যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় চার বছর পরপর। মাঝখানে, অর্থাৎ দুই বছরের মাথায় হয় কংগ্রেসের নির্বাচন। একে বলে মধ্যবর্তী নির্বাচন, যা সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর একধরনের গণভোট।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে ভোটাররা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কড়া বার্তা দিয়েছেন। কংগ্রেসের দুই কক্ষ, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, দুটোই চলে গেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের হাতে। গত দুই দশকে কোনো প্রেসিডেন্ট মধ্যবর্তী নির্বাচনে এত বড় ধাক্কা খাননি।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদে তিনটি এবং সিনেটে চারটি বাড়তি আসন প্রয়োজন ছিল। মধ্যরাতের আগেই দুটো লক্ষ্য পূরণ হয়ে যায়।
ভোটারদের অসন্তোষের বড় কারণ ছিল অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি ও ইরান যুদ্ধ। এনবিসি নিউজের হিসাবে, আগের মধ্যবর্তী নির্বাচনের তুলনায় এবার প্রায় চার কোটি বেশি মানুষ ভোট দিয়েছেন। ট্রাম্পের জনসমর্থনও নির্বাচনের দিন গত দুই দশকের মধ্যে যেকোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের তুলনায় কম ছিল।
এ ফলের প্রভাব শুধু ওয়াশিংটনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে মার্কিন শুল্কনীতি এবং ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা—দুই ক্ষেত্রেই নতুন কংগ্রেসের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কংগ্রেসে মুসলিম প্রতিনিধিত্বে নতুন ইতিহাস
এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে অন্তত সাতজন মুসলিম নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের একজন সিনেটে এবং ছয়জন প্রতিনিধি পরিষদে। মিশিগান থেকে নির্বাচিত মিসরীয় বংশোদ্ভূত চিকিৎসক আবদুল আল সায়েদ হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর। ৪২ বছর বয়সি এ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হারিয়েছেন সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্সকে। তার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। গত আগস্টে দলের প্রার্থী বাছাইয়ের ভোটে (প্রাইমারি) তিনি কংগ্রেসওম্যান হেলি স্টিভেনসকে হারান মাত্র ১৫ হাজার ভোটে। অথচ তাকে ঠেকাতে বাইরের গোষ্ঠীগুলো খরচ করেছিল প্রায় সাত কোটি ডলার। প্রচারণার শেষ সপ্তাহে ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন, তারা কোনো ‘জিহাদি সিনেটর’ চান না। মিশিগানের ভোটাররা জবাব দিয়েছেন ব্যালটে।
৪২ বছর বয়সি এ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নির্বাচনি প্রচারণায় ইসরাইলকে নিঃশর্ত মার্কিন সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করেছেন আল সায়েদ। একই অবস্থান ছিল নিউ জার্সি থেকে নির্বাচিত ড. অ্যাডাম হামাওয়িরও। তিনি অঙ্গরাজ্যটির প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সদস্য।
এছাড়া নিউইয়র্কের ১৩ নম্বর আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ে। পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন রাশিদা তালিব, ইলহান ওমর, আন্দ্রে কার্সন ও লাতিফা সাইমন। আল সায়েদ ও হামাওয়ির জয় দেখিয়েছে, মুসলিম পরিচয়ের পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য, স্বাস্থ্যসেবা ও যুদ্ধের মতো ইস্যুতে বৃহত্তর ভোটারদের সমর্থন আদায়ও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্যও বার্তাটা পরিষ্কার, নিজেদের গণ্ডির বাইরে জোট গড়তে না পারলে বড় আসনে জেতা কঠিন।
রিপাবলিকান ভোটাররা কী চেয়েছিলেন
রিপাবলিকান ভোটারদের কাছে সবার আগে ছিল পকেটের হিসাব। সিবিএস নিউজের এক্সিট পোলে তারা অর্থনীতিকে এক নম্বর ইস্যু বলেছেন, দুই নম্বরে অভিবাসন। ডেমোক্র্যাট ভোটারদের প্রথম চিন্তা অবশ্য ছিল গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।
অক্টোবরের শুরুতে পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে রিপাবলিকান সমর্থকদের ৮২ শতাংশ অর্থনীতিকে ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ’ বলেছেন। অভিবাসনকে একই গুরুত্ব দিয়েছেন ৭২ শতাংশ, যেখানে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মধ্যে এ হার ৫৩ শতাংশ।
নতুন উপাদান ছিল ইরান যুদ্ধ। এপ্রিলের ফক্স নিউজ জরিপে রিপাবলিকানদের ৪২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতিকে প্রধান সমস্যা বলেছেন। অভিবাসন আর ইরান যুদ্ধ ছিল ১৪ শতাংশ করে সমানে সমান। বিদেশের যুদ্ধকে সাধারণত কম গুরুত্ব দেওয়া রিপাবলিকান ভোটারদের কাছ থেকে এটা ছিল আগাম সতর্কসংকেত।
ইরান যুদ্ধের দাম মেটাতে হলো ব্যালটে
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলার পর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে তেহরান। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বেড়ে যায়। নির্বাচনের দিন দেশটিতে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের গড় দাম ছিল চার ডলার ১১ সেন্ট। কোনো নির্বাচনের দিনে এটিই সর্বোচ্চ দাম বলে জানা গেছে।
ভোটাররা যে এ কষ্ট মনে রেখেছেন, এক্সিট পোলে তা স্পষ্ট। সিএনএনের এক্সিট পোলে ৭৪ শতাংশ ভোটার বলেছেন, ভোট দেওয়ার সময় যুদ্ধ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন ৮৭ শতাংশ। এনবিসির জরিপে ৬২ শতাংশ যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তকে ভুল বলেছেন। ডেমোক্র্যাটরা এ অসন্তোষকে প্রচারণায় কাজে লাগিয়েছেন। এর জেরে শেষ দিকে কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থীও দ্রুত যুদ্ধ থামানোর কথা বলতে শুরু করেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প উচ্চ জ্বালানিমূল্যকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে ইরান নীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেননি। এটিকে তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদি সমস্যা, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লাভের জন্য। তেহরান সহযোগিতা না করলে আবার হামলা শুরু হতে পারে, এমন হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের বড় অংশ আমদানি করে, এলএনজি আমদানিও বাড়ছে। লাখো বাংলাদেশি কাজ করেন উপসাগরীয় দেশগুলোতে, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির ভরসা। যুদ্ধ থামানোর প্রশ্নে ভোট আদায়ে সক্ষম একটি কংগ্রেস তাই তেলের বাজারে স্বস্তির আশা জাগায়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট যত দিন নতুন হামলার হুমকি দিচ্ছেন, সে আশা তত দিন নড়বড়ে।
জানুয়ারি থেকে ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
নতুন কংগ্রেস জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেবে। এরপর প্রতিনিধি পরিষদের কমিটিগুলোর নেতৃত্ব পাবে ডেমোক্র্যাটরা। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, পরিবারের ব্যবসা ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে তদন্তের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত ও ফেডারেল বিচারক নিয়োগে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকায় ট্রাম্পের মনোনয়ন আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের থাকবে।
ডেমোক্র্যাটদের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যবীমা কর্মসূচিতে কাটছাঁট প্রত্যাহার, ওবামাকেয়ারের ভর্তুকি বাড়ানো, শুল্ক আরোপে কংগ্রেসের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং ইরান যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ। তবে প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা থাকায় এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন সহজ হবে না।
প্রেসিডেন্টের অভিশংসন (ইমপিচমেন্ট) নিয়েও কথা উঠছে। তবে প্রেসিডেন্টকে অপসারণে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগে, যা ডেমোক্র্যাটদের নেই। ডেমোক্র্যাটরা বরং মন্ত্রীদের দিকে নজর দিতে পারেন। তাদের মধ্যে আছেন ইরান যুদ্ধের কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
দুই কক্ষ হাতে থাকায় ডেমোক্র্যাটরা ইরান প্রশ্নে বাধ্যতামূলক ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’ পাস করে ট্রাম্পের কাছে পাঠাতে পারবেন। এটি কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া থামাতে বলবে। ট্রাম্প তাতে ভেটো দিতে পারেন। সে ভেটো নাকচ করতে লাগবে দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ ভোট।
ক্ষমতার সীমা
ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতারও সীমা আছে। শুল্ক, অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রেসিডেন্টের হাতে বিস্তর ক্ষমতা থেকেই যাচ্ছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্পের নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে থাকা বিচার বিভাগ সাবপোনা কার্যকর করতে আগ্রহী না-ও হতে পারে। ফলে কর্মকর্তারা তা উপেক্ষাও করতে পারেন। আর ট্রাম্প ইতোমধ্যে হুমকি দিয়েছেন, ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস যা পাঠাবে, সবকিছুতেই ভেটো দেবেন তিনি। ফলে সামনের দুই বছরে নতুন আইন খুব কমই হবে আর নির্বাহী আদেশ নিয়ে আদালতে লড়াই চলবে বিস্তর।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুল্কের লড়াই। কংগ্রেস যদি শুল্ক নির্ধারণের ক্ষমতা ফিরিয়ে নেয়, তাহলে ওয়াশিংটনে আমাদের পোশাক রপ্তানিকারকদের সামনে খুলে যাবে আরেকটি দরজা। ঢাকার কূটনীতিকদের উচিত এখনই সেই দরজায় কড়া নাড়া শুরু করা।
লেখক :

সহকারী অধ্যাপক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক-ডাচেস এবং বিআইআইডিএসের নির্বাহী পরিচালক