে তার ব্যক্তিগত নৈতিকতাই একমাত্র সীমা। এতে শক্তিশালী প্রেসিডেন্সির ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে প্রতিষ্ঠান ও আইনের কাঠামো অক্ষুণ্ন থাকে।
ট্রাম্প কেন সবচেয়ে ঝুঁকিতে: নিক্সন, বুশ বা রুজভেল্ট-তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন, সংকট বা জনস্বার্থের যুক্তি দেখিয়েছেন। ট্রাম্প সেখানে ভিন্ন। তিনি বলেননি, 'রাষ্ট্র আমাকে বাধ্য করছে'; তিনি বলছেন—'আমিই একমাত্র সীমা।' এই আত্মকেন্দ্রিক ক্ষমতাদর্শই তাকে সবচেয়ে বেপরোয়া করে তোলে।
মার্কিন ইতিহাস একটি বিষয়ে ধারাবাহিক—ক্ষমতা যত বেপরোয়া হয়েছে, পরিণতি তত কঠোর হয়েছে। কখনো তা তাৎক্ষণিক (নিক্সন), কখনো দীর্ঘমেয়াদি (বুশ), আবার কখনো ইতিহাসের বিচারে (ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও যা অনিবার্য)।
গণতন্ত্রে রাজা না থাকলেও রাজসিক মনোভাব বিপজ্জনক। আর ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো-নিজেকে ছাড়া আর কেউ আমাকে থামাতে পারবে না-এই দাম্ভিকতা শেষ পর্যন্ত নিজের জন্যই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, ডেকে আনা অনিবার্য পরিণতি।