Image description
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আমেরিকার ভোটাররা যুদ্ধবাজ, ইসলামবিদ্বেষী এবং সামাজিক ও ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির সমুচিত জবাব দিয়েছেন!
আলহামদুলিল্লাহ। গতকাল আমেরিকার জনগণ স্পষ্ট ও সাহসী কণ্ঠে কথা বলেছেন। ভয় আর বিভেদের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে তারা আবারও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন এই দেশের প্রতিষ্ঠাতাদের সেই চিরন্তন অঙ্গীকার: ধর্ম, বর্ণ কিংবা জন্মভূমি নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক আইনের চোখে সমান। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছেন, আর ভোটাররা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে দ্ব্যর্থহীন রায় দিয়েছেন। অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে জনগণের গভীর ক্ষোভও এই রায়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
 
প্রবাসী বাংলাদেশি আমেরিকান সমাজের কাছে এই নির্বাচনের তাৎপর্য গভীরভাবে ব্যক্তিগত। গত দুই বছর ধরে আমরা বেদনার সঙ্গে দেখেছি, রিপাবলিকান দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা কীভাবে আমাদের ধর্মবিশ্বাসকে নির্বাচনী অস্ত্রে পরিণত করেছেন। দেশজুড়ে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাচনের বিজ্ঞাপনে "র‍্যাডিক্যাল ইসলাম" ও "শরিয়া আইন" প্রতিরোধের বুলি এবং "ইসলামি আন্দোলনের শিকড় গেড়ে বসার" সতর্কবার্তা ছড়ানো হয়েছে। এটি কোনো নীতিগত বিতর্ক ছিল না। এটি ছিল সেই পুরোনো নেটিভিস্ট কৌশল, যেখানে একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে জাতির জন্য বিদেশি হুমকি হিসেবে চিত্রিত করা হয়, ঠিক যেমনটি একসময় করা হয়েছিল ক্যাথলিক, ইহুদি ও এশীয় অভিবাসীদের বিরুদ্ধে।
 
এর সবচেয়ে নগ্ন রূপ আমরা দেখেছি এই টেক্সাসেই, আমাদের নিজেদের উত্তর টেক্সাসের আঙিনায়। গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট ডালাস অঞ্চলের ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টার (East Plano Islamic Center - EPIC) এবং এর সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকে নিশানা করেছেন, আর অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন "শরিয়া আইন" ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে একের পর এক তদন্ত চালিয়েছেন। ২০২৫ সালে অ্যাবট দেশের বৃহত্তম মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন CAIR-এর টেক্সাস শাখাকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করেন, আর প্যাক্সটন সংগঠনটি বিলুপ্ত করার দাবিতে মামলা ঠুকে দেন। লেফটেন্যান্ট গভর্নর ড্যান প্যাট্রিক "শরিয়া আইন প্রতিরোধ"কে তার শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেন। অ্যাবট তার নিজের প্রবর্তিত শিক্ষা ভাউচার কর্মসূচি থেকে ইসলামি ধর্মীয় বিদ্যালয়গুলোকে পর্যন্ত বাদ দিয়েছেন। আর টেক্সাস মান্থলির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুসলিম নেতৃত্বাধীন আবাসন প্রকল্পটির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের জন্য একটি সরকারি দপ্তরের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল, যদিও সেই দপ্তর নিজেই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
আমাদের সংবিধান এসবের জবাব দিয়েছে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায়। প্রথম সংশোধনী প্রতিটি নাগরিকের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে এবং রাষ্ট্রকে কোনো ধর্মের প্রতি পক্ষপাত কিংবা বিদ্বেষ প্রদর্শনে নিষেধ করে। ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ ঘোষণা করে, কোনো সরকারি পদের জন্য কখনোই কোনো ধর্মীয় পরীক্ষা চাওয়া যাবে না। এগুলো ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকানের মূল্যবোধ নয়, এগুলো আমেরিকার মূল্যবোধ। আর গতকাল টেক্সাসবাসী সেই মূল্যবোধের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছেন।
 
আমার প্রিয় টেক্সাসবাসী, আপনাদের প্রতি অন্তরের অন্তস্তল থেকে কৃতজ্ঞতা। জেমস তালারিকো কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করে সিনেট আসনটি ডেমোক্র্যাটদের জন্য ছিনিয়ে এনেছেন, যা ১৯৮৮ সালের পর টেক্সাসে প্রথম। জিনা হিনোহোসা গভর্নর অ্যাবটকে পরাজিত করে ১৯৯০ সালে অ্যান রিচার্ডসের পর টেক্সাসের প্রথম ডেমোক্র্যাট গভর্নর এবং রাজ্যের ইতিহাসে প্রথম ল্যাটিনা গভর্নর হতে চলেছেন। লেফটেন্যান্ট গভর্নর ড্যান প্যাট্রিককে পরাজিত করেছেন ভিকি গুডউইন। টেক্সাসের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে তিনজন এই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের তিনজনকেই টেক্সাসের ভোটাররা বিদায় জানিয়েছেন। শুধু দুই সপ্তাহের আগাম ভোটেই অংশ নিয়েছেন ৭৪ লক্ষাধিক টেক্সাসবাসী। প্রতিষ্ঠাতারা ঠিক যেমনটি কল্পনা করেছিলেন, গণতন্ত্র ঠিক সেভাবেই কাজ করেছে।
মিশিগানের ড. আবদুল এল-সাইয়েদকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। মহান আল্লাহর ইচ্ছায় এবং মিশিগানের জনগণের ভোটে তিনি অসাধারণ সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেছেন। প্রাইমারিতে তিনি অতি সামান্য ব্যবধানে পরাজিত করেন কংগ্রেসওম্যান হেলি স্টিভেন্সকে, যদিও স্টিভেন্সের তহবিল ছিল বিপুল এবং গভর্নর হুইটমার ও সিনেটর পিটার্সসহ দলের প্রভাবশালী নেতারা ছিলেন তার পক্ষে। নির্বাচনের মাত্র কদিন আগে স্টিভেন্স দলীয় সীমারেখা পেরিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দিয়ে সবাইকে স্তম্ভিত করে দেন। প্রাইমারি ও সাধারণ নির্বাচন, উভয় পর্বেই তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে বিপুল বহিরাগত অর্থের প্রবাহ, আর এটি পরিণত হয় ২৪৩ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয়ে মিশিগানের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচনে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, তার ধর্মবিশ্বাসকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বারবার তাকে উগ্রবাদের সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করেন। এক সমাবেশে তিনি মিশিগানবাসীকে আহ্বান জানান "একজন জিহাদিকে ক্যাপিটলে প্রবেশ থেকে ঠেকাতে", এমনকি তাকে ঠেকানোর বিষয়টিকে তুলনা করেন ৯/১১-এর ইউনাইটেড ফ্লাইট ৯৩-এর ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে যাত্রীদের প্রতিরোধের সঙ্গে। চূড়ান্ত বিতর্কে রজার্স সরাসরি প্রশ্ন করেন, তিনি কি আমেরিকার পক্ষে, নাকি বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পক্ষে। ড. এল-সাইয়েদ মর্যাদার সঙ্গে জবাব দেন: "আমি আমাদের সংবিধান নিয়ে গর্বিত, যা আমাদের প্রত্যেককে নিজের পছন্দমতো প্রার্থনার অধিকার দেয়।" মিশিগান তার সঙ্গে একমত হয়েছে, রজার্সের ৪৫.৫ শতাংশের বিপরীতে তাকে দিয়েছে ৫২.৫ শতাংশ ভোট। বিজয় ভাষণে তিনি বলেন, পুরো প্রচারণাজুড়ে তিনি "ইনশাআল্লাহ" বলে এসেছেন, আর আজ রাতে তা পরিণত হলো "আলহামদুলিল্লাহ"তে। ভাইস প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, জানুয়ারিতে তাকে শপথবাক্য পাঠ করানো সংবিধান অনুযায়ী তারই দায়িত্ব।
 
সমান আন্তরিক অভিনন্দন কংগ্রেসওম্যান ইলহান ওমরকে, যিনি মিনিয়াপোলিসসহ মিনেসোটার ৫ম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে টানা পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম আফ্রিকান শরণার্থী এবং মিনেসোটার প্রতিনিধিত্বকারী প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী। বছরের পর বছর ধরে তিনি অভিবাসনবিরোধী বিষোদ্গারের লক্ষ্যবস্তু। প্রথম নির্বাচিত হওয়ার পরই ট্রাম্প তাকে নিজের দেশে "ফিরে যেতে" বলেছিলেন, এমনকি তাকে "আবর্জনা" পর্যন্ত বলেছেন। এ বছর সেই চাপ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ভোররাতে তার ওয়াশিংটনের বাসভবনে অভিযান চালানো হয়, জব্দ করা হয় তার পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন, ব্যক্তিগত কম্পিউটার ও নোটবুক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তদন্তের লক্ষ্য ছিল তার নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে তাকে দেশ থেকে বিতাড়নের ভিত্তি তৈরি করা, অথচ সাত বছর আগেই কেন্দ্রীয় কর্মকর্তারা একই ধরনের অভিযোগ খতিয়ে দেখে কোনো অন্যায়ের পর্যাপ্ত প্রমাণ পাননি। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এই অভিযানকে "ন্যক্কারজনক" বলে অভিহিত করেন। তার নির্বাচনী এলাকার মানুষ জবাব দিয়েছেন ব্যালটে, তাকে দিয়েছেন ৭৬ শতাংশেরও বেশি ভোট।
 
তারা একা নন। এবারের নির্বাচনে অন্তত সাতজন মুসলিম জনপ্রতিনিধি মার্কিন কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছেন, যা উভয় কক্ষেই এক ঐতিহাসিক অর্জন।
মহান আল্লাহর দরবারে আমাদের বিনম্র প্রার্থনা, তিনি যেন নবনির্বাচিত মুসলিম জনপ্রতিনিধিদের এবং ক্রমবর্ধমান মুসলিম সমাজকে এমন প্রজ্ঞা, সততা ও কর্মদক্ষতা দান করেন, যাতে তারা নিজেদের কর্ম ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে পারেন যে মুসলমান ও ইসলাম আমেরিকান সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা যেন কার্যকর ও দক্ষতার সঙ্গে আমেরিকা ও তার জনগণের সংহতি, ভাবমূর্তি ও সমৃদ্ধিতে অবদান রেখে চলেন। আর এর মধ্য দিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রকৃত সত্য সম্পর্কে সচেতন বৃহত্তর আমেরিকান জনগোষ্ঠীই যেন ইসলামবিদ্বেষী, ভীতি ছড়িয়ে ফায়দা লোটা রাজনীতিবিদ ও তাদের বিভেদের রাজনীতিকে প্রান্তিক করে দেন। আমিন।
 
প্রবাসী বাংলাদেশি ভাই ও বোনেরা, ঠিক এই কারণেই আমরা ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করি, ভোট দিই এবং নাগরিক জীবনে সক্রিয় থাকি। আমাদের মসজিদ, আমাদের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, আমেরিকার স্কুলে পড়া আমাদের সন্তানেরা এই জাতির বুননেরই অংশ, অতিথি নয়। আর বাংলাদেশে থাকা আমাদের প্রিয়জনদের জন্য এই নির্বাচন এক স্মরণীয় বার্তা: গণতন্ত্র, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সংখ্যালঘুর অধিকার সুরক্ষাই একটি জাতিকে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী করে।
আমেরিকা দীর্ঘজীবী হোক। গণতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক। মহান আল্লাহ আমেরিকার জনগণকে প্রজ্ঞা ও শক্তি দান করুন, যাতে তারা বিশ্বশান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার পক্ষে এবং যেকোনো স্থানে অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারেন।
বিজয়ের রাতে দুই মুসলিম বীরের ভাষণ:
ড. আবদুল এল-সাইয়েদ, ডেট্রয়েট:
কংগ্রেসওম্যান ইলহান ওমর, মিনেসোটা:
ড. এল-সাইয়েদের পূর্ণ ভাষণের লিখিত রূপ: