Image description

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কার্যত তার দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ পর্যায়ের রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন। মার্কিন রাজনৈতিক পরিভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ‘লেইম ডাক’ বা ক্ষমতার শেষ পর্যায়ের প্রেসিডেন্সি।

সাধারণত কোনো প্রেসিডেন্ট যখন আর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পান না বা রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুভব করেন না এবং কংগ্রেসের ওপর তার নিয়ন্ত্রণও দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তিনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তে পররাষ্ট্রনীতিতে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে ব্যাপক সাংবিধানিক এবং নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে, তা ব্যবহার করে তিনি অনেক ক্ষেত্রে কংগ্রেসের রাজনৈতিক বাধা এড়িয়ে নিজের পছন্দের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

 

ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এ গতকাল বুধবার প্রকাশিত ড্যানিয়েল ডব্লিউ ড্রেজনার ও এলিজাবেথ এন. সন্ডার্সের বিশ্লেষণ ‘দ্য ডেঞ্জার্স অব আ লেইম-ডাক ট্রাম্প: হাউ ফার উইল হি গো টু মেইক পিস–অ্যান্ড ওয়ার?’-এ এই আশঙ্কার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। লেখকদের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্প এমন এক রাজনৈতিক অবস্থানে গিয়ে পড়েছেন, যেখানে তার সামনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় কোনো আইন প্রণয়ন বা নীতিগত সাফল্য অর্জনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বা লিগ্যাসি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি পররাষ্ট্রনীতিকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই প্রবণতা শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে নতুন সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

 

ট্রাম্পের বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে তার রাজনৈতিক জীবনের একটি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তিনি গত এক শ বছরের মধ্যে প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি দুই মেয়াদে ধারাবাহিকভাবে নয়, বরং বিরতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। ফলে তার জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো ‘লেইম ডাক’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

 

প্রথমবার ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতা ছাড়ার আগের সময়টিতে–যখন তিনি নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। জো বাইডেনের নির্বাচনী বিজয়ের পক্ষে স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প ফলাফল নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছিলেন। লেখকদের বক্তব্য, সেই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়লে ট্রাম্প প্রচলিত রাজনৈতিক আচরণ অনুসরণ করেন না। বরং পরিস্থিতিকে নিজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে পারেন।

 

এবারের পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে কংগ্রেসে তদন্ত, বিশেষ করে তার পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও বিদেশি স্বার্থের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এমনকি অভিশংসনের উদ্যোগও রাজনৈতিক আলোচনায় আসতে পারে। যদিও সিনেটে তাকে পদ থেকে অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় ৬৭টি ভোট পাওয়া কঠিন, তবু কংগ্রেসের তদন্ত ও রাজনৈতিক চাপ তার জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। লেখকদের আশঙ্কা, এ ধরনের পরিস্থিতিতে ট্রাম্প নিজেকে রাজনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ মনে করতে পারেন এবং সেই ক্ষোভ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রকাশ করার চেষ্টা করতে পারেন।

 

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতির ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। কংগ্রেস বাজেট, আইন প্রণয়ন ও সামরিক অনুমোদনের মতো বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও প্রেসিডেন্টের দৈনন্দিন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা এবং সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা যথেষ্ট বিস্তৃত। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও ট্রাম্প আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ পাবেন।

 

লেখকদের মতে, কানাডাকে নতুন করে হুমকি দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জোটগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা কিংবা ইউক্রেন ও তাইওয়ানের স্বার্থ উপেক্ষা করে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়ার মতো পদক্ষেপ তিনি বিবেচনা করতে পারেন। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য কূটনৈতিক আলোচনা, সামরিক অবস্থান পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি দরকষাকষি প্রয়োজন। অর্থাৎ শুধু বক্তব্য বা হুমকি দিয়ে সবকিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

 

মার্কিন ইতিহাসে ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে প্রেসিডেন্টদের পররাষ্ট্রনীতিতে সক্রিয় হওয়ার নজির রয়েছে। বিল ক্লিনটন তার দ্বিতীয় মেয়াদের শেষদিকে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়া সফরের উদ্যোগও নিয়েছিলেন। বারাক ওবামা ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ার পর ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদন এবং কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেন। জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ১৯৯২ সালে সোমালিয়ায় দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় সীমিত সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। আবার জর্জ ডব্লিউ বুশ (জুনিয়র) ২০০৭ সালে ইরাকে অতিরিক্ত মার্কিন সেনা পাঠিয়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।

 

তবে এসব উদ্যোগের ফলাফল একরকম ছিল না। ক্লিনটনের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। ওবামার কূটনৈতিক সাফল্যগুলোও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সোমালিয়ায় জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের মানবিক অভিযান দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় কিছুটা সফল হলেও সংঘাতের মূল কারণ দূর করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে বিল ক্লিনটন সেই অভিযান সম্প্রসারণ করলে তা বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করে। অন্যদিকে ইরাকে জর্জ ডব্লিউ বুশের অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন স্বল্পমেয়াদে সহিংসতা কমালেও দেশটিতে স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

 

তবে এসব উদ্যোগের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল: সংশ্লিষ্ট প্রশাসন পরিকল্পনাগুলো গ্রহণ করেছিল সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে এবং তাদের লক্ষ্য সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। লেখকদের মতে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি, সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে।

 

ট্রাম্পের সামনে এখন শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের একটি আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে। তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন। কিন্তু তার প্রথম মেয়াদ এবং দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম পর্যায়েই প্রচলিত অনেক কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়ে গেছে। প্রথম মেয়াদে তিনি ইরানের সঙ্গে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তিনবার বৈঠক করেন, উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি পরিবর্তন করে নতুন চুক্তি করেন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েকটি আরব দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেন। একই সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সমঝোতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও নেন। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হন।

 

লেখকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের নাটকীয়তানির্ভর কূটনীতির একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি বড় ঘোষণা দিতে পারেন, বৈঠক আয়োজন করতে পারেন এবং দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন; কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের জন্য যে ধৈর্য, কৌশলগত দক্ষতা, আঞ্চলিক ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান এবং ধারাবাহিক আলোচনা প্রয়োজন, তা তার নীতিনির্ধারণী আচরণে খুব একটা দেখা যায় না। গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত সেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর একটি সমঝোতায় পৌঁছানো তার উদাহরণ। একইভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিকল্প হিসেবে তার প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ কার্যকর আন্তর্জাতিক কাঠামো হয়ে উঠতে পারেনি। অন্য দেশগুলোও এখন ট্রাম্পের প্রতিটি ইচ্ছার প্রতি আগের মতো আনুগত্য দেখানোর প্রয়োজন অনুভব করছে না।

 

কাশ্মীর ও সুদানের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসনের উদ্যোগ নিয়েও ট্রাম্প আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষক হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু এসব সংকটের রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ও আঞ্চলিক জটিলতা অত্যন্ত গভীর। এমনকি একতরফা বা অসম চুক্তি চাপিয়ে দিতে গেলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান বোঝা, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন। লেখকদের মতে, ট্রাম্পের মধ্যে এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ধৈর্য ও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। অতীতে তিনি একাধিক সংঘাতের অবসান ঘটানোর দাবি করলেও সেগুলোর অনেকগুলো বাস্তবে চলমান রয়েছে।

 

আরেকটি সম্ভাবনা হচ্ছে, ট্রাম্প রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে একটি বৃহৎ শক্তির সমঝোতা বা ‘গ্রেট পাওয়ার কনসার্ট’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারেন। এ ধরনের কাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন একসঙ্গে কাজ করে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা নির্ধারণ করবে। ধারণাটি মূলত বিশ্ব রাজনীতিতে তিন বৃহৎ শক্তির মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে একটি নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রাশিয়া ও চীনের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হলেও তা থেকে কার্যকর সমঝোতা অর্জনের সম্ভাবনা সীমিত। রাশিয়া ও চীন ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে আগ্রহ দেখায়নি। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা প্রতিষ্ঠার জন্যও তারা বিশেষভাবে চাপ প্রয়োগ করতে আগ্রহী নয়।

 

এই ধরনের বৃহৎ শক্তির সমঝোতার সবচেয়ে বড় বিপদ হতে পারে ইউক্রেন ও তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ। ট্রাম্প শান্তিচুক্তির আশায় ইউক্রেনকে রাশিয়ার কাছে কিংবা তাইওয়ানকে চীনের কাছে কার্যত ছেড়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে লেখকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ইউক্রেনের ক্ষেত্রে পুতিনের অবস্থান থেকে বোঝা যায়, তিনি আপসের পরিবর্তে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ও সম্পদ ধরে রেখেছেন। অন্যদিকে চীনের কাছে তাইওয়ান একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। ফলে তাইওয়ান প্রশ্নে বাইরের কোনো শক্তির শর্ত মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় ট্রাম্পের জন্য তিন নেতার বৈঠকের দৃশ্যমান প্রচারমূল্য হয়তো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, কিন্তু কার্যকর সমঝোতা প্রতিষ্ঠার কঠিন কাজটি তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন।

 

তবে লেখকদের মতে, ট্রাম্পের ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে ইরানকে কেন্দ্র করে। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অচলাবস্থা ভাঙতে তিনি সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। তার ধারণা হতে পারে, আরও কঠোর সামরিক চাপ প্রয়োগ করলে তেহরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা সম্ভব হবে। কিন্তু ইরানের নেতৃত্ব এ ধরনের চাপের মুখে সহজে পিছু হটবে না বলেই লেখকেরা মনে করেন। বরং নতুন সামরিক হামলার জবাবে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে আক্রমণ বাড়াতে পারে, পারস্য উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালাতে পারে এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ উপেক্ষা করতে পারে। অর্থাৎ, সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

 

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পারস্য উপসাগর দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তেলের সরবরাহ, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, পরিবহন ব্যয় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

 

ইতিমধ্যে যুদ্ধের কারণে উচ্চমূল্য নিয়ে ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করলে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে খার্গ দ্বীপে মার্কিন সেনা মোতায়েনের মতো আরও বড় সামরিক পদক্ষেপ ট্রাম্পের নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যেও অজনপ্রিয় হতে পারে। তাই সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর ইচ্ছা থাকলেও বাস্তবে তার সামনে কিছু রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

 

কিউবা হচ্ছে ট্রাম্পের জন্য আরেকটি সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্র। ২০২৬ সালের অধিকাংশ সময় দ্বীপটির ওপর পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে দেশটির প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে পাওয়া সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিউবার অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিওর কাছে কিউবার সরকার পরিবর্তন একটি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে এটি ট্রাম্পের ঘোষিত ‘ডনরো ডকট্রিন’-এর সঙ্গেও সম্পর্কিত, যার মূল লক্ষ্য পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠা।

 

কিউবায় সামরিক অভিযান ট্রাম্পের কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কারণ, তার ধারণা, এ ধরনের অভিযান পরিচালনায় তুলনামূলক কম সামরিক শক্তি প্রয়োজন হবে এবং এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশক পুরনো একটি রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে। তবে লেখকেরা সতর্ক করেছেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে কোনো দেশের সরকার পরিবর্তন করার উদ্যোগ সাধারণত সফল হয় না এবং এর পরিণতি প্রায়ই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ডাউনসের গবেষণার উল্লেখ করে তারা বলেছেন, সামরিক শক্তির মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা খুব কম ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত ফল দেয়। কিউবার ক্ষেত্রে এর একটি সম্ভাব্য পরিণতি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থীদের নতুন ঢল। অর্থাৎ একটি সামরিক অভিযান শুধু কিউবার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকেও জটিল করে তুলতে পারে।

 

ইরানে নিজের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে ট্রাম্প কিউবাকে কেন্দ্র করে নতুন সামরিক উদ্যোগ নিতে পারেন বলেও লেখকদের আশঙ্কা। তার কাছে এটি হতে পারে একটি রাজনৈতিক জুয়া, যার মাধ্যমে অন্তত নিজের সমর্থকদের সামনে একটি বড় সাফল্য তুলে ধরা সম্ভব হবে। ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে একজন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার তাগিদ কখনো কখনো বাস্তবতার চেয়ে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ তিনি জটিল আন্তর্জাতিক সমস্যার দ্রুত ও নাটকীয় সমাধান পছন্দ করেন।

 

বিশ্লেষণটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে তার পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থের সম্ভাব্য সম্পর্ক। লেখকদের মতে, ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে তিনি আন্তর্জাতিক নীতিকে পরিবারের আর্থিক সুবিধা অর্জনের ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহার করতে পারেন। ইতিমধ্যে কাতারের আমিরের কাছ থেকে একটি বিমান, সৌদি যুবরাজের নেতৃত্বাধীন একটি তহবিল থেকে দুই বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোগ থেকে তার পরিবারের আর্থিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। দ্য নিউ ইয়র্কার-এর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে লেখকেরা উল্লেখ করেছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ট্রাম্প পরিবারের আয় চার বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ ধরনের সুবিধা গ্রহণ প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। ফলে পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক আর্থিক স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 

সবশেষে লেখকরা একটি অপ্রত্যাশিত সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। ট্রাম্প হয়তো তার ক্ষমতার শেষ দুই বছর পররাষ্ট্রনীতিতে বড় কোনো উদ্যোগ না নিয়ে নিষ্ক্রিয় থাকতে পারেন। ওয়াশিংটনকে নিজের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার কাজে তিনি ইতিমধ্যে ব্যস্ত। ওভাল অফিসের সাজসজ্জা পরিবর্তন, হোয়াইট হাউসে নতুন বলরুম নির্মাণের পরিকল্পনা এবং কেনেডি সেন্টার পুনর্গঠনের উদ্যোগ তার উদাহরণ। ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তদন্ত, ক্ষমা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত এবং নিজের নামে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের মতো কর্মকাণ্ডে মনোযোগী হতে পারেন। লেখকদের মতে, অন্যান্য সম্ভাব্য পরিস্থিতির তুলনায় পররাষ্ট্রনীতিতে এই নিষ্ক্রিয়তাই হয়তো সবচেয়ে কম ক্ষতিকর পরিণতি হবে।

 

ড্রেজনার ও সন্ডার্সের বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হচ্ছে, ট্রাম্পের ক্ষমতার শেষ পর্যায়কে শুধু একজন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক দুর্বলতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি এমন একটি সময়, যখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারানো একজন প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সাধারণত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনী জবাবদিহি প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু যখন সেই নির্বাচনী চাপ আর থাকে না, তখন ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতার ব্যবহার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

 

এখানে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরনও বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। তার কূটনীতিতে দৃশ্যমান সাফল্য, প্রচারমূলক ঘোষণা এবং দ্রুত ফল অর্জনের আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতিটি সংকটের পেছনে থাকে দীর্ঘ ইতিহাস, আঞ্চলিক শক্তির স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং নিরাপত্তার জটিল হিসাব। সামরিক শক্তি দিয়ে এসব বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। ইরান, কিউবা, ইউক্রেন কিংবা তাইওয়ানের মতো সংকটের ক্ষেত্রে একতরফা সিদ্ধান্তের পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার বাইরে চলে যেতে পারে।

 

বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিউবায় সরকার পরিবর্তনের সামরিক চেষ্টা নতুন মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে। আবার রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে বৃহৎ শক্তির সমঝোতার নামে ইউক্রেন ও তাইওয়ানের স্বার্থ উপেক্ষা করা হলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দেবে। এসব সম্ভাবনা দেখায়, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করতে পারে।

 

তাই, ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি বিপরীত সম্ভাবনা রয়েছে—একদিকে কূটনীতির মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, অন্যদিকে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে দ্রুত সাফল্য অর্জনের ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু লেখকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার অতীত কর্মকাণ্ড এবং বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি বেশি উদ্বেগজনক।

 

ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে এসে ট্রাম্প যদি মনে করেন যে হারানোর আর কিছু নেই, তাহলে ইরান বা কিউবাকে কেন্দ্র করে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যার পরিণতি শুধু তার প্রশাসন নয়, গোটা বিশ্বকে বহন করতে হবে। এই কারণেই লেখকদের কাছে ট্রাম্পের ‘লেইম ডাক’ প্রেসিডেন্সি কেবল রাজনৈতিকভাবে দুর্বল একটি সময় নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি সম্ভাব্য বিপজ্জনক অধ্যায়।